নিজের সামর্থ্য বুঝে সঠিক পথ বেছে নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা
বর্তমান যুগে ‘উদ্যোক্তা’ শব্দটির একটি প্রবল রোমান্টিক আবরণ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্রই চাকরি ছেড়ে নিজের কিছু করার এক অদ্ভুত মোহ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। চারদিকে স্টার্ট-আপ কালচার, কোটি টাকার ফান্ডিং এবং সফল ব্যবসায়ীদের রাজকীয় জীবন দেখে অনেকের মনেই ধারণা জন্মায় যে, ব্যবসা হয়তো সাফল্যের কোনো শর্টকাট বা স্বাধীনতার এক অবারিত দুয়ার। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি বড়ই ধূসর এবং কণ্টকাকীর্ণ। বাস্তবতা হলো, ব্যবসা একটি অত্যন্ত জটিল মনস্তাত্ত্বিক এবং স্নায়বিক যুদ্ধ, যেখানে টিকে থাকার ক্ষমতা সবার থাকে না। বিখ্যাত লেখক ও উদ্যোক্তা সেথ গডিন যথার্থই বলেছেন, "উদ্যোক্তা হওয়া মানে হলো অনিশ্চয়তাকে আলিঙ্গন করা।" কিন্তু সাধারণ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা খোঁজা। এই মৌলিক পার্থক্যের কারণেই ব্যবসা সবার জন্য নয়।
ব্যবসায়িক জগতের কঠিন পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বিশ্বখ্যাত ডাটা ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ‘সিবি ইনসাইটস’ (CB Insights)-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ স্টার্ট-আপ বা নতুন উদ্যোগ শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যর্থ হয়। কেন এই বিশালসংখ্যক মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে? কারণ অধিকাংশ মানুষ ব্যবসার পেছনের সেই মানসিক ও আর্থিক চাপ সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাকে না। ছোটোবেলা থেকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ আমাদের শেখায় কীভাবে একজন দক্ষ ‘কর্মচারী’ হওয়া যায়, কীভাবে নির্দেশ পালন করতে হয়। কিন্তু ব্যবসার ময়দান হলো নির্দেশ দেওয়ার জায়গা, যেখানে কোনো রুটিন নেই, কোনো নিশ্চিত মাসের বেতন নেই এবং নেই কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা। একজন চাকরিজীবী যখন কাজ শেষে বাড়ি ফেরেন, তিনি তার ল্যাপটপ বন্ধ করতে পারেন, কিন্তু একজন ব্যবসায়ীর মস্তিষ্ক কখনোই বন্ধ হয় না। তাকে চব্বিশ ঘণ্টা দুশ্চিন্তা করতে হয় ক্যাশ-ফ্লো, কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন এবং বাজারের পরিবর্তন নিয়ে। এই সার্বক্ষণিক মানসিক চাপ বা ‘বার্নআউট’ সহ্য করার ক্ষমতা সবার ধাতে থাকে না।
ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অনিশ্চয়তার সঙ্গে বসবাস। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস একবার বলেছিলেন, "ব্যবসা করতে গেলে আপনাকে এমনভাবে তৈরি থাকতে হবে যেন আপনি দীর্ঘ সময় ধরে ভুল প্রমাণিত হতে পারেন।" অধিকাংশ মানুষ সামাজিক স্বীকৃতি ও দ্রুত ফলাফল পেতে চায়। কিন্তু ব্যবসায় প্রথম কয়েক বছর লাভ তো দূরের কথা, পকেট থেকে টাকা দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হয়। এই দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্যের অভাবই অনেককে পথিমধ্যে থামিয়ে দেয়।
হুজুগে পড়ে বা কারো সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যবসায় নামার আগে নিজের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর দিকে তাকানো জরুরি। যদি আপনি অনিশ্চয়তাকে উপভোগ করতে না পারেন, যদি একাকী দায়ভার বহনের ক্ষমতা আপনার না থাকে এবং যদি ব্যর্থতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকে, তবে ব্যবসা আপনার জন্য নয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই সম্মানের, আর নিজের সামর্থ্য বুঝে সঠিক পথটি বেছে নেওয়াই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের প্রফেসর থমাস আইজেনম্যান তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ব্যবসার ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ফলস স্টার্ট’ বা ভুল প্রস্তুতি। অনেকে আবেগতাড়িত হয়ে মূলধন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কিন্তু বাজারের প্রকৃত চাহিদা বুঝতে ব্যর্থ হন। ব্যবসা মানে কেবল পণ্য বিক্রি নয়, এটি হলো একটি সমস্যার সমাধান করা। যারা কেবল অর্থ উপার্জনের নেশায় ব্যবসায় আসেন, তারা প্রথম বড় ধাক্কাতেই ছিটকে যান। কারণ, কঠিন সময়ে একমাত্র আদর্শ ও প্যাশনই একজন উদ্যোক্তাকে জাগিয়ে রাখে, কেবল লোভ নয়।
