তেল চকচকে আইএস বনাম আবাল আকায়েদরা

তানজীনা ইয়াসমিন
তানজীনা ইয়াসমিন , কলামিস্ট, গবেষক
প্রকাশিত: ০৪:১৫ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭

১৯৯৮ সনের কোন এক দুপুরে আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় দুই ভাই আমাদের বাসায় এসেছিলেন। গন্তব্য তাদের মধ্যপ্রাচ্য। ঢাকায় এসে যাত্রাবিরতি। স্বপ্নচারী দুই সদ্য যুবক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ভাগ্যান্বেষণে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ, দুর্নীতিপূর্ণ এক দেশ থেকে, যেখানে বেকারত্বের হার ঊর্ধ্বমুখি, সুযোগের হার বিলীনপ্রায়, শিক্ষার হার বাড়লেও সুশিক্ষার হার দেশের জন্মলগ্নের চেয়েও খারাপ, উন্নয়নের নামে প্রহসন আর উপর্যুপরি ভুল শাসনে বিপর্যস্ত। এই অসহায় বেঁচে থাকার চেয়ে মরিয়া মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বিদেশপাড়ি কাঙ্খিত। আজ তাদের মুক্তির দিন এসেছে। তারা স্বপ্ন দিয়ে আমাদের গোটা ঘরটাই ভরে তুলছিল, আর আমি আতঙ্কিত হচ্ছিলাম তাদের বড় ভাইয়ের মুখ থেকে শোনা অভিজ্ঞতা স্মরণ করে। শুধু জিজ্ঞেস করলাম, - বিদেশে এসব কায়িক শ্রমের অনেক কষ্ট করতে হয়। শুধু জীবিকার কাজটাই অমানবিক না, দিনের শেষ বাসায় নিজের রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর সাফ সবকিছুই । এসব শিখে নিয়েছ?

স্বপ্নচারী তার স্বপ্নটা এসব নেগেটিভ তথ্য দিয়ে নষ্ট দিতে চায়না। -আরে না ভাবী! দেশেও আমি লাটসাহেবের মত ছিলাম, ঐখানেও তাই থাকবো। আহারে দুরাশা। তাদের বড়ভাই বিদেশে গিয়েছিলেন পারিবারিক জমি বিক্রি বন্ধক করে। আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে বলেছিলেন, -এক ক্যান কোকও কোনদিন কিনে খাইনা রে বোন, মনে হয় এই টাকাটা বাঁচায়ে দেশে পাঠাই। রাতে যেই ঘরে সবাই ঘুমাই, দোকানের চাতালে, সেই ঘরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না। হামাগুঁড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়। সপ্তাহে একদিন ছুটি, সেদিন বিচে গিয়ে সবাই মিলে গল্প করি। এটাই আমাদের বিনোদন! আর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখতাম, তাঁর সেই কোকের ক্যান বাঁচানো পয়সায় সারাদিন আড়াপাড়ার লোক এসে আড্ডা দিচ্ছে আর বিস্কিট, চানাচুর ইত্যাদি চলছেই বেশুমার। তার সেই হামাগুঁড়ির গুমটি ঘরে বাস করে বাঁচানো পয়সায় বাড়িতে নতুন দালান উঠছেই। রোজার মাসে বোনদের শ্বশুরবাড়িতে ডালাকুলা ভরে ইফতার না গেলে ইজ্জত থাকে না।

তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন ভালো টাকা পয়সা জমিয়ে দেশে ফিরে আসবেন। দেশেই ব্যবসাপাতি করে থাকবেন পরিবার স্ত্রী পুত্রের সান্নিধ্যে। সেই সুযোগও হয় না, ওনার ফেরাও হয় না। আমরাও যারা আশীর্বাদপুষ্ট থেকেই বিদেশে পড়াশোনা বা গবেষণার উন্নত সুযোগের জন্য এসেছি, তারাও প্রতিদিন দেশের খবরের কাগজ, নিউজ চ্যনেলে খোঁজ রাখি যে দেশে আগাচ্ছে কিনা, সুযোগ তৈরি হচ্ছে কিনা, রাজনৈতিক অশান্তি, চূড়ান্ত অনিরাপত্তা কমেছে কিনা, দেশে ফিরে যেতে পারি কিনা। কিন্তু নিয়মিত গুম, খুন, ব্যাংক লুট, আইনের শাসনের অস্তিত্বহীনতায় বুঝতে পারি অশান্তি, হাহাকার নিয়েই বিদেশে থাকতে হবে।

