আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যেনো নেতিবাচক খবরের শিরোনাম না হয়

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:০৫ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ড. মো. আসাদুজ্জামান মিয়া

এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত খবর হলো- দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগ (অব্যাহতি)। কিছুটা হতবাক হওয়ার মতো খবর। এক সপ্তাহ আগেও যা কেউ কল্পনাতেও আনেনি। সাত সেপ্টেম্বর আলোচনা আর ১৪ সেপ্টেম্বর সিদ্ধান্ত।

প্রথমে গণভবনে তাদের প্রবেশ পাস বতিল এবং পরবর্তীতে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি। দায়িত্বের চরম চূড়া থেকে একেবারে তলানীতে। তবে ঠিক কি কারণে বা কেন হঠাৎ করে এত বড় সিদ্ধান্ত তা একমাত্র দলের সভানেত্রীই ভালো বলতে পারবেন। কারণ তিনি প্রায় সবই জানেন এবং বোঝেন। হয়তো অনেক সময় কিছু বলেন না।

তবে তার এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই সিদ্ধান্ত নাকি একটি সর্তক বার্তা। তাদের জন্য যারা দলের বড় দায়িত্বে থেকে আওয়ামী লীগের সুনাম বিনষ্ট করছেন কিংবা যারা আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড লাগিয়ে সরকারের বড় বড় চেয়ারে বসে বিভিন্ন অন্যায়-অপকর্ম এবং দুর্নীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণ হয় যে, যারা দলের বড় দায়িত্বে থেকে কিংবা সরকারের বড় চেয়ারে বসে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং নিজেকে অসাধারণ মানুষ ভাবছেন তারা যেকোন সময় সাধারণ হয়ে যেতে পারেন। নেত্রীর এরকম একটা সিদ্ধান্তই তাদের জন্য যথেষ্ট।

যাই হোক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদ্বয়ের এই পদত্যাগ বা অব্যাহতির বিষয়ে অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছে, যেমনঃ চাঁদাবাজি, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদেরকে অসম্মান, মাদক সেবন, দেরীতে ঘুম থেকে উঠা, সাংগঠনিক কাজে গাফলতি ইত্যাদি ইত্যাদি। এর কতটুকু সত্য বা মিথ্যা জানিনা তবে সংগঠনের চূড়ায় বসে এসব অভিযোগের খবর প্রকাশ সত্যিই অনাকাঙ্খিত।

তবে কারণ যাই হোক না কেন, একটা বিষয় খুব খারাপ শোনা গেছে (পত্রপত্রিকায় যা খবর এসেছে) তা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে ছাত্রলীগ ও উপাচার্যের মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগ সম্বলিত কথাবার্তা। ছাত্রলীগ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নাকি জাবি উপার্চাযের কাছে ক্যাম্পাস উন্নয়ন প্রকল্পের এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ‘৪ থেকে ৬ পারসেন্ট’ টাকা চাঁদা দাবি করছেলিনে।

ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তাদের ২ জনের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লেখা খোলা চিঠিতে জাবি উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি লিখেছেন যে তারা (জাবি উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্য) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রদান করেছেন যাতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ উন্নয়ন প্রকল্পে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় (পরে অবশ্য ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এটা শোনা কথার ভিত্তিতে বলেছেন বলে মিডিয়াকে জানিয়েছেন)।

অপরদিকে জাবি’র উপাচার্য এ ব্যাপারে সরকার দলীয় এই ছাত্র সংগঠনটির দিকে সরাসরি চ্যালঞ্জে ছুড়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন যে ছাত্রলীগ মিথ্যাচার করেছে এবং তার বিরুদ্ধে একটি গল্প ফেঁদেছে। এর প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক জাবি উপাচার্যকে পাল্টা চ্যালঞ্জে ছুড়ে দিয়ে বলেছেন যে, জাবি উপাচার্য পারলে প্রমাণ করুক যে তারা চাঁদা (৪-৬%) দাবি করেছিলেন। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন পাবলিকলি টাকাপয়সার ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে এসব কথাবার্তা খুবই বিব্রতকর শোনায়। দেশের প্রথম সারির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চিত্র (ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক সর্ম্পক) আমাদেরকে সত্যিই হতাশ করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে যদ্দুর জেনেছি, ক্যাম্পাসে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ যেসব ঠিকাদার পান তারা ক্যাম্পাস ছাত্রসংসদ বা ছাত্রসংগঠনকে ছাত্রদের কল্যাণে কিছু (১% এর মতো) টাকা প্রদান করে থাকেন, তবে সেটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই হয়। এটা নিয়ে সেরকম হৈ চৈ হয় না, বা যত্রতত্র অতোটা আলোচনা হয় না।

এগুলো পাবলিকলি শুনতে সত্যিই খারাপ লাগে। কানে বাজে। আমরা বিব্রত হই। বিশ্ববিদ্যালয়েগুলো হলো মুক্ত চিন্তা ও চর্চার শ্রেষ্ঠ স্থান যেখানে ছাত্র-শিক্ষকরা স্ব-স্ব মেধার বিকাশে সচেষ্ট থাকেন এবং দেশ-জাতি গঠনে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভূমিকা রাখেন। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টাকাপয়সার ভাগভাটোয়ারা নিয়ে এরকম প্র্যাক্টিস চলতে থাকে আর এগুলো এরকম উন্মুক্ত আলোচনায় আসে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার যতটুকু পরিবেশ বর্তমানে আছে তাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে কোমলমতি সকল সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর। বিশ্ববিদ্যালয় তথা আমাদের সমস্ত অগ্রযাত্রা ম্লান হয়ে যাবে।

প্রত্যাশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে ছাত্রসংগঠনগুলো তথা বর্তমান ছাত্রলীগ গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অনিয়ম-অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকবে এবং ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হবে না।

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। সহযোগী অধ্যাপক, পবিপ্রবি, বাংলাদেশ।

এইচআর/পিআর

প্রত্যাশা করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে ছাত্রসংগঠনগুলো তথা বর্তমান ছাত্রলীগ গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অনিয়ম-অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকবে এবং ছাত্র-ছাত্রীরা কোনো নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হবে না