ভালোবাসা কারে কয়
ভালোবাসা দিবস—শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; এটি মানুষের অন্তরের একটি আয়না। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি এলে আমরা হঠাৎ করেই ভালোবাসাকে দৃশ্যমান করতে চাই—ফুলে, চিঠিতে, উপহারে, ছবিতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভালোবাসা কি সত্যিই এক দিনের বিষয়? নাকি এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যা প্রতিদিন বলা উচিত, তা আমরা বলিনা কেন?
ভালোবাসা দিবসের ইতিহাসে ফিরে গেলে আমরা পাই Saint Valentine-এর কিংবদন্তি। বলা হয়, নিষিদ্ধ সময়ে তিনি গোপনে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিয়ে পড়াতেন। শাসকের চোখে এটি ছিল অপরাধ, কিন্তু মানবিকতার চোখে ছিল সাহস। সেখানেই ভালোবাসা দিবসের প্রথম পাঠ—ভালোবাসা কখনো কেবল আবেগ নয়, এটি একধরনের নৈতিক অবস্থানও। ভালোবাসা মানে পাশে দাঁড়ানো, এমনকি ঝুঁকি নিয়েও।
তবে আধুনিক বিশ্বে ভালোবাসা দিবস অনেকটাই বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। লাল গোলাপ, চকোলেট, উপহার—সবকিছুর মধ্যেই বাজারের উপস্থিতি স্পষ্ট। আমরা হয়তো দাম দিয়ে অনুভূতির প্রমাণ দিতে চাই। কিন্তু সত্যি বলতে, ভালোবাসা কোনোদিন দাম দিয়ে মাপা যায় না। একটি আন্তরিক বাক্য, একটু স্পর্শ, একটু সময়—এগুলোই অনেক সময় হাজার টাকার উপহারের চেয়ে বেশি মূল্যবান।
ভালোবাসা দিবসের আরেকটি দিক হলো—এটি প্রত্যাশার দিন। কেউ অপেক্ষা করে প্রস্তাবের জন্য, কেউ একটি মেসেজের জন্য, কেউ একটি কলের জন্য। আবার কেউ কেউ নীরবে এই দিনটিকে এড়িয়ে যায়—কারণ তাদের জীবনে সেই মানুষটি নেই, যে নাম ধরে ডাকবে। তাই এই দিনটি যেমন কারও কাছে উৎসব, তেমনি কারও কাছে নীরব পরীক্ষা। ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালোবাসতে পারা—দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবসময় সমানভাবে ঘটে না।
ভালোবাসা শুধু রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষক যখন ছাত্রকে ধৈর্য নিয়ে বোঝান, একজন মা যখন সন্তানের অপেক্ষায় দরজা খোলা রাখেন, একজন বন্ধু যখন গভীর রাতে ফোন ধরেন—সেখানেও ভালোবাসা আছে। ভালোবাসা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে, ভালোবাসা বহুরূপী। এটি প্রেমিকের চোখে যেমন থাকে, তেমনি দায়িত্বের ভেতরেও থাকে, ক্ষমার ভেতরেও থাকে।
ভালোবাসা আসলে একধরনের আত্মস্বীকৃতি। আপনি যদি নিজেকে ভালোবাসতে না পারেন, তবে অন্যের ভালোবাসাও পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারবেন না। তাই এই দিনটি হতে পারে আত্মদর্শনেরও দিন। আমরা কাকে ভালোবাসি, কেন ভালোবাসি, কীভাবে ভালোবাসি—এই প্রশ্নগুলো আমাদের নিজেকেই জিজ্ঞেস করা উচিত। ভালোবাসা কি অধিকার চায়, নাকি স্বাধীনতা দেয়? ভালোবাসা কি ভয় তৈরি করে, নাকি সাহস?
