শীতার্তদের পাশে দাঁড়াই

বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দিলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে  পোশাক পরাবেন

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ এএম, ০২ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, পৌষ ও মাঘ মাস শীতকাল। শীতকালে শীত থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু এ বছর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র শীত। তীব্র এ শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন। কনকনে ঠান্ডার মধ্যে জবুথবু অবস্থা সবার।

দেশের কোথাও কোথাও সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা মিলছে না। দেশজুড়ে শৈত্যপ্রবাহ আর ঘনকুয়াশায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। তীব্র ঠান্ডায় জনজীবনে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। গরম কাপড় না থাকায় ছিন্নমূল মানুষ পড়েছে বিপাকে। ঠান্ডাজনিত রোগে হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ অবস্থায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। ঋতু বদলের পরিক্রমায় প্রকৃতিতে যেন স্বরূপে ফিরেছে শীত। কিন্তু ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে এবারের শীতের আবির্ভাব বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও অসময়ে ঋতু বদলের ধারাবাহিকতায় এবারের শীতের প্রকোপ কয়েক গুণ বাড়বে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর মার্কেটগুলোতে শীতের পোশাক বিক্রির ধুম পড়েছে।

গত কয়েক দিন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে শীতের তীব্রতা অনেক বেড়েছে। বর্তমান শৈত্যপ্রবাহ আর ঠান্ডা দেশের উত্তরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের জনগণ অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছেন, সেই সাথে ডায়রিয়া, জ্বর, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

শীতকালে দেশের কোথাও শীত বেশি কম হতেই পারে, এতে কারো হাত নেই, এটি প্রাকৃতিক। তবে এক্ষেত্রে শীতার্তদের জন্য আমাদের অনেক কিছুই করণীয় আছে। সরকারের পাশাপাশি আমরাও পারি শীতার্তদের জন্য আমাদের সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে।

এ জগতে কেউ যদি বস্ত্রহীন, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্তকে আহারের ব্যবস্থা করে তাহলে আল্লাহপাক তাকে অসংখ্য নেয়ামতে ভূষিত করেন। যেভাবে হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে মানুষকে খাদ্য দান করেছে, সেদিন তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করেছে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে।’ (আবু দাউদ)

আমরা দেখতে পাই, প্রতি বছরই এ সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গরীব, অসহায় মানুষ শীতের তীব্রতায় খুব কষ্ট করেন। যাদের কাছে শীতের মোকাবিলা করার মতো তেমন কোনো বস্ত্র থাকে না, যার ফলে বিভিন্ন অসুখ-বিসুখেও তাদের ভুগতে হয়। এসব লোকদের সাহায্য করাই হলো : বান্দার অধিকার আদায় করা আর এমনটা করাই ইসলামের শিক্ষা। আর এর মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তা তার বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। যারা আল্লাহর বান্দার কষ্টের সময় সহযোগিতা করে আল্লাহপাক তাকে তার বন্ধু বানিয়ে নেন। তাই আল্লাহকে লাভ করতে হলে অসহায়দের সাহায্য করা একটি বড়ো মাধ্যম। আমরা সহজেই আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারি এসব অসহায় শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে।

এ জগতে কেউ যদি বস্ত্রহীন, ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্তকে আহারের ব্যবস্থা করে তাহলে আল্লাহপাক তাকে অসংখ্য নেয়ামতে ভূষিত করেন। যেভাবে হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে মানুষকে খাদ্য দান করেছে, সেদিন তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করেছে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে।’ (আবু দাউদ)

আরেকটি হাদিসে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব একটি মুসিবত দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার মুসিবতগুলো দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে সচ্ছল করে দেবে, আল্লাহ তাকে ইহকাল ও পরকালে সচ্ছল করে দেবেন এবং আল্লাহ বান্দাকে সাহায্য করবেন, যদি বান্দা তার ভাইকে সাহায্য করে।’ (মুসলিম)

এই শীতে হাজার হাজার গরীব মানুষ অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে, সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধাদের। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সমাজ ও দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। শীতের এই দিনগুলোতে যেই যেই স্থানের জনগণ সবচেয়ে বেশি কষ্ট করছে আমাদের সবার দায়িত্ব হবে সামর্থ্য অনুযায়ী তাদেরকে সহযোগিতা করা।

আমাদের সবার একটু সহযোগিতার ফলে একটি পরিবার, একটি শিশুর মুখে হাসি ফুটতে পারে। আমরা কি পারি না এসব শীতার্তদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে? আমরা কি পারি না তাদের দু:খের দিনের বন্ধু হতে? মানুষ হিসেবে কি আমাদের ওপর এই দায়িত্ব বর্তায় না তাদের সাহায্য করা? সমাজে অনেক এমন মানুষও রয়েছেন যারা সব সময় অন্যের সাহায্যের জন্য নিবেদিত থাকে, চলুন না তাদের সাথে নিজেকেও সম্পৃক্ত করে নেই। 

