দীর্ঘমেয়াদি কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে কৃষির বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে শীত ও কুয়াশা একটি পরিচিত মৌসুমি বাস্তবতা। সাধারণভাবে এই শীতকাল বহু ফসলের জন্য সহায়ক হলেও, যখন শীত তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহে রূপ নেয়, তখন তা কৃষির জন্য আশীর্বাদ না হয়ে ধীরে ধীরে একটি নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতির ক্ষতি কেবল সাময়িক উৎপাদন হ্রাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ফসলের জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, ফেনোলজি, রোগবালাইয়ের বিস্তার, মাটির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং কৃষকের আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবিত করে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে, যেখানে কৃষির একটি বড় অংশ সূর্যালোক ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে কুয়াশা ও তীব্র শীতের অভিঘাত আরও গভীর ও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে।
ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের পেছনে সাধারণত কয়েকটি পরিবেশগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে। রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে যায়, দিনের সূর্যালোকের সময় ও তীব্রতা কমে আসে এবং বাতাসে জলীয় কণার আধিক্যের ফলে আর্দ্রতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ফসলের আবহাওয়াগত অভিজ্ঞতা মূলত তাপমাত্রা ও আলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এই দুই উপাদানের সামান্য বিচ্যুতিও কৃষির জৈবক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কুয়াশা যখন দিনের পর দিন সূর্যের আলোকে আড়াল করে রাখে এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচে অবস্থান করে, তখন ফসলের স্বাভাবিক জৈব ছন্দ ভেঙে পড়ে এবং গাছের অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার গতি কমে যায়।
তাপমাত্রা ও আলো ফসলের ফটোসিন্থেসিস ও মেটাবলিজমের প্রধান চালিকাশক্তি। আলো ও তাপ কমে গেলে ফটোসিন্থেসিসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং উদ্ভিদ প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদনে ব্যর্থ হয়। এর ফলে পাতার বৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়ে, মূলের বিস্তার সীমিত হয় এবং পুরো গাছ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে ওঠে। এই অবস্থা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে শস্য ও শাকসবজির গাছ খর্বাকৃতির হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী পর্যায়ে ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ফসলের জীবনচক্রের স্বাভাবিক সময়সূচিও ব্যাহত হয়। বীজ অঙ্কুরোদগম ধীর হয়ে যায়, বীজতলা ও চারার বৃদ্ধি হার কমে আসে এবং ফুল ফোটা ও ফল গঠনে বিলম্ব ঘটে। এর প্রভাব কেবল একটি ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; একটি ফসলের বিলম্ব পরবর্তী ফসলের সময়সূচিকেও পিছিয়ে দেয়, ফলে কৃষকের পুরো মৌসুম পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে পড়ে।
ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘ তীব্র শীত যদি নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়, তবে তা কৃষির জন্য কেবল একটি মৌসুমি চ্যালেঞ্জ নয়; বরং একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নেবে। ফসলের জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে লবণ চাষের মতো সূর্যালোকনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুই এর প্রভাবের আওতায় পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত গবেষণা, জলবায়ু সংবেদনশীল ও স্মার্ট কৃষি কৌশল এবং শক্ত নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। অন্যথায় কুয়াশার এই নীরব আগ্রাসন ধীরে ধীরে কৃষির ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে, যার প্রভাব পড়বে গোটা সমাজ ও অর্থনীতির ওপর।
শীত ও কুয়াশার আরেকটি গুরুতর প্রভাব পড়ে পরাগায়ন ও দানা গঠনের ওপর। আলো ও তাপমাত্রা কম থাকলে পরাগায়ন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। গম, সরিষা কিংবা ডালজাতীয় ফসলে এ প্রভাব আরও প্রকটভাবে দেখা যায়। পরাগায়ন ব্যাহত হলে দানা অপুষ্ট থেকে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ফলনহীন অংশের সংখ্যা বেড়ে যায়, যার ফলে মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘ শীত ফসলের জন্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে। উচ্চ আর্দ্রতা ও কম তাপমাত্রা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী অবস্থা সৃষ্টি করে। এই কারণে শীত মৌসুমে আলুতে লেট ব্লাইট, পেঁয়াজ ও রসুনে পার্পল ব্লচ এবং বীজতলায় বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগ দমনের জন্য কৃষককে অতিরিক্ত কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়, যার ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মাটির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বোরো ধানের বীজতলা শীত ও কুয়াশার প্রভাবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল একটি পর্যায়। দীর্ঘ সময় ঠান্ডা ও সূর্যালোকহীন অবস্থায় চারার রং ফ্যাকাশে বা লালচে হয়ে যায়, বৃদ্ধি প্রায় থেমে আসে এবং চারার মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষককে পুনরায় বীজতলা তৈরি করতে হয়, যা সময় ও অর্থ উভয়ের জন্যই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শীতকালীন আবহাওয়ার প্রভাব মাটির ভেতরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। মাটির তাপমাত্রা কমে গেলে মাটির ভেতরের জীবাণু কার্যক্রম শ্লথ হয়ে যায়, ফলে পুষ্টি উপাদান সহজে ভাঙতে পারে না। শিকড়ের পানি ও পুষ্টি গ্রহণ ক্ষমতা কমে যায় এবং এনজাইমের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রক্রিয়া মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয় এবং ফসলের সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে তোলে।