ভালোবাসা দিবস হয়তো একদিনের, কিন্তু ভালোবাসা একটি নিরন্তর অনুশীলন। প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে, ছোট ছোট ত্যাগে, ছোট ছোট সততায় তা গড়ে ওঠে। যদি ১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আজ কাউকে বলি “তুমি গুরুত্বপূর্ণ”, তবে দিনটি সফল। আর যদি আমরা বুঝতে পারি, ভালোবাসা শুধু পাওয়ার জন্য নয়, দেওয়ার মধ্যেও তার পরিপূর্ণতা—তবে ভালোবাসা দিবস তার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়।
ভালোবাসা দিবস শেষ হয়ে যায় রাত বারোটায়। কিন্তু ভালোবাসা— সারাজীবনেও শেষ হয় না। ভালোবাসা থেকে যায় মানুষের ভেতরে, স্মৃতিতে, শব্দে, কখনো কবিতায়, কখনো নীরবতায়।
ভালোবাসা কেবল কোনো আবেগ নয়, বরং এটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার শিল্প। এটি এমন এক নীরব ভাষা যা হৃদয়ের গহীনে অনুরণিত হয়। সহজ কথায়, নিজের সত্তার সাথে অন্যের সত্তাকে একাত্ম করে ফেলাই ভালোবাসা। এটি যেমন মা ও সন্তানের নিঃস্বার্থ টান, বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা, ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসায় রাখার প্রতিশ্রুতি, তেমনি জীবনসঙ্গীর প্রতি গভীর অনুরাগ ও সমর্পণ। ভালোবাসা মানে একে অপরের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে, শ্রেষ্ঠত্বকে খুঁজে বের করা।
মানুষ সামাজিক জীব, আর সেই সমাজের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্পর্ক। জীবনে বাঁচতে হলে ভালোবাসার খুব প্রয়োজন। একাকীত্ব দূর করে মনের ভার লাঘব করার জন্য ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। জীবনের কঠিন সময়ে যখন সবকিছু অন্ধকার মনে হয়, তখন প্রিয়জনের ভালোবাসা আমাদের আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়। দয়া, মায়া আর মমতা না থাকলে পৃথিবী কবেই ধ্বংস হয়ে যেত। ভালোবাসা মানুষকে ক্ষমা করতে শেখায়, যা বিশ্বশান্তির মূল চাবিকাঠি।
অনেকেই বলেন, ভালোবাসার জন্য আবার দিন কিসের? কথাটি সত্য, কিন্তু যান্ত্রিক এই জীবনে আমরা প্রায়ই আমাদের প্রিয় মানুষদের অবহেলা করি। এই দিবসের বিশেষ কিছু গুরুত্ব রয়েছে: কাজের চাপে আমরা বলতে ভুলে যাই— "তোমাকে অনেক ভালোবাসি।" এই দিনটি সেই না বলা কথাগুলো গুছিয়ে বলার একটি সুযোগ করে দেয়। মান-অভিমান আর দূরত্বের চাদর সরিয়ে পুরোনো সম্পর্কের সজীবতা ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ দিন প্রভাবকের কাজ করে। উৎসব মানুষের একঘেয়েমি দূর করে। ভালোবাসার উৎসবে চারপাশের ইতিবাচকতা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ভালোবাসা কোনো জাদুকরী সমাধান নয় যা আপনার জীবনের সব দুঃখ মুছে দেবে, বরং এটি এমন এক শক্তি যা আপনাকে জীবনের সব ঝড় মোকাবিলা করার সাহস দেবে। ভালোবাসা মানে কেবল 'পারফেক্ট' কাউকে খুঁজে পাওয়া নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের অসম্পূর্ণতাগুলোকে গ্রহণ করে তাকে অসাধারণভাবে আগলে রাখা।
ভালোবাসা কোনো শিকল নয়, বরং এটি একটি উন্মুক্ত আকাশ। একটি সার্থক ও সুন্দর ভালোবাসার স্বরূপ হওয়া উচিত এমন: যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা নেই, সেখানে ভালোবাসা টিকে থাকে না। একে অপরের মতামত এবং ব্যক্তিগত জায়গাকে (Personal Space) সম্মান জানানো জরুরি। সন্দেহ হলো ভালোবাসার উইপোকা। তাই সম্পর্কে স্বচ্ছতা ও অগাধ বিশ্বাস থাকা আবশ্যক। ভালোবাসা মানে কেবল "আমি কী পেলাম" তা নয়, বরং "আমি কী দিতে পারলাম" তা চিন্তা করা। এটি ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হতে হয়। প্রতিটি মানুষের দোষ-গুণ আছে। প্রিয়জনের ত্রুটিগুলোকে ধৈর্যের সাথে গ্রহণ করে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার নামই প্রকৃত ভালোবাসা। ভালোবাসা হোক মুক্ত বাতাসের মতো, যা কাউকে শ্বাসরোধ করে না বরং নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
