ভর্তি মৌসুমে উচ্চশিক্ষার কুসংবাদ

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:১১ এএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মেডিকেল, প্রকৌশলসহ উচ্চশিক্ষায় ভর্তি মৌসুম চলছে। বেশ ক’টি ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেছে। মাসখানেকের মধ্যে শেষ হবে বেশিরভাগ ভর্তি পরীক্ষা। এ রকম সময়েই ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগরসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে দুঃখজনক খবরের ছাড়াছড়ি। ক্ষমতাসীনদলের ছাত্রসংগঠনের বেপরোয়া চাঁদাবাজি-মস্তানি, ভিসিসহ শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির লেজবহনের নোংরা-কদাকার সংবাদ। এরমধ্যেই আবার বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার নিম্নমান নিয়ে লজ্জাজনক গবেষণালব্ধ তথ্য।

লন্ডনভিত্তিক শিক্ষাবিষয়ক সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের বিশ্বের সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঠাঁই পায়নি বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও। ৯২টি দেশের ১ হাজার ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আছে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ বিশ্বের সেরা এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় প্রতিবেশি ভারতের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে। পাকিস্তানের আছে ৭টি। শ্রীলঙ্কার ১টিও আছে।

২০১৬ সালের মানক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৬০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে ছিল। এখন সেটি ১ হাজার ৩০০তে নেমে এসেছে। গত মে মাসে সাময়িকীটি এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকায়ও এশিয়ার ৪১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও উল্লেখ ছিল না। সে সময় বিভিন্ন মহলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও সংশ্লিষ্টরা আমলে নেননি। বরং আজেবাজে কথা বলেছেন।

দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় অর্ধশত। সংখ্যা হিসাবে বিশাল। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ক্রীড়নক হয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অতি তুচ্ছ বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসে রাষ্ট্রের ওপর মহল থেকে। কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের নিয়ে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবরও পাওয়া যায়। এগুলোর সঙ্গে কারা জড়িত, নিয়োগ বাণিজ্য কিভাবে হয়, তা-ও দেশবাসীর অজানা নয়। এগুলোতে ভিসি-প্রোভিসি, কোষাধ্যক্ষ হতে রাজনৈতিক দৌড় নিম্নমানের। কারো কারো ক্ষেত্রে দিগম্বর পর্যায়ে।

মধুময় এই পদগুলোর জন্য কে কোথায়, কি নিয়ে, কোন মানে ধরনা দেন কলিগরা জানেন। কামিয়াবি না হওয়ার আভাস পেয়ে কেউ কেউ ‘অফার’ ফিরিয়েও দেওয়ার গর্বও জাহির করেন। আবার দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পালনরত বা সবুজ সংকেত পাওয়া চতুররা বলেন, ছেড়ে দিতে চান কিন্তু সরকার ছাড়তে চায় না। এটি বিশ্ববিদ্যালয় নামের উচ্চশিক্ষার সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান। -এসব নিয়ে রসালাপ আছে সহকর্মীদের মধ্যে। কম-বেশি জেনে ফেলছে শিক্ষার্থীরাও। ওই শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের সম্মানই বা কোন লেভেলে? যোগ্যতার এমন মাপজোখের ভিসি বা শিক্ষকদের দিয়ে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা আসবে, সেরার তালিকায় জায়গা পাবে কোনো দেশের উচ্চশিক্ষার মান? সেটা আশা করাই বাতুলতা।

ভিসিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ অভিযোগ অন্তহীন। ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই চিরকুটের মাধ্যমে ভর্তি, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা, নৈতিক স্খলন, রাজনৈতিক দলাদলি, লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইন্ধন দেওয়া, ক্যাম্পাসে সময় না দেওয়াসহ আরও অনেক অভিযোগ বেশ কিছু উপাচার্যের বিরুদ্ধে। বাদ নেই শিশুকে বলাৎকার-চেষ্টার অভিযোগও।

শিক্ষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি, এ এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হারিয়ে গেছে সুস্থ প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি। এমন শিক্ষাব্যবস্থাপনার ছাপ বা জের শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে পারে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রচলিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য কষ্টের। তাদের ছুটতে হচ্ছে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। শারীরিক-মানসিক কষ্টের সঙ্গে এখানে অনেক খরচপাতির বিষয়ও রয়েছে।

এমনিতেই শিক্ষাব্যয় টানতে গিয়ে কাহিল দশা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত অভিভাবকদের। তাদের আয়ের বড় অংশই চলে যায় সন্তানের লেখাপড়ায়। এতে সংসারের অন্যান্য খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। নিম্নবিত্ত পরিবারের আয় দেশের নাগরিকদের গড় আয়ের চেয়েও কম। কোথাও কোথাও ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পড়ছে একই দিনে। এছাড়া কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পরপর থাকায় দূরত্বের কারণে কখনো কখনো পরীক্ষায় অংশ নেয়া সম্ভব হয় না। এ দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে মেডিকেলের মতো কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত পরীক্ষা পদ্ধতির তাগিদ ও দাবি অনেকদিনের।

এ পদ্ধতি চীন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিলসহ বিশ্বের অনেক দেশেই রয়েছে। বাংলাদেশে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার চাকরির পরীক্ষা, মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এবার থেকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ নিয়মে পরীক্ষা হবে। কিন্তু, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এ নিয়ে গড়িমসি আছে। অর্থনৈতিক কিছু বিষয়ে তারা একাট্টা। বোঝাই যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনা করা একেবারেই ইচ্ছার ব্যাপার। এ নিয়ে কিছু তোড়জোরও হয়েছিল। কমিটিও হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নেতৃত্বে। কিন্তু, কাজ এগোয় না।

ছাত্রনেতা নামধারীদের অনিয়ম, জালিয়াতি, কালোটাকা, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক আর ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে কোথাও কোথাও শিক্ষকদের নামও আসছে। দুষ্টু রাজনীতির এই কালোচক্রে তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিবেকের বৈকল্য এখন চরমে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান যে ক্রমেই নিচের দিকে যাচ্ছে, তা জানতে বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপের প্রয়োজন হয় না।

প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার নামে যেসব অনাচার ঘটে চলেছে, তা মোটেই শিক্ষার পরিবেশ নয়। দলবাজি বা রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার মূল্যায়ন চলতে থাকলে এ হালাবস্থাই হবে। এই সংস্কৃতির লাগামে টান পড়বে কি-না কেউ বলতে পারছেন না। আশা দেখছেন না। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার মান কখনোই সমান হবে না। তাই বলে কাছাকাছিও হবে না? ন্যূনতম মান বজায় রাখতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষক থাকা জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/জেআইএম

প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার নামে যেসব অনাচার ঘটে চলেছে, তা মোটেই শিক্ষার পরিবেশ নয়। দলবাজি বা রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার মূল্যায়ন চলতে থাকলে এ হালাবস্থাই হবে। এই সংস্কৃতির লাগামে টান পড়বে কি-না কেউ বলতে পারছেন না। আশা দেখছেন না। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার মান কখনোই সমান হবে না। তাই বলে কাছাকাছিও হবে না? ন্যূনতম মান বজায় রাখতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষক থাকা জরুরি।