রাজনীতির বিষ স্কুলে নয়

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত: ১২:১৭ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭

এখন দেশে একটা বিপদজনক রাজনীতিবিমুখ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। জিজ্ঞেস করলেই তারা স্মার্টলি জবাব দেয়, ‘আমি রাজনীতি পছন্দ করি না। ‘শুধু নতুন প্রজন্মই নয়, সব বয়সের মানুষের মধ্যেই রাজনীতি নিয়ে এক ধরনের অনীহা কাজ করে। সাধারণ মানুষ রাজনীতিকে এক ধরনের ভয় পায়। তাই দূরে থাকে। এই প্রবণতা দেশ ও জাতির বিপদজনক। ব্যাপারটা যদি এমন হয়, মেধাবীরা সব বিসিএস ক্যাডার হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে বা ভালো চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে যাবে আর ছাত্র হিসেবে খারাপ এবং মাস্তানরাই শুধু রাজনীতি করবে; তাহলে আমাদের কপালে সত্যি খারাবি আছে। কারণ ব্যাপারটা খুব সহজ, যারা রাজনীতি করবে, তারাই ভবিষ্যতে এমপি-মন্ত্রী হবে; রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করবে।

একটু কল্পনা করুন, ক্লাশের মেধাবী ছাত্রটি বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে গেল আর মাঝারি মানের ছাত্রটি রাজনীতি করলো। যে বিসিএস’এ গেল সে প্রমোশন পেতে পেতে সচিব হলো। আর মাঝারি ছাত্রটি ধাপে ধাপে মন্ত্রী হলো। এখন মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত কিন্তু মন্ত্রীই নেবেন, সচিব তা কার্যকর করবেন শুধু। তার মানে কম মেধাবীরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আর বেশি মেধাবীরা তা কার্যকর করছেন। ব্যাপারটা যদি উল্টো হতো, যদি মেধাবীরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার জায়গায় থাকতো, তাহলে তা দেশ ও জাতির জন্য আরো কল্যাণকর হতো। ভাবুন মতিয়া চৌধুরী না হয়ে শাজাহান খান যদি কৃষিমন্ত্রী হতেন, তাহলে কি বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জিন আবিষ্কার করার মত গবেষণা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে পারতেন?

গবেষণায় কমিশন নেই, এটা জানলে অধিকাংশ মন্ত্রীই হয়তো এর পেছনে সময় এবং অর্থ ব্যয় করতে রাজি হতেন না। আমাদের গবেষণায় আগ্রহ কম, সব আগ্রহ বড় বড় নির্মাণ কাজে আর বিদেশ সফরে। এই যেমন বঙ্গভবনের সুইমিং পুলটি চালু হওয়ার পর তার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ইউরোপের তিন দেশ সফরে যাচ্ছেন পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের আট কর্মকর্তা!

বলছিলাম রাজনীতির কথা। আমি নিজে তুমুল রাজনীতিমুখী মানুষ। আমি বিশ্বাস করি, রাজনীতিই আমাদের শেষ ভরসা। সবচেয়ে খারাপ গণতন্ত্রও অন্য যে কোনো ব্যবস্থার চেয়ে ভালো। এই শিক্ষা আমার জীবন থেকে নেয়া। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ব্যয় করেছি নিজের ছাত্রজীবনের একটা বড় অংশ। তাতে একাডেমিক ক্যারিয়ারের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বটে। কিন্তু এখন পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়েছি সেই রাজনীতি থেকেই। নিজের যৌবন এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ব্যয় করতে পেরেছি বলে আমি সবসময় গর্ব করি।

ব্যক্তিগতভাবে ছাত্র রাজনীতির কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ছাত্র রাজনীতি একজন ছাত্রকে সাহসী করে, দায়িত্বশীল করে, স্বার্থপরতার উর্ধ্বে উঠে ভাবতে শেখায়। জীবনের সমস্যাগুলো সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে শেখায়। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নেতৃত্ব দিতে শেখায়। একজন রাজনৈতিক কর্মী কখনোই তার সহযোদ্ধাকে বিপদে ফেলে পালায় না। একজন রাজনৈতিক কর্মী কখনোই একা কিছু খাবে না, কেউ কারাগারে গেলে বা পালালে তার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকবার পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়াতে হয়েছে। সেখান থেকে সবাইকে নিয়ে নিরাপদে ফিরতে নিতে হয়েছে অনেক তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর শুরু হয়েছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্ব। সেদিন জেহাদসহ অনেকের আত্মত্যাগে শুরু হওয়া আন্দোলন চূড়ান্ত গতি পায় ২৭ নভেম্বর ডা. শামসুল আলম মিলনের আত্মদানে। তারই ধারাবাহিকতায় ৬ ডিসেম্বর পতন ঘটে এরশাদের। ১০ অক্টোবর সেই আন্দোলনে গিয়েছিলাম দুই অরাজনৈতিক সহকর্মীকে নিয়ে। তাদের আন্দোলন দেখার শখ ছিল। কিন্তু সেদিন ব্যাপক সংঘর্ষ বেধে গেলে তাদের আন্দোলন দেখার শখ বিপদজনক হয়ে দাঁড়ায়।

পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ আর টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝালো আক্রমণ থেকে সেই দুই বন্ধুকে বাঁচাতে আমাকে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। সারাদিন পালিয়ে ছিলাম তখনকার আউটার স্টেডিয়ামের ভেতরে। কাছেই দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছে আল্লাহওয়ালা ভবন থেকে ছোড়া গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন ছাত্রনেতা জেহাদ। আউটার স্টেডিয়ামের ভেতরে বসে সেই গোলাগুলির আওয়াজ শুনছিলাম। আর দেখছিলাম মতিঝিলে তখনকার বিমান অফিসের সামনে সারিবাধা গাড়িতে দেয়া আগুনের লেলিহান শিখা।

মানুষের জীবনটা শুধু হেসে খেলে, বিয়ে করে, ছাও পুষে পার করে দেয়ার জন্য নয়। জীবনের আরো মহত্তর লক্ষ্য আছে। আছে সমাজকে রাষ্ট্রকে, বিশ্বকে আরো ভালোর পথে বদলে দিতে আপনার জীবনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। এখন রোবটেরও বুদ্ধি আছে, কিন্তু মানুষ রোবট নয়। গাছেরও জীবন আছে, কিন্তু মানুষ গাছ নয়। মানুষ সৃষ্টির সেরা। কারণ মানুষের জীবন আছে, বুদ্ধি আছে, বিবেক আছে, বিবেচনা আছে। এই পৃথিবীকে আরো বাসযোগ্য করতে, আরো উন্নত করতে সে তার আদর্শকে কাজে লাগাবে।
ভালোর সাথে মন্দের পাথক্য করবে। একজন ছাত্রের মধ্যে সেই আদর্শিক চেতনার বীজ বুনে দেবে ছাত্র রাজনীতি।

এত কথা বলা আসলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি বিজ্ঞপ্তি। গত ২১ নভেম্বর পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের সকল ইউনিটকে তাদের অন্তর্গত মাধ্যমিক স্কুলে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার মানে স্কুল পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে ছাত্রলীগ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ হয়েছিল স্কুল জীবনেই। স্কুল পরিদর্শনে আসা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পথ আগলে কিশোর শেখ মুজিবের হোস্টেল মেরামতের দাবি তোলার গল্প সবারই জানা। তাছাড়া ইসলামী ছাত্রশিবির এবং বাম সংগঠনগুলো স্কুল পর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক তৎপরকতা চালায়। মাদ্রাসা বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসায় একটি বিশেষ গোষ্ঠির ব্রেইন ওয়াশ শুরু হয় শিশুকাল থেকেই। তাই ছাত্রলীগও স্কুল জীবন থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ছাত্রলীগের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে চায়। খুব ভালো কথা, ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রচন্ড রাজনীতিমুখী মানুষ হওয়া সত্বেও আমি স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের কমিটি করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছি।

আমার আপত্তি ছাত্রলীগ বা ছাত্র রাজনীতি নিয়ে নয়। আমার আপত্তি ছাত্র রাজনীতির বর্তমান হাল নিয়ে। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬২এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র নেতারাই ছিলেন সামনের কাতারে। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পর থেকেই যেন ছাত্র রাজনীতি তথা রাজনীতি হাঁটছে পেছনের পায়ে। গত ২৭ বছরে ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের জন্য, দেশের জন্য, জাতির জন্য কী করেছে? টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মারামারির মত নেতিবাচক কারণেই বারবার শিরোণাম হয়েছে ছাত্রনেতারা। যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, সেই দলের ছাত্র সংগঠন এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে শিক্ষাঙ্গনে।

একসময় ছাত্রলীগ ছিল আওয়ামী লীগের মূল শক্তি। কিন্তু গত ৮/৯ বছরে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের দায় হিসেবে বদনাম কুড়িয়েছে। এমনকি ছাত্রলীগের অপকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেতার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোরও ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন ‘ছাত্রলীগ’ লিখে গুগলে সার্চ দিলে যা আসে তার সব নেতিবাচক খবর। এই অবস্থায় আগে ছাত্র রাজনীতিকে পরিচ্ছন্ন করতে হবে, সুনির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে মেধাবী ছাত্রদের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। রাজনীতি যেদিন পরিচ্ছন্ন হবে, আদর্শিক হবে, মেধাবীদের হবে, দুর্বৃত্তদের কবল থেকে মুক্তি পাবে; সেদিন স্কুল পর্যায়ে রাজনীতি নিয়ে যান আপত্তি নেই। ততদিন স্কুল কমিটি করার উদ্যোগ স্থগিত থাকুক। বন্ধ করা হোক স্কুল পর্যায়ে ছাত্রশিবির, বাম ছাত্র সংগঠন বা অন্য কোনো গোষ্ঠির রাজনৈতিক তৎপরতা। ছাত্র রাজনীতির বদলে স্কুল পর্যায়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক তৎপরতা, দেয়াল পত্রিকা, বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা ধরনের তৎপরতা আরো বাড়ানো যেতে পারে। আর পাঠ্যবইয়ে শেখানো হোক মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। মূল রাজনীতিকে বিষমুক্ত না করে সেই বিষ স্কুল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আত্মঘাতী হবে। তাতে রাজনীতির প্রতি মানুষের অনীহা আরো বাড়বে।

২৭ নভেম্বর, ২০১৭

jagonews24
probhash2000@gmail.com

এইচআর/পিআর

মূল রাজনীতিকে বিষমুক্ত না করে সেই বিষ স্কুল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আত্মঘাতী হবে। তাতে রাজনীতির প্রতি মানুষের অনীহা আরো বাড়বে

আপনার মতামত লিখুন :