নতুন দিগন্তের খোঁজে প্রবাসী শ্রমবাজার: ছাঁটাই ও অনিশ্চয়তায় করণীয়
রাজশাহীর একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১২ জন তরুণ জাপানে যান কনস্ট্রাকশন ও ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে। আগে তারা মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বারবার চাকরি হারানোর ভয়ে হতাশ হয়ে পড়েন।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা জাপানি ভাষা ও কর্মসংস্কৃতি শিখেন। শুরুতে তাদের কাজের ধরন, সময়ানুবর্তিতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে কঠিন মানদণ্ডে পরীক্ষা দিতে হয়। তবে ধীরে ধীরে তারা সেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন। আজ তারা শুধু ভালো বেতনই পাচ্ছেন না, বরং নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও পাচ্ছেন।
এই কেস স্টাডি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—দক্ষতা থাকলে নতুন বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, সেখানে দক্ষ শ্রমিকরা নতুন দিগন্তে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে পারছেন।
প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নন, তারা দেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাদের ঘাম ও শ্রমে গড়ে ওঠা রেমিট্যান্স অর্থনীতি আমাদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তাই তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বর্তমান সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন—যাতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের এই কঠিন সময় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় এবং ভবিষ্যতে তারা আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।
দুই.
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি প্রধান গন্তব্য। জীবিকার তাগিদে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছেন, পরিবার-পরিজনের মুখে হাসি ফোটাতে নিজেদের স্বপ্ন-সুখ বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে প্রবাসীদের জীবন হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা, ছাঁটাই আর আতঙ্কে ভরা।
প্রথমত, বিশ্ব অর্থনীতির টানাপোড়েন মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তেলের দামের ওঠানামা, বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক কোম্পানি খরচ কমানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফল হিসেবে শুরু হয়েছে কর্মী ছাঁটাই। নির্মাণ, সেবা খাত, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিল্প কারখানাতেও শ্রমিক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকরা, কারণ তারা সাধারণত চুক্তিভিত্তিক ও কম নিরাপত্তা সম্পন্ন চাকরিতে নিয়োজিত।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয়করণ নীতির (Localization policy) প্রভাবও প্রবাসীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নিজস্ব নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বিদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। সৌদি আরবের “সৌদাইজেশন” বা অন্যান্য দেশে অনুরূপ নীতির ফলে অনেক প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন অথবা নতুন কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক প্রবাসীকেও দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের মানসিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চাকরি হারানোর ভয়, বেতন কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং কাজের পরিবেশের অবনতি—সব মিলিয়ে তারা এক ধরনের স্থায়ী উদ্বেগে ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। এসব পরিস্থিতি তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
চতুর্থত, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, নতুন প্রকল্প স্থগিত করে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত করে। ফলে প্রবাসীরা একদিকে যেমন চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু যদি প্রবাসীরা ব্যাপকভাবে চাকরি হারাতে থাকেন বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও এর প্রভাব পড়বে—বেকারত্ব বাড়বে, দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে এবং সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে, যাতে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষিত থাকে। শ্রমচুক্তি, বেতন কাঠামো এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, নতুন শ্রমবাজার খোঁজার উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া বা অন্যান্য সম্ভাবনাময় অঞ্চলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করা দরকার। এর জন্য দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বিশ্বজুড়েই রয়েছে, তাই প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়া সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা দেশে বসেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবেন।
চতুর্থত, প্রবাসীদের জন্য মানসিক সহায়তা ও পরামর্শ সেবা চালু করা জরুরি। দূরদেশে একাকীত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা শ্রমিকদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে প্রবাসীরা প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা পান।
তিন.
নতুন শ্রমবাজার খোঁজা মানে শুধু নতুন দেশ খুঁজে বের করা নয়—এর সঙ্গে দক্ষতা, নীতি, তথ্য এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ একসাথে কাজ করতে হয়। কার্যকরভাবে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে নিচের বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন (Skill Development)
বর্তমান বিশ্বে কেবল শ্রমশক্তি নয়, দক্ষ শ্রমিক সবচেয়ে বেশি চাহিদায়। তাই নার্সিং, আইটি, নির্মাণ প্রযুক্তি, হোটেল-ম্যানেজমেন্ট, মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল স্কিল—এসব খাতে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেশি। তাই আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিলে এসব বাজারে প্রবেশ সহজ হয়।

দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক তৎপরতা ও সরকারি উদ্যোগ
নতুন শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (Bilateral Agreement) করতে হবে, যাতে কর্মীদের অধিকার, বেতন, আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। যেমন—ইউরোপীয় দেশ, পূর্ব ইউরোপ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে শ্রম চুক্তির সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, তথ্যভিত্তিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণ
কোথায় কী ধরনের শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে, কোন দেশে শ্রমিকের ঘাটতি আছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। এর জন্য একটি শক্তিশালী Labour Market Intelligence System দরকার, যা সম্ভাবনাময় বাজার চিহ্নিত করবে।
চতুর্থত, বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সির মান উন্নয়ন
অনেক সময় অসাধু দালাল বা এজেন্সির কারণে নতুন বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই লাইসেন্সধারী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক এজেন্সি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকলে দেশের ভাবমূর্তি ভালো হয় এবং নতুন বাজারে আস্থা তৈরি হয়।
পঞ্চমত, প্রবাসী কল্যাণ ও দূতাবাসগুলোর সক্রিয় ভূমিকা
যেসব দেশে ইতোমধ্যে কিছু শ্রমিক কাজ করছে, সেখানকার দূতাবাসগুলোকে নতুন সুযোগ খুঁজে বের করতে হবে। স্থানীয় কোম্পানি ও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে নতুন চাহিদা তৈরি করা সম্ভব।
ষষ্ঠত, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজার অনুসন্ধান
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশি চাকরির সুযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা যেতে পারে। অনলাইন পোর্টাল, অ্যাপ বা আন্তর্জাতিক জব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রবাসীদের জন্য সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
সপ্তমত, ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি
নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে হলে ভাষা একটি বড় বাধা। তাই ইংরেজি ছাড়াও জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ইত্যাদি ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতি ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিলে অভিযোজন সহজ হয়।
অষ্টমত, বিভিন্ন খাতে বৈচিত্র্য আনা
বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। এটি কমিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া এবং এমনকি আফ্রিকার কিছু দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করা দরকার। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, কৃষি, আইটি ও সেবা খাতে নতুন সুযোগ খোঁজা যেতে পারে।
সবশেষে, সমন্বিত জাতীয় নীতি
নতুন শ্রমবাজার তৈরি করতে হলে সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, রিক্রুটিং এজেন্সি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয় প্রয়োজন। একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই শ্রমবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
নতুন শ্রমবাজার খোঁজা শুধু শ্রম রপ্তানি নয়—এটি একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। দক্ষতা, তথ্য, কূটনীতি এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ে এগোতে পারলেই বাংলাদেশ তার প্রবাসী শ্রমশক্তির জন্য আরও নিরাপদ ও বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে পারবে।
চার.
প্রবাসীরা শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নন, তারা দেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাদের ঘাম ও শ্রমে গড়ে ওঠা রেমিট্যান্স অর্থনীতি আমাদের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তাই তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বর্তমান সংকট আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে না পারলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন—যাতে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের এই কঠিন সময় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় এবং ভবিষ্যতে তারা আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এএসএম