রিজওয়ানা-খলিলুরকে জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচার দাবি জামায়াতের
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার বিচার দাবি করেছে জামায়াতে ইসলামী। একই অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকেও জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তোলেন দলটির নায়েবে আমির ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘গতকালকে আমরা একটা রাজসাক্ষী পেয়েছি। সেই রাজসাক্ষীর নাম হচ্ছে সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রিজওয়ানা। তার ভাষায়, আমরা যারা নারীদের উপযুক্ত অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারিনি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও তাদের কিন্তু মূল ধারায় বা প্রধান শক্তি হিসেবে আসতে দেয়নি। তখনই বোঝা যায়, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে কথা এসেছিল বা এসেছে, সেটাকে উনি (রিজওয়ানা) নিজেই স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছেন।’
জামায়াতের এই নেতা বলেন, আমরা এখন জানতে চাই—ওনার (রিজওয়ানা) কাছে বা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে এবং আজকের সরকারের কাছে যে, তাদের যোগসাজশে কি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীকে মূলধারা বা প্রধান দল হিসেবে মেজরিটি পেতে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। আমরা সাবেক উপদেষ্টার কাছে এটাও জানতে চাই যে, এই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ওনার সঙ্গে কারা কারা জড়িত ছিলেন। পুরো গভর্নমেন্ট (সরকার) ছিল নাকি গভর্নমেন্টের একটি অংশ ছিল, যারা নির্বাচন প্রভাবিত করেছে।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আরও বলেন, এই সরকারের কাছে দাবি জানাবো, রিজওয়ানা হাসানকে তারা কীভাবে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনবেন। যে সিচুয়েশন তিনি তৈরি করেছিলেন, সে সম্পর্কে উনারা (সরকার) জানবেন, আমাদের জানাবেন, দেশবাসীর কাছেও এটা পরিষ্কার করবেন।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াত অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টার বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমপর্যায়ের নিরপেক্ষ বলেছিল। এমন নীতিগত কথা ছিল, তাদের কেউ দলীয় সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করবেন না। তবে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এটি তিনি আগের শপথের পরিপন্থী কাজ করেছেন।
সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, তিনি (খলিলুর) সরকারকে মোটিভেট করে, ষড়যন্ত্র করে বর্তমানে যারা সরকারে আছেন তাদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই উনি অব্যাহতভাবে কাজ করেছেন। তার সেই কাজের পুরস্কার হিসেবেই উনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই রিওয়ার্ডটা পেয়েছেন।
সরকারের উচিত খলিলুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা—এমন দাবি তুলে তাহের বলেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানসহ সরকারের উপদেষ্টারা বিএনপিকে জেতানোর জন্য কি ধরনের কনস্পিরেসি (ষড়যন্ত্র) করেছে তা সামনে আসা দরকার। সুষ্ঠু নির্বাচন যারা ভণ্ডুল করেছে তারা মীর জাফর। নিজেদের স্বচ্ছতার জন্য খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভা থেকে বের করে দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা উচিত সরকারের। এর মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে কি ষড়যন্ত্র হয়েছে তা সামনে আসতে পারে।
সংস্কার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যে রিট করা হয়েছে তার পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে উল্লেখ করে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সরকার রিটের নামে সংস্কার বাস্তবায়নে দেরি করাচ্ছে। আদালতকে ব্যবহার করে তারা জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করছে। আদালত থেকে জনমতের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হচ্ছে। জামায়াত এই রায়ের বিরুদ্ধে লড়বে এবং জনমত গড়ে তুলবে। সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সঠিক উদ্যোগ নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, নির্বাচনের পরে অনেকে হত্যা, ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অনেকের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেসব জায়গায় জামায়াত বেশি ভোট পেয়েছে, সেসব জায়গায় বেশি হামলা চালানো হচ্ছে এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিগত দিনে নৈরাজ্যবাদী সরকারের সময়ে যে চরিত্র ও চিত্র ছিল, বর্তমান সরকারের সময়ে তার ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে না।
তাহের আরও বলেন, হঠাৎ করে সব জায়গায় দলীয়করণ করা শুরু হয়েছে। অফিস-আদালত দখল করা শুরু হয়ে গেছে। সরকার যেন দখলের মতো ভুল সিদ্ধান্ত না নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সেটি সম্ভব হবে না। কারণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রুচির পরিবর্তন ঘটেছে। তারা অস্ত্রের পেছনে সময় ব্যয় করবে বলে মনে হয় না।
ভোট সুষ্ঠু হলে জামায়াত সরকার গঠন করতে পারতো বলে বিশ্বাস করেন সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, জামায়াত বিরোধী দল হিসেবে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা করছে। সরকার যেন এটি স্বাগত জানায়, বাড়াবাড়ি না করে। দল হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে যেন বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো করে। তবে অনেককে চাকরিচ্যুত বা নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা করেনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তাহের বলেন, জামায়াত রিজওয়ানার বিচার দাবি করছে। তবে মামলা করা হবে নাকি বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাওয়া হবে সেটি পরবর্তীতে খোলাসা করা হবে।
ডেপুটি স্পিকার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তাহের বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার থাকবে। আর জুলাই সনদ অনুযায়ী একজন স্পিকার ও দুজন ডেপুটি স্পিকার থাকবে। এর মধ্যে একজন সরকারি দল থেকে, আরেকজন বিরোধী দল থেকে। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী সরকার ডেপুটি স্পিকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে জামায়াত বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবে। তবে সেজন্য সরকারের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব পাওয়া জরুরি। তখন আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। আর জুলাই সনদের অংশ হিসেবে তারা একজন ডেপুটি স্পিকার দিতে চাইলে সেটির কোনো বৈধতা নেই। যতক্ষণ না গণভোটের রায় অনুযায়ী পুরো সংস্কার বাস্তবায়ন না হয়। এটি সনদের ভিত্তিতে করা হলে তখন জামায়াত আইনি ভিত্তি দেখে বিষয়টি বিবেচনা করবে।
নির্বাচনের পরে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই নেতা বলেন, নির্বাচনের পরে যে ধরনের আন্দোলন বিগত সময়ে হয়েছিল, জামায়াত বুঝেশুনেই সেই পর্যায়ে যেতে চাচ্ছে না। জামায়াত এক্ষেত্রে এক ধরনের পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে। অহিংস আন্দোলন ও প্রতিবাদ করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে জামায়াত মাঠে আরও শক্ত অবস্থানে যাবে। পাশাপাশি সংসদেও যথাযথ ভূমিকা পালন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিরোধী দলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আইনজীবী শিশির মনির, জাহিদুর রহমান প্রমুখ।
আরএএস/এমএমকে