ভালোবাসা কেবল কবিতার বিষয় নয়; এটি আমাদের শরীরের এক জটিল জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞান বলছে, সুস্থ সম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাব আমাদের মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হৃদপিণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। ভালোবাসা শরীর ও মনের জন্য কেন এবং কতটুকু উপকারী, তার একটি বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
যখন আমরা ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকি, আমাদের মস্তিষ্ক কিছু বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে যা সরাসরি আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে: ডোপামিন, অক্সিটোসিন এবং সেরোটোনিন। ডোপামিন আমাদের আনন্দ ও জয়ের অনুভূতি জাগায়, অক্সিটোসিন সম্পর্কের বন্ধনকে দৃঢ় করে—যাকে “লাভ হরমোন” বলা হয়, আর সেরোটোনিন মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি মানসিক চাপ কমায় এবং বিশ্বাস ও নিরাপত্তার বোধ তৈরি কর। এটি মস্তিষ্কের 'রিওয়ার্ড সিস্টেম' সক্রিয় করে, যার ফলে আমরা আনন্দ ও উৎসাহ অনুভব করি। সেরোটোনিন (Serotonin): এটি আমাদের মনকে শান্ত রাখে এবং বিষণ্ণতা দূরে রাখতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সুখী দাম্পত্য জীবনে বা গভীর ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে থাকেন, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ভালোবাসার মানুষের সংস্পর্শে থাকলে রক্তচাপ (Blood Pressure) স্বাভাবিক থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্টকে সুস্থ রাখে।
ভালোবাসা ও ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগ আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। সুখী মানুষের শরীরে প্রদাহজনিত (Inflammation) সমস্যা কম দেখা যায় এবং তারা সাধারণ সর্দি-কাশির মতো ছোটখাটো অসুস্থতা থেকে দ্রুত সেরে ওঠে। একাধিক দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে যে, একা থাকা মানুষের তুলনায় যারা প্রিয়জন পরিবেষ্টিত হয়ে থাকেন, তাদের আয়ু বেশি হয়। একাকিত্ব শরীরে যে পরিমাণ মানসিক চাপ তৈরি করে, তা প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
ভালোবাসা হলো একটি সিদ্ধান্ত—প্রতিদিন নতুন করে কাউকে ভালোবেসে যাওয়ার এবং তার পাশে থাকার এক সুন্দর অঙ্গীকার।
ভালোবাসা অনেকটা প্রাকৃতিক ব্যথানাশকের মতো কাজ করে। যখন আমরা প্রিয় মানুষের হাত ধরি বা আলিঙ্গন করি, তখন মস্তিষ্কে ব্যথার সংকেত পৌঁছানোর গতি কমে যায়। এটি মূলত ডোপামিন এবং এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসরণের কারণে ঘটে। স্ট্রেস হরমোন 'কর্টিসল' কমায় এবং সুখের অনুভূতি বাড়ায়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং একাকিত্ব দূর করে। রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির কারণে চেহারায় উজ্জ্বলতা আসে।
ভালোবাসা মানেই যে শুধু রোমান্টিক সম্পর্ক, তা নয়; বন্ধু-বান্ধব, পরিবার বা এমনকি পোষ্য প্রাণীর প্রতি ভালোবাসাও সমানভাবে শরীর ও মনের জন্য উপকারী।
ভালোবাসা একটি বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় অনুভূতি। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকরা ভালোবাসাকে কেবল একটি শব্দে সীমাবদ্ধ না রেখে একে আটটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছিলেন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই বিভাজনগুলো আমাদের সামাজিক ও মানসিক আচরণের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়।
