দুর্ঘটনায় মৃত্যু কেবলি পরিসংখ্যান নয়

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ১০:০৮ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সড়ক দুর্ঘটনা কিছুতেই কমছে না, বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। অবস্থা ‘মহামারী’ আকার ধারণ করেছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। একটি ঘটনার রেশ না কাটতেই আরেকটি ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর থাকছে। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক। বিষয়টি এতটাই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়ে যে দুর্ঘটনায় মৃত্যু যেন কেবলি একটি সংখ্যা! সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে। কোন কোন দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান। তখন ওই পরিবারের যে কী অবস্থা হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জানুয়ারি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন দেশে গড়ে ১৪ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ এক মাসে ৪২৫ জন নিহত এবং ৯৫০ জন আহত হয়েছেন। প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটেছে গড়ে ১৩টি। এ ছাড়া একই মাসে রেলপথে ৩২টি দুর্ঘটনায় চার শিশুসহ ২৮ জন নিহত ও ১১ জন আহত এবং নৌপথে ১০টি দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। বেসরকারি সংগঠন নৌ সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনটি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশের ২২টি বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিক, ১০টি আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং আটটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদ সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।

জাতীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সড়ক পরিবহন খাতে বিরাজমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর নজরদারির অভাবই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। এই খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হলো চাঁদাবাজি বন্ধ, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র ও সাপ্তাহিক ছুটি প্রদান, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও দৈনিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল ও জাল লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ, চালক ও সহকারিদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক চিহ্নিতকরণ ও বেহাল সড়ক সংস্কার এবং বিদ্যমান মোটরযান চলাচল আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ।

এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে গড়ে বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা দেড় ভাগ নষ্ট হয়, যার পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। বিগত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এখন অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সঙ্গতকারণেই এই সমস্যা থেকে মানুষজনকে মুক্ত রাখার সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

দুর্ঘটনার কারণগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সকলেই কমবেশি জানেন। এর মধ্যে রয়েছে- দেশে সড়ক অবকাঠামো এবং স্থলভাগের আয়তন অনুপাতে জনসংখ্যার চাপ বেশি। সড়কের তুলনায় মোটরযানের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। একই সড়কে চলছে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশাসহ নানা রকম মিশ্র যানবাহন। উপরন্তু সড়ক ও মহাসড়কগুলো ত্রুটিপূর্ণ। দেশব্যাপী মহাসড়কের অনেক স্থানেই রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক। এসব বাঁকের কারণে প্রায়শই সেসব জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া অবকাঠামোগত কারণেও দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি খুব বেশি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সম্প্রতি দুর্ঘটনা মহামারীর আকার ধারণ করার জন্য যেসব কারণকে দায়ী করা হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো। এই সমস্যা বার বার চিহ্নিত হলেও এর কোন প্রতিকার নেই।

প্রতিবার দুর্ঘটনার পর পরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদন কোনদিন আলোর মুখ দেখে না। আর সঙ্গত কারণেই দোষীদের শাস্তিও হয় না। সমাজের উঁচু স্তর থেকে নিচু শ্রেণির মানুষ- যারাই দুর্ঘটনার শিকার হন না কেন কোন একটি ঘটনার বিচার হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত মেলা ভার। আর বিচারহীন, প্রতিকারহীন অবস্থায় কোন কিছু চলতে থাকলে সেটির পুনরাবৃত্তিও তো ঘটবেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কত প্রাণ গেলে, মৃত্যুর মিছিল কত দীর্ঘ হলে তবে থামবে এই হত্যাযজ্ঞ?

সড়ক দুর্ঘটনা হয় না এমন দেশ নেই। কিন্তু দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতি যত কমিয়ে আনা যায় সেটিই লক্ষ্য হওয়া উচিত। ভাল যান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক, সড়ক ব্যবস্থা উন্নতকরণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিক ও যুগোপযোগী করার বিষয়গুলো তো রয়েছেই। এর সঙ্গে দুর্ঘটনায় পতিতদের ত্বরিত চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আইনি জটিলতার কারণে আহতদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা হয়। এ সমস্যাটি সমাধানেও ব্যবস্থা নিতে হবে।

এইচআর/এমএস

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলো চাঁদাবাজি বন্ধ, শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগপত্র ও সাপ্তাহিক ছুটি প্রদান, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও দৈনিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল ও জাল লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ, চালক ও সহকারিদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক চিহ্নিতকরণ ও বেহাল সড়ক সংস্কার এবং বিদ্যমান মোটরযান চলাচল আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।