বড়দের অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শন থেকেও একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়। ভারতীয় ধনকুবের রতন টাটা ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও একাকীত্ব সম্পর্কে প্রায়ই বলেন। তিনি মনে করেন, বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় একজন উদ্যোক্তা চূড়ান্তভাবে একা হয়ে পড়েন। যখন ব্যবসার অবস্থা খারাপ থাকে, তখন কর্মচারী, পাওনাদার এবং পরিবার—সবাই মালিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই যে বিশাল প্রত্যাশার চাপ এক জোড়া কাঁধে বহন করা, এটি সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।
ব্যবসার জগতের আরেক প্রবাদপুরুষ ওয়ারেন বাফেট সতর্ক করে বলেন যে, যাদের আবেগ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাদের পক্ষে অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। ব্যবসায় প্রতিদিন শত শত আবেগপ্রবণ পরিস্থিতি তৈরি হয়—বিশ্বস্ত কর্মচারীর ছেড়ে যাওয়া, বড় কোনো অর্ডার বাতিল হওয়া কিংবা ব্যাংক লোনের কিস্তি পরিশোধের চাপ। এই সংকটময় মুহূর্তে যারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, ব্যবসা তাদের জন্য নয়। ব্যবসা দাবি করে বরফের মতো শীতল মস্তিষ্ক এবং লোহার মতো কঠিন সংকল্প।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সফল ব্যবসায়ীর অন্যতম প্রধান গুণ হলো ‘রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জন্মগতভাবেই ঝুঁকি এড়াতে পছন্দ করে। মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বে ‘নিরাপদ ভবিষ্যৎ’ একটি অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত বিষয়। ব্যবসায়িক জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকুও বাজি ধরতে হয়। এই যে ‘অল-ইন’ করার মানসিকতা, এটি সবার থাকে না। টেসলা এবং স্পেস-এক্স এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৮ সালের দিকে তিনি তার সব অর্থ হারাবার পথে ছিলেন। দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও তিনি পিছু হটেননি। মাস্ক নিজেই বলেন, "উদ্যোক্তা হওয়া মানে হলো কাঁচ চিবানো এবং অতল গহ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকা।" এই যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়াটি সবার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। যাদের সামান্য ক্ষতিতে রক্তচাপ বেড়ে যায় বা যারা হারাবার ভয়ে সিটিয়ে থাকেন, তাদের জন্য ব্যবসার অনিশ্চিত পথের চেয়ে মাস শেষে নিশ্চিত বেতনের চাকরি অনেক বেশি শ্রেয়।
পরিশেষে এটি অনস্বীকার্য যে, পৃথিবী চলে উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবন আসে তাদের মাধ্যমেই। কিন্তু তাই বলে ভেড়ার পালের মতো সবার ব্যবসায় নামা আত্মঘাতী হতে পারে। প্রত্যেকের সামর্থ্য, ঝোঁক এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। কেউ হয়তো চমৎকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন কিন্তু নতুন কিছু তৈরির ঝুঁকি নিতে পারেন না—তাদের জন্য উচ্চপদস্থ কর্পোরেট চাকরিই উপযুক্ত। আবার কেউ হয়তো দিনরাত পরিশ্রম করতে পারেন কিন্তু আর্থিক অংক বোঝেন না। ব্যবসা একটি বহুবিধ দক্ষতার সংমিশ্রণ। এখানে হারার ভয় যেমন প্রবল, তেমনি একাকিত্বের দহনো অনেক বেশি। তাই হুজুগে পড়ে বা কারো সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যবসায় নামার আগে নিজের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর দিকে তাকানো জরুরি। যদি আপনি অনিশ্চয়তাকে উপভোগ করতে না পারেন, যদি একাকী দায়ভার বহনের ক্ষমতা আপনার না থাকে এবং যদি ব্যর্থতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকে, তবে ব্যবসা আপনার জন্য নয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই সম্মানের, আর নিজের সামর্থ্য বুঝে সঠিক পথটি বেছে নেওয়াই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।
লেখক : “দ্য আর্ট অব কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইনান্স ম্যানেজমেন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না, দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট ইত্যাদি বইয়ের লেখক, করপোরেট ট্রেইনার, ইউটিউবার এবং ফাইনান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট।
এইচআর/এএসএম