ভালোবাসার প্রধান ধরনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ইরোস (Eros) – রোমান্টিক বা কামজ ভালোবাসাঃ এটি শারীরিক আকর্ষণ এবং আবেগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। সাধারণত সম্পর্কের শুরুর দিকে এই ধরনের তীব্র আকর্ষণ দেখা যায়। গ্রীকরা একে অনেকটা 'নিয়ন্ত্রণহীন' আবেগ হিসেবে দেখতেন।
২. ফিলিয়া (Philia) – গভীর বন্ধুত্ব বা সখ্যতাঃ এটি কোনো শারীরিক আকর্ষণ ছাড়াই একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থার ভালোবাসা। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের মধ্যে যে টান অনুভব করা হয়, সেটিই ফিলিয়া। প্রাচীন গ্রীকরা একে ইরোসের চেয়েও মূল্যবান মনে করতেন।
৩. স্টোর্জ (Storge) – পারিবারিক ভালোবাসাঃ এটি মূলত রক্ত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের বা ভাই-বোনের প্রতি যে সহজাত এবং শর্তহীন টান থাকে, তাকেই স্টোর্জ বলা হয়। এটি নির্ভরতা ও নিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
৪. আগাপে (Agape) – নিঃস্বার্থ বা মহাজাগতিক ভালোবাসাঃ এটি ভালোবাসার সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত। কোনো প্রতিদান আশা না করে মানবজাতি, প্রকৃতি বা ঈশ্বরকে ভালোবাসা হলো আগাপে। এটি সহানুভূতি এবং ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।
৫. লুডাস (Ludus) – চঞ্চল বা খেলার ছলে ভালোবাসাঃ এটি এমন এক ধরণের ভালোবাসা যেখানে কোনো গভীর প্রতিশ্রুতি বা বাধ্যবাধকতা থাকে না। স্রেফ আনন্দ পাওয়া, ফ্লার্ট করা বা মুহূর্তকে উপভোগ করার জন্য যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাকে লুডাস বলে।
৬. প্রাগমা (Pragma) – বাস্তবসম্মত বা দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসাঃ এটি কেবল আবেগের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং কর্তব্য, যুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। বছরের পর বছর একে অপরের পাশে থাকা বয়স্ক দম্পতিদের মধ্যে এই গভীর প্রাগমা ভালোবাসা দেখা যায়।
৭. ফিলটিয়া (Philautia) – আত্মপ্রেম বা নিজের প্রতি ভালোবাসাঃ নিজেকে ভালোবাসা মানে স্বার্থপরতা নয়। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নিজের যত্ন নেওয়া, নিজের গুরুত্ব বোঝা এবং নিজেকে গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। একেই বলা হয় ফিলটিয়া।
৮. ম্যানিয়া (Mania) – আচ্ছন্ন বা উন্মাদনাপূর্ণ ভালোবাসাঃ এটি ভালোবাসার একটি নেতিবাচক দিক। যখন ভালোবাসা কেবল অধিকারবোধ, ঈর্ষা এবং অতিরিক্ত আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তাকে ম্যানিয়া বলা হয়। এতে ব্যক্তি তার সঙ্গীর ওপর প্রচণ্ড নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায়।
বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের মতে, একজন মানুষের জীবনে সুষম মানসিক বিকাশের জন্য এই সব ধরণের ভালোবাসারই কমবেশি প্রয়োজন আছে। যেমন: মানসিক শক্তির জন্য: ফিলিয়া (বন্ধুত্ব) ও স্টোর্জ (পরিবার)। আনন্দের জন্য: ইরোস ও লুডাস। স্থিতিশীলতার জন্য: প্রাগমা।
আমাদের সমাজে ভালোবাসা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং এটি সময়ের সাথে সাথে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে যেমন হাজার বছরের ঐতিহ্য ও পারিবারিক মূল্যবোধ কাজ করে, অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষা ও বিশ্বায়নের প্রভাবে নতুন চিন্তাধারার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
