কোটা নিয়ে এই কু-কাণ্ড এড়ানো যেতো

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০১:২৬ পিএম, ০৩ জুলাই ২০১৮

সরকার শেষ পর্যন্ত কোটা সংস্কারের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। ২ জুলাই সন্ধ্যের সময় এই খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার আগে দুপুরবেলা মন্ত্রিপরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকের পর নিয়মিত প্রেস-ব্রিফিং-এও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের বক্তব্য ছিল দায়সারা।

তিনি বলেছেন যে, কোটা সংস্কারে সময় লাগবে এবং এখনও এ বিষয়ে কোনো কমিটি বা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। প্রশ্ন হলো, হঠাৎ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে এমন কী ঘটলো যে, সন্ধ্যের মধ্যেই কোটা সংস্কারে একটি কমিটি গঠিত হলো এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই কমিটিকে একটি রিপোর্ট পেশের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হলো? এই কমিটি ও নির্দেশনা কি আরো আগে আসতে পারতো না?

কী সমস্যা ছিল তাতে? কেন সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরেই কোটা সংস্কারে এই কমিটির ঘোষণা এলো না? কেনইবা কোটা আন্দোলনকারীদের নতুন করে রাস্তায় নামতে হলো? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছে সেসব কি সাধারণ্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো যদি সরকার তাদেরকে নতুন করে রাস্তায় নামার সুযোগ করে না দিতো?

এখন সব দোষ ও দায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপানো হচ্ছে, আন্দোলনকারীদের নেতৃস্থানীয় ছাত্রনেতা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “দেশটা কি তার বাবার?” এই প্রশ্ন শুধু ভয়ঙ্কর নয়, আইনগত ভাবেও অপরাধ- আমরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি যারা বাংলাদেশের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞাত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবেই তারা বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি করে, অবহেলা প্রদর্শন করে। তারাই যখন কোটা সংস্কারের আন্দোলন করে এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ সরকারকে চালানোর ইচ্ছা রাখে তখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু আজকে এই দুর্বিনীত, ইতিহাসকে অগ্রাহ্যকারী তরুণদেরও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সমর্থন দিচ্ছে। এর কারণ আর কিছুই নয়, এদেরকে সরকারের ভেতরকার ‘ভূত’ সে সুযোগটুকু করে দিয়েছে। আগেই বলেছি যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরেই কোটা সংস্কারে একটি কমিটি গঠন করা যেতো এবং তারা সময় চাইতে পারতো তাদের রিপোর্ট প্রদানের জন্য। কিন্তু সেটি করা হয়নি।

ইতোমধ্যেই জানা গিয়েছিল যে, বিশ্বব্যাংকের প্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিব, আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটির প্রধান, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনের প্রধান একই সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তাদের উদ্দেশ্য রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন হলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অবস্থা জানাটাও যে তাদের এজেন্ডায় ছিল না একথা কি হলপ করে বলা যায়? যায় না।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে যারা খোঁজখবর রাখেন তারা একথা নিশ্চিত ভাবেই জানেন যে, বাংলাদেশসহ অনেকগুলো দেশই এখন পশ্চিমা মুরুব্বিদের ‘স্ক্রটিনি’র তালিকায় রয়েছে। ফলে দেশটি কী করছে, কী ভাবে রাজনীতিকে সামলাচ্ছে, ক্ষমতাসীন সরকার ও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উন্মুখ রাজনৈতিক দলগুলো কী আচরণ করছে সে বিষয়েও নজরদারির বিষয়টি এই মুহূর্তে লক্ষ্যণীয়।

ঠিক এরকমই একটি সময়ে এতোগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের উপস্থিতিকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গণে যখন কোটা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হলো, তাতে আসলে কী মেসেজ গেলো সকলের কাছে? সকলে দেখে গেলেন যে, বাংলাদেশে যৌক্তিক (?) আন্দোলনেও সরকারের বাহিনী এবং পুলিশ একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে দমন করতে চাইছে। এটা যদি বিএনপি-জামায়াত বিদেশিদের কাছে প্রমাণ করতে চেয়ে থাকে, অর্থাৎ কোটা আন্দোলনকারীদের তারা ব্যবহারও করতে চেয়ে থাকে তাহলেও তারা এতে সফল হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। কারণ যে মুহূর্তে আর্ন্তাজিতক সংস্থার প্রধানরা কক্স’স বাজার গিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করছেন, বাংলাদেশের প্রশংসা করছেন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ঠিক তখনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর হামলা হওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ দেশের গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

একে ইচ্ছাকৃত ভাবে ঘটানো সরকার-বিরোধী ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা, যাতে সরকারকে আন্তর্জাতিক ভাবে সমালোচিত করা যায়- এছাড়া আর কোনো ভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে কি? আরেকটি সুযোগ আছে বটে। কেন আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর হামলা করা হলো? কেন ছাত্রলীগকে এই বদনাম নিতে হলো? কেন সরকারকেই সমালোচনাযোগ্য করে তুলে ধরা হলো সকলের সামনে?

