করোনায় ঈদ আনন্দ

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৮:১৪ এএম, ২৫ মে ২০২০

দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের দুয়ারে সমাগত পবিত্র ঈদুল ফিতর। বিশ্ববাসীর মাঝে যে আনন্দ বারবার ফিরে আসে তাকেই ঈদ বলা হয়। ইসলাম ধর্ম বিকশিত হওয়ার বহু আগে থেকেই বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের অনুসারীরা নানা ভাব ও ভঙ্গিতে ঈদ পালন করতো। তবে ইসলাম ধর্মেই কেবলমাত্র ঈদকে সার্বজনীন ইবাদত রূপে রূপায়ন করা হয়েছে। প্রতি বছর ঈদ মহা আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও এবার মানুষের মধ্যে নেই সেই আনন্দধারা, নেই সেই উৎফুল্লতা। এবারের ঈদ আনন্দ পুরোটাই ভিন্ন। কেননা মহামারি করোনা সংক্রমণের মধ্যেই বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ পালন করছে ঈদুল ফিতর।

মুসলিম জাহান সিয়াম সাধনা এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে অতীতের ভুল-ভ্রান্তির ক্ষমা চেয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলার অঙ্গীকারে প্রত্যয়ী হওয়ার এক সফল অনুষ্ঠান এ পবিত্র ঈদ। বর্তমান ঈদকে কেবল ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয় না বরং ঈদ আজ সার্বজনীন আনন্দের নাম। সামাজিক উৎসবগুলোয় আমরা যেমন আনন্দে মাতি, তেমনি প্রত্যেক ধর্মেই রয়েছে বিশেষ কিছু উৎসবমুখর দিন। সেই উৎসবগুলোও আমাদের আনন্দে ভাসায়। ব্যবধান ঘুচিয়ে এক করে।

আমাদের বাংলাদেশেও রয়েছে নানা ধর্ম, গোত্রের মানুষের বাস। ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, বৈসাবি, রাস পূর্ণিমা প্রভৃতি বিশেষ দিনে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। এসব ধর্মীয় উৎসব বৃহৎ অর্থে সামাজিক জীবনাচারেরই অনুষঙ্গ। এসব উৎসব উদযাপিত হয় সমাজের মধ্যেই। প্রতিটি উৎসব আমাদের একতা, ঐক্য, বড় ও মহৎ হতে শেখায়। ঈদের আনন্দে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের সাথে ভাগ করার মাঝেই সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ।

তবে বর্তমান বিশ্বময় করোনা পরিস্থিতিতে সবার মনেই আতঙ্ক আর হতাশা। তাই আগের মতো ঈদে এবার সেই আনন্দ করার সুযোগই বা কোথায়? প্রতি বছর রোজার অর্ধেক থেকেই ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়। চাঁদরাতে কত আনন্দ উল্লাস ঈদ। এই তো গত বছর চাঁদরাতের মধ্যরাতে বিশেষ প্রয়োজনে গিয়েছিলাম রাজধানী ঢাকার একটি শপিংমলে। মাঝরাতে এত মানুষের সমাগম দেখে আমি রীতিমতো অবাক। কিন্তু করোনার কারণে এবার সেই আমেজ আর চোখে পড়বে না।

তা যা হোক, ঈদ মুসলমানের জন্য একটি মহা ইবাদত। ঈদের ইবাদতে শরিয়ত নির্দেশিত কিছু বিধি-বিধান রয়েছে, যা পালনে সামাজিক জীবনে পারস্পরিক আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও বন্ধন সুসংহত হয়। ঈদুল ফিতরের শরিয়ত দিক হলো, ঈদের নামাজের পূর্বে রোজার ফিতরানা ও ফিদিয়া আদায় করা, ঈদগাহে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা, খুতবা শোনা এবং উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা। ঈদে আমাদের দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে আর পরস্পরের মাঝে ঈমানী ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যদি এমনটা হয় তাহলেই আমাদের এ ঈদ পালন ইবাদতে গণ্য হবে।

আল্লাহ-তাআলার আদেশে এক মাস রোজা রাখার পর তার আদেশেই আমরা ঈদের আনন্দ উদযাপন করি। এক মাস রোজা আমরা আমাদের তাকওয়াকে ও ঈমানকে বাড়ানোর জন্য রেখেছি। আমরা রমজানের রোজা এ জন্যই রেখেছি, যেন আল্লাহপাকের নৈকট্য অর্জনকারী হতে পারি। এক মাস পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ-তাআলা আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন ঈদ উদযাপন করার। প্রত্যেক বৈধ কাজ যা থেকে তিনি আমাদের এক নির্ধারিত সময় বিরত রেখেছিলেন আজ ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে তা করার অনুমতি দিয়েছেন।

ঈদ উদযাপন মূলত আল্লাহ-তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন আর কৃতজ্ঞতার সর্বোত্তম পন্থা হলো ধনী-গরিব সবাই এক হয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা। এক মাস রোজা রাখার যে তৌফিক আল্লাহ-তাআলা দিয়েছেন এরই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ দুই রাকাত নামাজ। আমরা যে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমাদের সর্বদা এটিও স্মরণ রাখতে হবে যে, শুধু আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে না থেকে আল্লাহপাকের ইবাদতের প্রতিও যেন দৃষ্টি থাকে।

আমরা যখন পুরোপুরি স্থায়ীভাবে আমাদের গরিব ভাইদের অভাব দূরীকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবো তখনই এটা আমাদের প্রকৃত ঈদ উদযাপন হবে। আমাদের এতে খুশি হওয়াও উচিত নয় যে, ঈদের দিনে গরিবদের সাময়িক খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি বরং যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন তাদেরকে স্থায়ী খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে।