এই পরিস্থিতিতে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণ চাষ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে লবণ চাষ পুরোপুরি সূর্যালোক, তাপমাত্রা ও বাষ্পীভবনের ওপর নির্ভরশীল। ঘন কুয়াশা এই সব উপাদানকে একসঙ্গে বাধাগ্রস্ত করে। সূর্যের তাপ মাঠে পৌঁছায় না, বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে এবং বাষ্পীভবনের হার কমে যায়। ফলে লবণের স্ফটিকায়ন থমকে যায়, জমে থাকা আধা শুকনো লবণ আবার গলে যেতে শুরু করে, যা চাষিরা “লবণ মারা যাওয়া” বলে অভিহিত করেন। এই অবস্থায় শুধু উৎপাদনই কমে না, লবণের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়; দানা ছোট ও ভঙ্গুর হয়, রং ধূসর হয়ে যায় এবং বাজারদর কমে যায়। এর ফলে চাষির দীর্ঘদিনের শ্রম ও বিনিয়োগ অপ্রত্যাশিত অনিশ্চয়তায় পড়ে।
লবণ চাষ নিজেই অত্যন্ত আবহাওয়ানির্ভর ও সংবেদনশীল। প্রথমে জমি সমতল করে চারপাশে মাটির আইল তৈরি করা হয়, তারপর ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে পর্যাপ্ত রোদে শুকানো হয় এবং তার ওপর কালো বা নীল পলিথিন বিছানো হয়। জোয়ারের সময় নালা বা শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে সাগরের লবণাক্ত পানি প্লটে প্রবেশ করানো হয়। চার থেকে পাঁচ দিনের কড়া রোদে পানি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে পলিথিনের ওপর লবণ জমে। পরে লবণ মাঠ থেকে সংগ্রহ করে পানি ঝরানো হয় এবং পাইকারদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর কাঁচা লবণ কারখানায় নিয়ে রিফাইনারি মেশিনে ময়লা ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা অপসারণ করে ভোজ্য বা শিল্প উপযোগী মানে উন্নীত করা হয়। পুরো এই প্রক্রিয়ায় সূর্যের তাপ, বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ ও শুষ্ক আবহাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা ও তীব্র শীত এই স্বাভাবিক চক্র ভেঙে দিয়ে উপকূলীয় লবণ চাষকে ক্রমেই আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে, যার সামাজিক প্রভাবও গভীর; উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রান্তিক চাষির আয় কমে যায়, খরচ উঠানো কঠিন হয়ে পড়ে, শ্রমিকদের কাজ অনিশ্চিত হয় এবং অনেক চাষি ঋণের ভারে জড়িয়ে পড়েন। কুয়াশা তাই শুধু আবহাওয়াজনিত সমস্যা নয়, বরং উপকূলীয় জীবিকা ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
গত কয়েক বছরের আবহাওয়াগত উপাত্ত দেখায় যে বাংলাদেশে শীত মৌসুমের প্রকৃতি স্পষ্টভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২০১৫ সালের পর শীতকালীন কুয়াশার স্থায়িত্ব এবং শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা উভয়ই বেড়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারিতে দেশের উত্তর, মধ্যাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় দিনের পর দিন সূর্যালোকহীন অবস্থা বিরাজ করছে। গত এক দশকে প্রতি শীত মৌসুমে গড়ে ৮–১২ দিন মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে ১৯৯০-এর দশকে তা ছিল মাত্র ৪–৬ দিন। একই সময়ে ঘন কুয়াশার দিনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিছু বছরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে টানা ১০–১৫ দিন সূর্যের আলো কার্যত বাধাগ্রস্ত থাকার নজির মিলেছে, যা লবণ চাষ ও শীতকালীন কৃষির জন্য ক্ষতিকর। সর্বনিম্ন তাপমাত্রার দিক থেকেও উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়; উত্তরাঞ্চলে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা ৬–৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেছে, যা ফসলের স্বাভাবিক সহনশীল সীমার কাছাকাছি। একই সঙ্গে দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান বেড়ে উদ্ভিদের অভিযোজন আরও কঠিন হয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য ক্রমবর্ধমান ও কাঠামোগত ঝুঁকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই সমস্যার তীব্রতা আরও বাড়ছে। শীত মৌসুম এখন আর আগের মতো পূর্বানুমানযোগ্য নয়। শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতা ও কুয়াশার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই অস্থিরতা কৃষির প্রাকৃতিক ছন্দকে ভেঙে দিচ্ছে এবং কৃষকদের জন্য ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে তুলছে। এই সবকিছুর সামগ্রিক প্রভাব গিয়ে পড়ে কৃষকের আয় ও জীবনযাত্রার মানে, খাদ্য উৎপাদনের স্থিতিশীলতায়, বাজারদরের অস্থিরতায় এবং সর্বোপরি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায়। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি একটি স্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি সতর্ক সংকেত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘ তীব্র শীত যদি নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হয়, তবে তা কৃষির জন্য কেবল একটি মৌসুমি চ্যালেঞ্জ নয়; বরং একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নেবে। ফসলের জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে লবণ চাষের মতো সূর্যালোকনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুই এর প্রভাবের আওতায় পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত গবেষণা, জলবায়ু সংবেদনশীল ও স্মার্ট কৃষি কৌশল এবং শক্ত নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। অন্যথায় কুয়াশার এই নীরব আগ্রাসন ধীরে ধীরে কৃষির ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে, যার প্রভাব পড়বে গোটা সমাজ ও অর্থনীতির ওপর।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন
[email protected]
এইচআর/এএসএম