শীতার্তদের সাহায্যের জন্য দেশের বিত্তশালী, বিভিন্ন এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সাধারণ মানুষকে পাশে দাঁড়ানো উচিত। আসলে এই প্রচণ্ড শীতে যারা বেশি কষ্ট করেন তারা নিতান্তই গ্রামের সহজ-সরল দরিদ্র মানুষ। আমরা যদি সবাই মিলে এদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই, তাহলে হয়ত তারা এই শীতটা হয়ত কিছুটা আরামে অতিবাহিত করতে পারবে। অবুঝ শিশুদের মুখেও হাসি ফুটে উঠবে। এইসব লোকদের জন্য আমাদের অনেক কিছুই করার আছে, আমাদের সবার সম্মিলিত সহযোগিতার ফলে হাজারো মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সহায়ক হতে পারে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক মানুষকে স্বার্থপর ও কৃপণ হতে নিষেধ করেছেন। স্বার্থ ছাড়া কোনো কাজেই হাত দেব না বলে যারা প্রতিজ্ঞা করে, তাদের চিন্তা করে দেখা উচিত।

মানুষ যদি বাস্তবিক মানুষকে ভালোবেসে থাকে তবে সবার ব্যথায় ব্যথিত হবে ও সবার দু:খে দুঃখিত হবে, এটাই সত্য। কারো শরীরের কোনো অঙ্গ যদি আঘাত পায় বা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সে কী আনন্দ পায়? বরং কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক। সমাজের এক অংশ ক্ষুধার্ত, ব্যাধিগ্রস্ত, বস্ত্রহীন হলে অপর অংশ তাদের সাহায্যার্থে প্রাণঢালা সাহায্য করবে। এটাই প্রতিটি ধর্মের শিক্ষা আর এর ফলেই সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ জাতি গড়ে উঠবে।

প্রত্যহ সৃষ্টি সেবার কত সুযোগই না পাওয়া যায়, যেগুলো পালনের জন্য আল্লাহ শিক্ষা দিয়েছেন কিন্তু আমরা সে সুযোগের সদ্‌ব্যবহার করি না বরং অবহেলা করি, অবজ্ঞার চোখে দেখি। স্রষ্টার সৃষ্টিকে অবহেলা করে স্রষ্টা তুষ্ট করা যায় না। মানুষের দুঃখ ও ব্যথায় ব্যথিত হয়ে, তাকে মনে প্রাণে অনুভব করে, তার প্রতিকার করার জন্য সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই হচ্ছে ধর্মের শিক্ষা।

প্রত্যেক ব্যক্তি যদি তার দায়িত্বের প্রতি সজাগ থাকে, তবেই সৃষ্টি সেবার মহান এক সংঘ গড়ে উঠবে। অপরের প্রতি অনুকম্পা, সহানুভূতি, উদারতা ও দয়া প্রদর্শন করা আজ আমাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দয়া হতে দানশিলতার সৃষ্টি হয়। দানশীলতা ও সেবা করা মানবচরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য আর নির্দয় ব্যক্তি পাষাণবৎ। অপরের অশ্রু দর্শনে যার হৃদয় বিগলিত হয় না, সে জনসেবার দাবি করতে পারে বটে, কিন্তু কার্যত: কোনো উপকারই করতে পারে না।

দুঃখির দুঃখমোচন, বিপন্নকে উদ্ধার, শোকাতুরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা সৃষ্টি সেবার অন্তর্ভুক্ত। লোক দেখানো দয়া, দান, উপাসনাকে সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন না। কর্তব্যানুসারে জনসেবা করতে হবে প্রকাশ্যে ও গোপনে। তবে এতে বিনয় অবলম্বনই শ্রেয়। সকল ধর্মই মানব সেবার কাজকে পুণ্য বলে আখ্যায়িত করেছে। সেবার উৎসাহ না থাকলে অন্ধ, খঞ্জ বধিররগণ করাল গ্রাসে নিপতিত হতো। মানব সেবায় মন উদার হয়। এতে আনন্দ লাভ করা যায়।

আমাদের প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে বস্ত্রহীন অবস্থায় বস্ত্র দান করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে সবুজ বর্ণের পোশাক পরাবেন, খাদ্য দান করলে তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন, পানি পান করালে জান্নাতের শরবত পান করাবেন।’ (আবু দাউদ)

এই শীতে মানব সেবার অনেক সুযোগ রয়েছে। নিজ সামর্থ্য অনুসারে আমাদের আশেপাশের শীতার্তদের সাহায্য-সহযোগিতা করা প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।

শীতজনিত রোগব্যাধি থেকে মানুষজনকে রক্ষার করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তীব্র শীতে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যাতে কষ্ট না পায় সেজন্য গরম কাপড় সরবরাহ করাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

শুধু সরকার নয়, সমাজের বিত্তবানদেরও সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শীতের কবলে কাঁপতে থাকা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের প্রতি মানবতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

বিশ্বনবি ও শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কত চমৎকারভাবে বলেছেন, ‘যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না।’ (মুসলিম)

তাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী, এক কথায় দলমত-নির্বিশেষে সমাজের ধনাঢ্য ও বিত্তবান ব্যক্তিদের শীতার্ত বস্ত্রহীন মানুষের পাশে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে।

আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সাধ্য অনুযায়ী শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানোর তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামি চিন্তাবিদ। [email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।