দুর্যোগ ও মহামারি, আইন কী বলে
আমরা একটা জাতীয় দুর্যোগ অতিক্রম করছি। জানি না কতদিন এ দুর্যোগ চলবে। গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে দেশে মোটামুটি অঘোষিতভাবেই লকডাউন চলছে। এ দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু আছে তা নিয়ে প্রশ্ন করাই যায়। কিন্তু সেসব এখন পুরোনো প্রশ্ন। যা হওয়ার তা হয়েছে। একটা বৈশ্বিক দুর্যোগ চলছে। বাংলাদেশও আজ দুর্যোগকবলিত। প্রাকৃতিক নিয়মে ধীরে ধীরে এই দুর্যোগ যেন আরও শক্তি সঞ্চয় করছে। এ ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়। তাই একজন সংক্রমিত হওয়া মানে তার আশপাশের আরও অসংখ্য মানুষের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সামাজিক সঙ্গনিরোধ বা সামাজিক মেলামেশা রোধ করে ঘরে অবস্থানই এর সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
দুর্যোগ যেহেতু হানা দিয়েই দিয়েছে সেহেতু এ দুর্যোগ এখন মোকাবিলা করতে হবে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা আছে। অতীতে আমরা আইলা-সিডর-বন্যা মোকাবিলা করেছি। এছাড়াও বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ফি বছর লেগেই থাকে। এসব দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের এক ধরনের সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। যদিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর ভাইরাসজনিত মহামারি এক নয়। যুদ্ধের ধরনটাও এক নয়। কিন্তু যেকোনো দুর্যোগেরই কিছু সাধারণ প্রস্তুতিমূলত, প্রতিরোধ ও আঘাত পরবর্তী ব্যবস্থাপনাগত বিষয় থাকে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকেএ দেশে একটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০১২ সালের এ আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব সহনীয় পর্যায়ে এনে সার্বিক দুর্যোগ লাঘব করা। অর্থাৎ দুর্যোগ হলে এর ঝুঁকি যাতে কম হয় সে জন্য কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা। এ জাতীয় কার্যক্রম দুর্যোগ আসার যত আগে নেয়া যায় দুর্যোগের ঝুঁকিও তত কম হয়। সিডর ও আইলার ক্ষতি কম হওয়ার কারণ আমরা আগে থেকেই অনেক প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম। আর ক্ষতি যা হয়েছে তার মূল কারণ সচেতনতার অভাব বা পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা। আইনের আরেকটি লক্ষ্য হলো দুর্যোগপরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন কর্মসূচি অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা। এটি দুর্যোগপরবর্তী একটি কার্যক্রম। এর মধ্যে আছে দুর্দশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করা।
এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমের মধ্য সমন্বয়সাধনও এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য। এ কাজটি দুর্যোগের আগে ও পরে সবসময়ই বহাল থাকতে হয়। দুর্যোগ মোকাবিলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে সমন্বয় থাকলে দুর্যোগ পূর্বপ্রস্তুতিও ভালো হয়। এতে দুর্যোগের ক্ষতিও কম হয় এবং দুর্যোগপরবর্তী কার্যক্রমও সফল ও টেকসই হয়। সব মিলিয়ে একটি সফল ও কার্যকর দুর্যোগব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা সহজ হয়। এসব লক্ষ্য নিয়েই আইনটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু আইনের ক্ষেত্রে আমাদের মূল সমস্যা হলো এর প্রয়োগ নিয়ে।
অনেকে বলতে পারেন আইন দিয়ে কি দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায়? আইন দিয়ে অবশ্যম্ভাবী দুর্যোগ রোধ করা যায় না। কিন্তু দুর্যোগবিষয়ক আইন করা হয় যাতে দুর্যোগের সময় করণীয় বিষয়গুলো আগেভাগেই ঠিক করে রাখা যায়। দুর্যোগের আগে পরে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্টদের কার কী করণীয় তা আগে থেকেই আইনে বলা থাকে। যাতে অতিদ্রুত কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেয়া যায়। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্টরা যাতে দুর্যোগকালে কিংকর্তব্যবিমূঢ় না হয়ে যান সে জন্যই মোটাদাগে কিছু কার্যক্রম হাতে নেয়ার কথা বলা থাকে। এ কার্যক্রমগুলো দুর্যোগভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু আমাদের আইন হয়েছে ২০১২ সালে তারপরও ২০২০ সালে এসেও দুর্যোগব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের সমন্বয়হীনতা দৃষ্টিকটু। এ নিয়ে বিভিন্ন স্তরের সমালোচনা এ কলামের উদ্দেশ্য নয়। শুধু একটি কার্যকর আইনকে অকার্যকর করে রাখার জন্যই যে এই সমন্বয়হীনতা সেটি তুলে ধরাই লক্ষ্য।
একটি দুর্যোগ এলে আইনানুযায়ী রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কমিটি গঠন করার কথা রয়েছে। এসব কমিটিতে কারা কারা থাকবেন ও তাদের কাজ কী হবে এসবই আইনে বিস্তারিতভাবে বলা আছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ আইনের কোনো কার্যকারিতা চোখে পড়ল না। আইনানুযায়ী জাতীয় দুর্যোগব্যবস্থাপনা কাউন্সিল নামে একটি কাউন্সিল গঠিত হওয়ার কথা। এছাড়া সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা-পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও দুর্যোগব্যবস্থাপনা কমিটি ও দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ গঠনের কথা বলা আছে। এসব কমিটি সারা বছরই কার্যকর থাকার কথা। আর দুর্যোগের আশঙ্কা হলে তো আগে থেকেই সক্রিয় থাকার কথা। এছাড়া আমাদের দেশ দুর্যোগের দেশ আর এখনতো দুর্যোগের মৌসুম। কিন্তু দুর্যোগের এই করোনাক্রান্তিতে তারা কে কোথায়? কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন কমিটি কাজ করার কথা। শুধু কমিটি থাকাই শেষ কথা নয়, কমিটির কার্যক্রম দৃশ্যমান হওয়াটাই জরুরি?