আমাদের সমাজে ভালোবাসা এখনো ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়ে পারিবারিক বিষয়ের অংশ হিসেবে বেশি দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে "নিজের পছন্দে বিয়ে" বা প্রেমকে এখনো নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। পরিবারের অমতে ভালোবাসা মানেই তা এক ধরণের অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ভালোবাসা বা বিয়ের ক্ষেত্রে বংশমর্যাদা, ধর্ম, জাত এবং অর্থনৈতিক অবস্থা এখনো বড় মাপকাঠি। এর বাইরে গিয়ে ভালোবাসা আমাদের সমাজে প্রায়ই বাধার সম্মুখীন হয়। সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে ভালোবাসা কেবল বিয়ের পরেই শুরু হওয়া উচিত। বিয়ের আগের প্রেম বা সম্পর্ককে অনেক সময় অনৈতিক বা বিজাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে দেখা হয়। তরুণ প্রজন্ম এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অংশ মনে করে, ভালোবাসা একটি মানবিক অধিকার। একে অপরের মানসিক বোঝাপড়া এবং পছন্দের গুরুত্বকে তারা বড় করে দেখেন।
ভালোবাসার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ভিন্ন হয়। কোনো পুরুষ প্রেম করলে সমাজ যতটা সহজভাবে নেয়, কোনো নারীর ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় বেশি কঠোর হয়। নারীর "পারিবারিক সম্মান" বা "সতীত্ব"-এর ধারণার সাথে ভালোবাসাকে গুলিয়ে ফেলা হয়। নাটক, সিনেমা এবং সোশ্যাল মিডিয়া ভালোবাসা নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে বড় ভূমিকা রাখছে। পর্দায় রোমান্টিক সম্পর্ককে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়, তা তরুণ সমাজের মাঝে ভালোবাসার প্রতি এক ধরণের আদর্শিক ধারণা তৈরি করে। তবে বাস্তব জীবনে সেই একই মানুষগুলো আবার সামাজিক চাপের মুখে ভিন্ন আচরণ করেন।
আমাদের সমাজে জনসম্মুখে ভালোবাসার প্রকাশ যেমনঃ হাত ধরা বা পাশে বসে কথা বলা এখনো অনেক জায়গায় গ্রহণযোগ্য নয়। একে "বেহায়াপনা" হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রবল।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের সমাজ বর্তমানে একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পুরনো প্রথাগুলো ভেঙে নতুন চিন্তাধারা জায়গা করে নিচ্ছে ঠিকই, তবে এখনো সামাজিক সম্মান আর পারিবারিক সম্মতির দেয়াল ভালোবাসার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
ভালোবাসা সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলো কোনো একটি সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়। ভালোবাসা কোনো গন্তব্য নয়, একটি যাত্রা: ভালোবাসা কেবল কাউকে খুঁজে পাওয়া নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে তাকে নতুন করে আবিষ্কার করা এবং একসাথে বেড়ে ওঠা। যেখানে শ্রদ্ধা নেই, সেখানে ভালোবাসা বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। একে অপরের চিন্তা, স্বাধীনতা এবং স্বকীয়তাকে সম্মান করা ভালোবাসার প্রথম শর্ত। ভালোবাসা শর্তহীন হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক সবসময়ই কিছু সুস্থ সীমানা (Boundaries) এবং পারস্পরিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করে। ভালোবাসা মানে কেবল সুখ ভাগ করে নেওয়া নয়; এটি হলো কঠিন সময়ে একে অপরের হাত ধরে থাকা এবং ছোটখাটো ভুলগুলোকে ক্ষমা করতে শেখা। যে মানুষ নিজেকে ভালোবাসতে জানে না, তার পক্ষে অন্যকে পূর্ণাঙ্গভাবে ভালোবাসা প্রায় অসম্ভব। নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখাও ভালোবাসার একটি অংশ।
ভালোবাসা কোনো জাদুকরী সমাধান নয় যা আপনার জীবনের সব দুঃখ মুছে দেবে, বরং এটি এমন এক শক্তি যা আপনাকে জীবনের সব ঝড় মোকাবিলা করার সাহস দেবে। ভালোবাসা মানে কেবল 'পারফেক্ট' কাউকে খুঁজে পাওয়া নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের অসম্পূর্ণতাগুলোকে গ্রহণ করে তাকে অসাধারণভাবে আগলে রাখা।
ভালোবাসা হলো একটি সিদ্ধান্ত—প্রতিদিন নতুন করে কাউকে ভালোবেসে যাওয়ার এবং তার পাশে থাকার এক সুন্দর অঙ্গীকার।
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক।
এইচআর/জেআইএম