গত কয়েকদিন আগে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অনেক অসহায় মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। আমরা আমাদের ঈদের ঈদের বাজেটটি এবার করোনা ও আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে ব্যয় করতে পারি।

করোনার কারণে আমরা হয়তো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ঈদে কারও বাড়িতে বা বেড়ানোর চিন্তা করছি না কিন্তু আমার আশপাশে অসহায়-গরিব প্রতিবেশী যারা রয়েছে তাদের কথা কিন্তু আমাকে অবশ্যই ভাবতে হবে। সামাজিক দূরত্বের কথা ভেবে তাদের ঘরে আমার পক্ষ থেকে ঈদের উপহার পাঠানোর বিষয়টি যেন আমি ভুলে না যাই। এছাড়া এ সময়ে যদি কেউ আমার বাসায় এসেই পড়ে তাহলে তাকে ফিরিয়ে না দিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তাকে আপ্যায়ন করতে হবে। অতিথির সঙ্গে করমর্দন বা কোলাকুলি করা থেকে বিরত থাকব। এছড়া কথা বলার সময় অন্ততে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা ঈদ উদযাপন করব।

ঈদের আনন্দ তখনই সার্বজনীন রূপ লাভ করতে পারে যখন সমাজ ও দেশের সবাই একত্রে আনন্দের ভাগী হব। ঈদ যেহেতু কৃতজ্ঞতারই অপর নাম, তাই আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে দেখতে পাই, আল্লাহর কৃতজ্ঞতার ক্ষেত্রে সাহাবিরা কতই না উন্নত মানে ছিলেন।

হজরত আব্দুর রহমান বিন অউফ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করেন, আর তার ব্যবসা এত লাভজনক প্রমাণিত হয় যে, তিনি নিজেই বলতেন, আমি যে বস্তুতেই হাত দিতাম আল্লাহ-তাআলা তাতে এত বরকত রেখে দিতেন যা ছিল কল্পনাতীত। আমার স্পর্শে মাটি সোনা হয়ে যেত। তাকে আল্লাহ-তাআলা অশেষ ধনভাণ্ডার দিয়েছেন, কিন্তু সেই সম্পদ পাওয়ার পরও তার আচরণ কেমন ছিল? তা কি বস্তুবাদী মানুষের ন্যায় ছিল? একদিন তিনি রোজা রেখেছিলেন। ইফতারির সময় যখন তার জন্য খাবারের বিছানা বিছানো হয় তখন সেখানে বিভিন্ন প্রকার খাবার দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন, আর ইসলামের প্রথম যুগের কথা স্মরণ করেন যখন দিনের পর দিন মানুষকে অনাহারে কাটাতে হতো, তখন তার নিজের অবস্থাও তেমনই ছিল।

সেই সমস্ত সাহাবিদের কুরবানির কথা তার স্মরণ হয়, যখন যুদ্ধের ময়দানে তারা শহীদ হতেন তখন তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাফনও ছিল না। আর যে চাদর ছিল তা এত ছোট যে, মাথা ঢাকলে পায়ে কোনো সতর থাকতো না আর পা ঢাকলে মাথা খোলা পড়ে থাকতো। তাই আমাদের মাঝে যাদের আল্লাহ স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছেন তাদের উচিত হবে করোনাকালীন এ ঈদে গরিব অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিকে যেমন ইসলামি ঐতিহ্যের জয়গান গেয়েছেন, অপর দিকে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববোধ বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। আবার ঈদের আনন্দকে সার্বজনীন হিসেবে তুলে ধরার জন্য লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় তিনি তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন এভাবে- শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো/কত বালুচরে কত আঁখি ধারা ঝরায়ে গো/বরষের পর আসিলে ঈদ!/ভূখারির দ্বারে সত্তগাত বয়ে রিজওয়ানের/কণ্টকবনে আশ্বাস এনে গুলবাগের.../আজি ইসলামের ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান/নাই বড়-ছোট -মানুষ এক সমান/রাজা প্রজা নয় কারো কেহ-।

ঈদকে নিয়ে কবি কায়কোবাদ ‘ঈদ আবাহন’ নামে একটি কবিতায় তার ঈদ অভিব্যক্তি এভাবে তুলে ধরেছেন- ‘এই ঈদ বিধাতার কী যে শুভ উদ্দেশ্য মহান, হয় সিদ্ধ, বুঝে না তা স্বার্থপর মানবসন্তান। এ তো নহে শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধুলা খেলা। এ শুধু জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা।’

ঈদের দিন যেভাবে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে যায়, এক কাতারে সবাই নামাজ আদায় করি, সবার সাথে হাসি মুখে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করি, ঠিক তেমনিভাবে সারাবছর একই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে আর বিভেদের সকল দেয়ালকে ভেঙে ফেলতে হবে। যদিও করোনার কারণে আমরা ঈদের কোলাকুলি থেকে দূরে থাকছি কিন্তু দূরত্ব বজায় রেখে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারি।

কবি গোলাম মোস্তফা কতই চমৎকারভাবে তার এক কবিতায় বিষয়টি এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন- ‘আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লভিয়াছে হর্ষে, আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়েছে রাখিতে হবে সারা বর্ষে, এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য নিখিল-মানবের মিলন জন্য, শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশিস স্পর্শে।’

হ্যাঁ, আমরা এমনই কামনা করি, ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে আমাদের মাঝ থেকে সকল প্রকার অশুভ ও বিপদ-আপদ দূর হয়ে যাক। সবার মাঝে ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন রচিত হোক। সকলকে ঈদ মোবারক।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

এইচআর/বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]