রাবেয়া-রোকেয়ার উপাখ্যান

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাউন্ডারি ঘেঁষে যে নতুন সুরম্য অট্টালিকাটি, ওপথে যাওয়ার সময় অবশ্যই নজর কাড়বে সেটি ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’। এটি আগুনে পোড়া আর এসিড দগ্ধ মানুষের জন্য পৃথিবীর বৃহত্তম হাসপাতাল।

সাম্প্রতিক সময় যে কিছু মারাত্মক অগ্নিদুর্ঘটনা; নিমতলী কিংবা চকবাজারে আর ২০১২-১৩ তারপর আবার ২০১৪-১৫-তে কখনো যুদ্ধাপরাধীর বিচার আর কখনো নির্বাচন ঠেকানোর অজুহাতে দেশজুড়ে জামায়াত-বিএনপি চক্রের যে আগুন সন্ত্রাস, তার প্রেক্ষাপটে এমন একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই কারোরই। তেমনি কারো প্রশ্ন নেই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ নিয়েও। কারণ এই নামকরণটির মধ্য দিয়ে ইতিহাসকে ইতিহাসের অংশ করে নেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে এক এবং অদ্বিতীয়ম অথচ আমাদের দেশজ প্রেক্ষাপটে এত প্রয়োজনীয় এই প্রতিষ্ঠানটির স্বপ্নদ্রষ্টা আমাদের স্বপ্নদিশারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ নন।

এমন একটি ঐতিহাসিক হাসপাতালে আমার প্রথম যাওয়ার প্রেক্ষাপটটা অবশ্য ছিল একেবারেই অন্যরকম। যাওয়াটা অবশ্য চিকিৎসক হিসেবেই তবে, চিকিৎসা করতে নয়। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন স্যার ক’বারই বলেছিলেন হাসপাতালটা একবার দেখে আসতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে মনের মতো করে গড়ে তুলেছেন তিনি এই হাসপাতালটিকে।

স্যারের সাথে আমার যোগাযোগটা বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত। আমার শাশুড়ি শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর সাথে তার পরিচয় কয়েক দশকের। তবে এই কারণ ছাপিয়েও তার সাথে আমার হৃদ্যতার গভীরতার দ্বিতীয় কারণটি হলো আমরা দুজনই সিলেটি। স্যার বলেছেন বেশ কয়েকবারই, কিন্তু যাই-যাই করে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কাজেই এবার যখন তার হাসপাতালে পিঠা উৎসবের দাওয়াতটা দিলেন, ঠিক করলাম কোনোমতেই হাতছাড়া করা যাবে না অমন সুযোগ। যাকে বলে রথ দেখার পাশাপাশি, কলা বেচা আর কি।

শীতের মিষ্টি সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ট্যারেসে বসে আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে পিঠার সাথে-সাথে সামন্ত লাল স্যার শেয়ার করছিলেন তার প্রিয়তম এই হাসপাতালের নানা স্মৃতি। তার গর্বিত বয়ানে কখনো চকবাজারের ভয়াবহতা তো কখনো ইটের পর ইট গেঁথে সুরম্য এই হাসপাতালটি তৈরির উপাখ্যান।

কথায় কথায় উঠে আসে রাবেয়া আর রোকেয়ার গল্পও। স্কুলশিক্ষক দম্পতি রফিকুল ইসলাম ও তাসলিমা খাতুনের ঘরে জন্ম নিয়েছিল ক্রেনিয়প্যাগাস ভ্যারাইটির কনজয়েন্ড টুইন রাবেয়া-রোকেয়া। তাদের মাথা দুটো একসাথে জোড়া লাগানো ছিল জন্মসূত্রে। মেয়েদের চিকিৎসার জন্য যখন দুয়ারে-দুয়ারে মাথা কুটে ফিরছেন রফিকুল-তাসলিমা দম্পতি, তখনই রাবেয়া-রোকেয়ার বিষয়টি নজড়ে আসে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা আপার। তিনি বিষয়টি জানান বড় আপাকে। আর বড় আপা পরম মমতায়, মাতৃস্নেহে তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বড় আপার নির্দেশে অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন স্যারের তত্ত্বাবধানে কখনো ঢাকা তো কখনো হাঙ্গেরিতে দফায়-দফায় চিকিৎসা চলে তাদের।

সবশেষ ২০১৯-এর জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ঢাকা সিএমএইচে হাঙ্গেরি ও বাংলাদেশের যৌথ চিকিৎসক দলের ৩৩ ঘণ্টার ম্যারাথন সার্জারিতে আলাদা করা সম্ভব হয় রাবেয়া-রোকেয়াকে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও দু-একটি অপারেশনের প্রয়োজন পড়বে। তবে এই মুহূর্তে রাবেয়া আর দশটি স্বাভাবিক বাচ্চার মতোই খেলছে, হাঁটছে, বলছে আর বেড়ে উঠছে। রোকেয়ার উন্নতিটা একটু ধীর, তবে সেও এখন খেতে পারে। তার হাত-পায়ের নড়াচড়াও ধীরে-ধীরে ফিরে আসছে। আশা করা যায় রাবেয়ার মতো সেও দ্রুতই স্বাভাবিকতায় ফিরে আসবে।

রাবেয়া-রোকেয়ার গল্প বলতে যেয়ে সামন্ত লাল সেন স্যার বলছিলেন তার একটি আকাঙ্ক্ষার কথা। রাবেয়া-রোকেয়াকে আলাদা করার মতো এত জটিল অপারেশন এত সফলভাবে করার নজির গোটা পৃথিবীতেই হাতেগোনা। অথচ আজ সেই কৃতিত্বটাও আরও অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করার সাফল্যের মতোই বাংলাদেশের ঝুলিতে।

আর এটি সম্ভব হয়েছে শুধু বঙ্গবন্ধুকন্যার দূরদর্শিতা আর মহানুভবতায়। এই সাফল্যকে তিনি তাই উৎসর্গ করতে চান যোগ্যতম কন্যার গর্বিত পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আগস্টে পিতা হারানোর বেদনায় যখন আবারও বেদনার্ত জাতি, হঠাৎ করেই সামন্ত লাল স্যারের সেই কথোপকথন মনটাকে কেন যেন একটু নাড়া দিয়ে গেল।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]