এ আইনটি মূলত দুর্যোগ মোকাবিলার একটি গাইডলাইন। এ গাইডলাইনের আলোকে দুর্যোগ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টরা দুর্যোগকবলিত স্থান ও জনগোষ্ঠীর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এটাই কাম্য। সিডরের জন্য এক রকম ব্যবস্থা, বন্যার জন্য এক রকম ব্যবস্থা, খরার জন্য এক ব্যবস্থা মহামারির জন্য আরেক ব্যবস্থা। এভাবে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ যাতে সহজ হয় সে জন্যই এ আইন একটি গাইডলাইন।
পুরো বিশ্ব যে মহামারিতে নাজেহাল সেখানে শুধুমাত্র আইইডিসিআর বা স্থাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদফতরের একার পক্ষে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ও সরেজমিন প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেই হবে। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি। পরিস্থিতি যত খারাপ হবে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা ততই বেশি হবে। পরিস্থিতি যাতে সেদিকে না যায় সে প্রত্যাশাই করি।
এই আইনে দুর্যোগের মধ্যে মহামারিও অন্তর্ভুক্ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগতো আছেই। কিন্তু তারপরও মহামারি মোকাবিলার জন্য সরকার পৃথক আরেকটি আইন করেছে। সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ নামে দেশে আরেকটি আইনও আছে। আইনটি প্রণয়নের মাত্র দেড় বছরের মাথায় দেশে একটি মহামারি হানা দিল। এ আইনে মহামারি নিয়ন্ত্রণের সব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকই মহামারি মোকাবিলার জন্য দায়ী থাকবেন।
এদিকে আইনে মহামারি মোকাবিলার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটির কথা বলা আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এর প্রধান। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকও এ কমিটিতে আছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো করোনার মতো এই বৈশ্বিক মহামারি যা আজ জাতীয় দুর্যোগের কারণ তার মোকাবিলা করা কি ডিজি, হেল্থের একার পক্ষে সম্ভব? না সেটি যে সম্ভব নয় সেটি বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়। আমরা মাঠে বা গণমাধ্যমে দেখছি আইইডিসিআর, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীকে। কাজেই এ আইনে মহামারিকে একটি মামুলি রোগ-ব্যাধি বা জ্বর-সর্দি-কাশির মতো কিছু একটা মনে করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী দায়-দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মহাপরিচালককে।
কিন্তু শুধু করোনা নয়, যেকোনো মহামারিই যে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যদুর্যোগ সেই উপলব্ধিটি এই আইনে নেই। মূলত ঔপনিবেশিক আমলের এপিডেমিক ডিজিজেস অ্যাক্ট ১৮৯৭–এর আদলেই আমাদের দেশের মহামারি আইনটি করা হয়েছে। এ আইনে মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক, ডাক্তার ও রোগীর অধিকার বা সুরক্ষা নিয়ে তেমন কথা নেই। কিন্তু করোনার চিকিৎসায় ডাক্তার ও রোগীর অধিকার, সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি আজ খুব জরুরি। কাজেই এ আইনটি বাস্তবতার নিরিখে সংশোধনের দাবি রাখে।
আগেই বলেছি আইন দিয়ে দুর্যোগের গতি রোধ করা যায় না, কিন্তু ঝুঁকি হ্রাস করা যায়। আর এখন এমন করোনা পরিস্থিতিতে আইনে যা বলা আছে তার চেয়েও অনেক বেশি সমন্বয় ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা আমাদের থাকা দরকার ছিল। এখন সমালোচনার নয়, কিন্তু সাফল্য, ব্যর্থতা তথা অভিজ্ঞতার আলোকেই মানুষ পথ চলতে শেখে, বিপদ-আপদ মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করে। তাই আইনের প্রয়োগ দরকার। যাতে আইনের মধ্যে গলদ থাকলেও তা বেরিয়ে আসে আর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা সংশোধন করা যায়।
লেখক : কলামিস্ট
এইচআর/বিএ/জেআইএম