নচিকেতার হাল্লাবোল এবং আমাদের হুন্ডি

রিয়াজুল হক
রিয়াজুল হক রিয়াজুল হক , কলাম লেখক, ব্যাংকার
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ এএম, ০২ এপ্রিল ২০১৯

নচিকেতার ‘হাল্লাবোল’ গানটি আমরা অনেকেই শুনেছি। গানের শুরতেই নচিকেতা বিশ্বস্ত সূত্র খবরে বলেন, ভারতের ২৮০ লক্ষ কোটি টাকা শুধু শুধু সুইস ব্যাংকে পড়ে আছে। এই টাকা যদি দেশে থাকতো, তবে দেশের এবং দেশের মানুষের যে সুবিধা হতো, তারও একটা বিবরণ গানের মধ্যে দেওয়া হয়েছে।

এক. এই টাকা দেশে থাকলে ৩০ বছর কাউকে কোন ট্যাক্স দিতে হতো না।

দুই. ৬০ কোটি মানুষের চাকরি হতে পারতো।

তিন. ৫০০টি সামাজিক প্রকল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ হতে পারতো।

চার. আগামী ৬০ বছর প্রতি নাগরিক দুই হাজার করে টাকা মাসিক ভাতা পেতে পারতো।

পাঁচ. দেশের যে কোন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজধানী দিল্লী পর্যন্ত চার লেনের হাইওয়ে রাস্তা হতে পারতো।

ছয়. বিদেশি ঋণের কোন প্রয়োজন হতো না।

গানের মাধ্যমে কি ভয়াবহ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে? ধরে নিচ্ছি, ভারতের এই টাকা পাচার হয়েছে কিংবা দেশে না এনে সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছে। আর পাচার হওয়া অর্থের একটা অংশ হয়েছে হুন্ডির মাধ্যমে।

এবার আমাদের দেশের পরিস্থিতিতে আসা যাক। ২০১৮ সালে একটি জাতীয় পত্রিকার প্রকাশিত তথ্য মতে, ২০১৭ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশীদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ১৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা (প্রতি সুইস ফ্রাঁ ৮৪ টাকা ৫২ পয়সা হিসাবে)। ২০১৬ সাল শেষে এর পরিমাণ ছিল ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার সুইস ফ্রাঁ বা ৫ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘‘অর্থ বা সম্পত্তি পাচার’’ অর্থ— (১) দেশে বিদ্যমান আইনের ব্যত্যয় ঘটাইয়া দেশের বাহিরে অর্থ বা সম্পত্তি প্রেরণ বা রক্ষণ; বা (২) দেশের বাহিরে যে অর্থ বা সম্পত্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রহিয়াছে যাহা বাংলাদেশে আনয়ন যোগ্য ছিল তাহা বাংলাদেশে আনয়ন হইতে বিরত থাকা; বা (৩) বিদেশ হইতে প্রকৃত পাওনা দেশে আনয়ন না করা বা বিদেশে প্রকৃত দেনার অতিরিক্ত পরিশোধ করা।

অর্থ পাচারের একটি সহজ মাধ্যম হচ্ছে হুন্ডি কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এর মতে, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে। আর বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। বিমানবন্দরে যে পরিমাণ হুন্ডির টাকা জব্দ করা হয় তা মোট পাচারকৃত অর্থের পাঁচ শতাংশ মাত্র। বাকি ৯৫ শতাংশ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে নিরাপদে পাচার হয়ে যায়।

স্থল বন্দরগুলোতেও চলে হুন্ডির ব্যবসা। কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন ছাড়াই চলছে লোকজনের যাওয়া-আসা এবং হুন্ডির মাধ্যমে চলছে পণ্য আমদানি। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। হুন্ডি একটি পুরাতন এবং অবৈধ ব্যবসা। প্রবাসীরা তাদের অর্জিত আয় বৈধ মাধ্যমে দেশে না পাঠিয়ে অনেক সময় এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর (হুন্ডি ব্যবসায়ী) প্রলোভনে পড়ে কিছুটা বেশি মুদ্রা বিনিময় মূল্য পাবার জন্য বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রয় করে এবং উক্ত অসাধু ব্যবসায়ীর দেশে অবস্থিত এজেন্ট দেশীয় মুদ্রায় প্রাপককে (প্রবাসীর মনোনীত ব্যক্তি) অর্থ প্রদান করে থাকে। অর্থ লেনদেনের এই প্রক্রিয়াকেই হুন্ডি ব্যবসা বলে।