এসব প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ আমাদের রয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে বহুবিধ প্রশ্ন তোলার সুযোগ আমাদের রয়েছে। বিশেষ করে এই আন্দোলন যখন শুরু হয় এবং তারপর থেকে এই আন্দোলনকারীরা নিজেই নিজেদেরকে বিতর্কিত করার যথেষ্ট সুযোগ আমাদেরকে দিয়েছেন। এক সময় বিষয়টিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক করার ঘটনা আমরা লক্ষ্য করেছি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ এই আন্দোলনকে সরকার পতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ন্যক্কারজনক গুজব ছড়ানোতেও পিছপা হননি। কিন্তু আমরা সে খারাপ সময় পার করে এসেছি এবং প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন।

আরো বড় কথা হলো, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগও সরকার দিয়েছে, যদিও আন্দোলনকারীরা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে সে আলোচনার পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। বোঝাই গিয়েছিল যে, আন্দোলনকারীরা কোটা সংস্কারে জন্য আন্দোলন করলেও তাদের পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি কাজ করছে সরকার-বিরোধী ফায়দা লোটার জন্য।

বাংলাদেশে এরকম ঘটনা নতুন নয়, আর আওয়ামী লীগ সরকারও এরকম ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় একেবারে কাঁচা একথা বলার উপায় নেই। কিন্তু একেবারে সর্বশেষ যে ভাবে কোটা আন্দোলনকারীদের দমানোর চেষ্টা করা হলো মারধোর করে, হামলা চালিয়ে তার সমালোচনা করতেই হবে কারণ তাতে সরকারের কোনো লাভই হয়নি, অনেক বড় লোকসান ছাড়া।

সবদিক বিশ্লেষণ করে একথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, সরকার বা প্রশাসনের ভেতর এমন কেউ রয়েছেন যারা চেয়েছেন যে, এই বিদেশি অতিথিদের সামনে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে হলে কোটা আন্দোলনকারীদেরকেও ব্যবহার করা যায় এবং সেটাই করা হয়েছে। নাহলে এতোদিন কেন লাগলো একটি কমিটি গঠনে?

বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দুর্বলতম সময়ে আমরা অবস্থান করছি। নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার জন্য একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে দেশের চিহ্নিত রাজনৈতিক উচচাভিলাষী ‘অরাজনৈতিক’ ব্যক্তিবর্গ উঠেপড়ে লেগেছেন। দেশে মানুষের কথা বলার অধিকার নেই- এই আপ্তবাক্য প্রচারে সফলতা তাদের শতভাগ। অথচ এই প্রশ্ন কেউ করছেন না যে, তাহলে একথাটিও তারা প্রচার করছেন কী ভাবে? গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশে, প্রচারে, বক্তব্য প্রকাশে বা প্রচারের সুযোগ না থাকলে কী করে জানা যাচ্ছে যে, কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হচ্ছে কিংবা খুলনা বা গাজীপুর নির্বাচনে অনিয়ম ধরা পড়েছে?

সবকিছু বলেও শেষ বাক্যে কথা বলার অধিকার নেই বলাটা যে মিথ্যাচার সেটা প্রমাণ করার দরকার নেই, কিন্তু এতে যে সফলতা তারা অর্জন করেছে সেটা অভাবনীয় বটে। বিশেষ করে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হামলার কারণে তাদের মুখ থেকে বের হওয়া অনেক অসত্য দাবীকেও সাধারণ মানুষ সত্য মনে করছে, গণমাধ্যমও বাধ্য হচ্ছে সেসব প্রচার করতে।

এমতাবস্থায় সরকারকে আরো সাবধান হতে হবে কার্যপদ্ধতি নির্ধারণে। সরকারকে শুধুমাত্র বিরোধীদের অপপ্রচারের জবাব দিতে হচ্ছে তা নয়, একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর চেপে বসা বহুবিধ গুরুদায়িত্বও সঠিক ভাবে পালন করে যেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় পঁচা শামুকে সরকারের পা কাটানোর সুযোগ যারা তৈরি করে দিচ্ছেন তারা সরকারের বন্ধুতো নয়ই, তারা দেশ বা রাষ্ট্রেরও বন্ধু নয়। সামনে এই সকল ষড়যন্ত্রীদের হাত থেকে সরকার নিজেকে মুক্ত রাখবে এবং সেই সঙ্গে দেশকেও মুক্ত রাখবে, সেটাই কাম্য।

অনেক জল ঘোলা করে হলেও কোটা সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে একটি রিপোর্ট দাখিল করবে কিংবা প্রয়োজনে তারা সময় চাইবে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কিন্তু ততোদিন কোটা আন্দোলনকারীরা যদি সত্যিকার অর্থেই কোটা সংস্কার চান (যদি তাদের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না থেকে থাকে) তাহলে তারা সরকারকে সে সুযোগটি দেবেন এবং সরকারেরও উচিত হবে আটক আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের মুক্তি দিয়ে দু’পক্ষকেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে আগ্রহী বলে প্রমাণ করা।

বাংলাদেশকে অস্থির করে যারা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে চাইছে তাদেরকে সে সুযোগ যারা করে দিচ্ছে সরকার তাদেরকে চিনতে না পারলে সামনে ভয়াবহ বিপদ এবং এ বিপদ সরকারের একার নয়, জনগণেরও।
ঢাকা ৩ জুলাই, মঙ্গলবার ২০১৮

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
[email protected]

এইচআর/পিআর

একেবারে সর্বশেষ যে ভাবে কোটা আন্দোলনকারীদের দমানোর চেষ্টা করা হলো মারধোর করে, হামলা চালিয়ে তার সমালোচনা করতেই হবে কারণ তাতে সরকারের কোনো লাভই হয়নি, অনেক বড় লোকসান ছাড়া