শ্রমজীবিরা বুঝতে পারেন, তাদের সহায় সম্বল বেঁচে আসা পয়সার শোধ দেশে গেলে দেয়া হবে না, এতগুলি মুখের খাবার জুটবেনা । ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে পরিবারের ছবি দেখে কথা বলে দিন কাটায়, ফেরার মিথ্যা আশ্বাস দেয় বুড়া বাবা মাকে, স্ত্রীকে। একসময় নিজেও সেই মিথ্যা বিশ্বাস করতে শুরু করে, নাহলে বাঁচা যায় না। তার হাত ধরে পরিবারের, গ্রামের আরো ভাগ্যহারা ছেলেরাও যায় এই চোরাবালি থেকে অজ্ঞাত অন্যরকম চোরাবালিতে। আমার সেই আত্মীয়ও ভাইদের নিয়ে গেছেন, তারাও দেশে সংসার করেছে, বছর দুবছরে দেখতে আসে। আবার দেখা হলে দেখতাম সেদিনের সেই স্বপ্নচারী যুবকদের স্বপ্নে এখন আর কিছু আছে কিনা।

থাকতেও পারে, কারণ তারা বিরল সৌভাগ্যবান! তাদের কেউ ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি হয়নি, কেউ বিমানের চাকায় চড়ে যাবার আশায় থেতলে বা থাইল্যান্ডের গণ কবরে লাশ হয়নি, কেউ কন্টেনারের ভেতরে চড়ে পৌঁছায়নি স্বপ্নের দেশে- পথেই যাদের অর্ধেক স্বপ্নচারী ঝরে যায়। আনিসুল হকের এই নিয়ে লেখা উপন্যাসটা পড়া যায় না! কারণ সেটা ছিল তাঁর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা গল্পের মোড়কে লেখা অমানুবিক বাস্তবতা। শিল্পী তৌকির আহমেদের “ অজ্ঞাতনামা” কেউ না দেখে থাকলে অবশ্যই দেখবেন । কারণ এই ১ কোটি প্রবাসীর রেমিটেন্সের পয়সাই এই মুহূর্তে আমাদের ২য় প্রধানতম আয়ের উৎস। “বাসন মাজতে যায়” বলে যেই প্রখ্যাত লেখক গালি দিয়েছিলেন, তিনি সবার আগে পড়ুন। বলুন তিনি কি মেজে বা লিখে দেশের কোন উপকারটা করেছেন।

“অজ্ঞাতনামা”য় দেখিয়েছিল গ্রামের তুলনামূলক অবস্থাপন্ন, সন্মানিত বাড়ির ছেলেটাও বিদেশে গিয়ে দালালের কথামত তার পাসপোর্ট দিয়ে দেয়। তার গলাকাটা পাসপোর্টে পাঠানো হয় হতদরিদ্র ঘরের ছেলেটাকে যে লাশ হয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। পাসপোর্ট জটিলতায় যাই ঘটে অবৈধ এসব অভিবাসীর এছাড়া আর কোন উপায় নেই। এবং এই পাসপোর্ট নাই বলেই তাদের ব্যাপক চাহিদা এক গ্রুপের কাছে! তারা অনেক কম মজুরিতে তাদের কাজে নিতে পারে। কাজেই মালিকও চায় না তারা কোনদিন বৈধ হোক। আজ ডোনাল্ট ট্রাম্প অভিবাসীদের উপর যে খড়গ তুলেছেন সেই খড়গ কতটা ভয়াবহ শানিত করে দিল এই আকায়েদ ছেলেটা তা বলাই বাহুল্য।

হয়তো বহুলোক ভিসা বাতিলের আওতায় পড়বে, পুশ ব্যাক বাড়বে, সন্দেহের তালিকা তীব্র হবে, স্টুডেন্টদের ভিসা বাতিল হবে। নিজের প্রতিবেশি, বন্ধু জানে একজন ভালো; রাস্তার এক সাধারণ আমেরিকান জানে না। সে বাংলাদেশি পরিচয় পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তেও পারে। হেজাবি মেয়ের ট্রেন স্টেশনে আক্রান্ত হবার ভিডিও ক্লিপ শেয়ারই আছে। আর এখন বাংলাদেশি তকমা এই আক্রমণ আরো পোক্ত করলো। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী বাংলাদেশিদের জন্যই নয়, খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাংলাদেশি সমাজের জন্যও।

আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে ‘মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ’ বলে বর্ণনা করে থাকে। এই ভাবমূর্তিও যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক হয়ে আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে সন্দেহভাজন হামলাকারী আকায়েদ উল্লাহ বাংলাদেশ, বাংলাদেশি বা মুসলমান সম্প্রদায়- এসবের কোনো কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করেন না। এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটায় তারা বিচ্ছিন্ন সমাজবিরোধী, মানবতাবিরোধী অশুভ শক্তির প্রতিনিধি, যে শক্তিকে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে।

আজকে তার পরিচয় উন্মোচনে তার ঢাকাস্থ শ্বশুরবাড়িতে অবস্থানরত স্ত্রী, ৬ মাসের শিশুপুত্রসহ শ্বশুর - শ্বাশুরী , শ্যালক সবাইকে থানায় টান দিল। চট্টগ্রামে তার পরিবারকেও খোঁজা হচ্ছে। আমেরিকাতেও তার সাথে তার ভাই , বোন থাকতো। স্রেফ গালী উঠে আসে এসব অপদার্থ বাংগালীর জন্য! কাজ ফেলে বোমাটাও ঠিকমত বানাতে পারেনাই যে অন্তত সে উড়ে যাবে । তারও কিনা ধর্মের প্রতি তার দায় আছে, অথচ দেশের প্রতি নাই! নতুন স্ত্রী, কোলের সন্তানের প্রতিও না! বিশ্বের দেশে দেশে মুসলমান আজকে নির্যাতিত । প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, ইরাক, কাশ্মীর, লিবিয়া, আফগানিস্তান সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামের রক্ষকদের ঘাড়ে পা দিয়েই ইসলাম বিরোধী শক্তি দিয়ে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে চলেছে। তাই আকায়েদ এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া । তাই গাছের ডালে বসে সেই ডালই কাটার মত পেশা জীবিকা বাদ দিয়ে টিউটোরিয়াল দেখে বোম বানানো শিখেছে, সুইসাইড মিশনে জান দেবে - মুসলমান উম্মাহর প্রতি ভালোবাসার আর মুসলমান জাতির প্রতি অবিচারের প্রতিশোধ।

বিশ্বের দেশে দেশে নির্যাতিত মুসলমানেরা যেমন আপনার মুসলমান সমাজ বা ব্রাদারহুড , ঠিক তেমনি আপনার দেশের নিরপরাধ, আশাহীন সতেরো কোটি মানুষ আপনার বাংলাদেশী ব্রাদারহুড। এদের প্রতি নূন্যতম দায় হলো টেরোরিজমে জড়িয়ে এদের অল্প হলেও যে সম্ভাবনা যা আছে তা ধ্বংস না করা। রীজিকের প্রতি বেঈমানী ইসলাম আপনাকে শেখায় নাই, তাই পশ্চিমের অন্যায়ের শোধ নেবার আগে আপনার এই বোধ আর জন্মের শোধের কথা মাথায় রাখেন। আত্মিক শান্তি পূরণ না হলে সাদকায়ে জারীয়ার ব্যবস্থা করেন। দেশে অনেক বঞ্চিত শিশু আছে। তাদের পড়ালেখার খরচ যোগান, স্কুল করে দেন, আর ইউটিউব দেখে কিছু শিখতে হলে মানবতার কল্যাণে কিছু বানাতে শেখেন, কারণ সেটাই মানব ধর্ম, যেই ধর্ম না থাকলে আপনি পশু - যার কোন ধর্মই নাই। তেল চকচকে আইএস টেরোরিজমের কথা ভাবতে পারে, আপনার মত বাংলা মায়ের আবাল আকায়েদ , নাফিসরা ভাবতে পারে না ।

লেখক : কলামিস্ট; প্রাক্তন রিসার্চ ফেলো, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়; বিভাগীয় প্রধান, বিজনেস প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট, স্মার্ট সার্ভিস টেকনোলজিস কো. লিমিটেড, ফুকুওকা, জাপান।
neeta2806@yahoo.com

এইচআর/জেআইএম

“আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলো ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে ‘মধ্যপন্থী মুসলিম দেশ’ বলে বর্ণনা করে থাকে। এই ভাবমূর্তিও যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক হয়ে আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের জোরের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে সন্দেহভাজন হামলাকারী আকায়েদ উল্লাহ বাংলাদেশ, বাংলাদেশি বা মুসলমান সম্প্রদায়- এসবের কোনো কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করেন না।”

আপনার মতামত লিখুন :