সাধারণত কয়েকটি কারণে প্রবাসীরা এই হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করে থাকে- (১) যারা অবৈধভাবে বিদেশে গমন করেছে, অনাকাঙ্খিত ঝামেলা এড়ানোর জন্য; (২) ব্যাংকিং চ্যানেলের কিছু নিয়ম কানুন পালন না করার জন্য; (৩) ব্যাংকের চেয়ে সামান্য বেশি মুদ্রা বিনিময় মূল্য পাবার জন্য; (৪) কোন প্রকার সার্ভিস চার্জ না দেবার জন্য; (৫) সর্বোপরি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে অফিসিয়াল মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের সুযোগ না থাকার কারণে, হুন্ডির সাহায্য নেয়া হয়।

হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসে থেকেই প্রবাসীরা হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছে বিদেশী মুদ্রা দিয়ে দেন। হুন্ডি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়ে দেশীয় এজেন্ট প্রবাসীর আত্মীয়স্বজনের কাছে টাকায় রূপান্তর মূল্য পরিশোধ করে। মোবাইলের মাধ্যমেই হুন্ডি ব্যবসার সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এখানে কোন কাগজপত্রের বালাই নেই। এই প্রক্রিয়ায় কোন বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে না। হুন্ডির মাধ্যমে আমাদের দেশের অভ্যন্তরের অর্থও বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

অর্থ পাচার রোধে মানি লন্ডারিং আইনের দণ্ডবিধির সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন। মানি লন্ডারিং অপরাধ ও দণ্ড সম্পর্কে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বলা হয়েছে- (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, মানিলন্ডারিং একটি অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে। (২) কোন ব্যক্তি মানিলন্ডারিং অপরাধ করিলে বা মানিলন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বৎসর এবং অনধিক ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ (দশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত, যাহা অধিক, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন (তবে শর্ত থাকে যে, আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় অতিরিক্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।)

(৩) আদালত কোন অর্থদণ্ড বা দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে যাহা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানিলন্ডারিং বা কোন সম্পৃক্ত অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত বা সংশ্লিষ্ট। (৪) কোন সত্তা এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটন করিলে বা অপরাধ সংঘঠনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে ধারা ২৭ এর বিধান সাপেক্ষে, উপ-ধারা (২) এর বিধান অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে এবং অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মূল্যের অন্যূন দ্বিগুণ অথবা ২০ (বিশ) লক্ষ টাকা, যাহা অধিক হয়, অর্থদণ্ড প্রদান করা যাইবে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলযোগ্য হইবে।

তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত সত্তা আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদন্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় সত্তার মালিক, চেয়ারম্যান বা পরিচালক যে নামেই অভিহিত করা হউক না কেন, তাহার বিরুদ্ধে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।] (৫) সম্পৃক্ত অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হওয়া মানিলন্ডারিং এর কারণে অভিযুক্ত বা দণ্ড প্রদানের পূর্বশর্ত হইবে না।

সময় এখন এগিয়ে যাবার। দেশের অর্থ যেন দেশেই থাকে এবং সেটি যেন সঠিকভাবে বিনিয়োগ হয়, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য হুন্ডির সকল কার্যক্রম অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

লেখক : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
[email protected]

এইচআর/এমকেএইচ

অর্থ পাচারের একটি সহজ মাধ্যম হচ্ছে হুন্ডি কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এর মতে, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। বাকি ৬০ শতাংশের মধ্যে ৩০ শতাংশ আসে সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে। আর বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে।

আপনার মতামত লিখুন :