বন্যায় দারিদ্র্য, দরিদ্র ভেসে যাবে

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১২:১৪ পিএম, ০৩ আগস্ট ২০২০

আমাদের গ্রামের বাড়ি ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাশে। এখন যথেষ্ট ‘হাই’ হলেও ৮৮ সাল পর্যন্ত সড়কটি যথেষ্ট উঁচু ছিল না। মনে আছে ১৯৮৮ সালের বন্যায় অনেকদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ডুবে ছিল। যোগাযোগ তো বন্ধ ছিলই, রাস্তারও বারোটা বেজে গিয়েছিল। সেই মহা বন্যার পরেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আরো উঁচু করা হয়। আমাদের বাড়ি বন্যাপ্রবণ এলাকায়। প্রতিবছরই টুকটাক বন্যা হয়। তবে বাড়িঘর ডুবিয়ে দেয়া বন্যা কয়েকবছর পরপর হয়। ছেলেবেলায়, সম্ভবত ৭৪ সালে একবার দেখেছিলাম। আর ১৯৮৮ সালের বন্যা তো ইতিহাস হয়ে আছে।

ছেলেবেলায় বন্যা আমাদের দারুণ আনন্দের উপলক্ষ্য ছিল। স্কুলে যেতে হচ্ছে না। আর ঘরে বসেই, এমনকি চৌকিতে বসেই পানি ধরা যাচ্ছে; এটা ছিল বিস্ময়কর আনন্দের। স্কুল তো বন্ধই, বাড়িতেও পড়ার চাপ নেই। মুরুব্বিরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে বা পালাক্রমে জেগে থেকে সাপ খোপ পাহাড়া দিচ্ছেন, কেউ চল দিয়ে বা বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন, কলা গাছের ভেলায় চেপে এ বাড়ি ও বাড়ি যাচ্ছেন- সবটাই আমাদের কাছে ছিল মজার। বন্যার ভয়াবহতাটা তখন বুঝতে পারিনি। তবে ৮৮এর ভয়াবহ বন্যার প্রায় পুরোটা সময় বাড়িতেই ডুবে ছিলাম।

ডুবে ছিলাম মানে আসলে ডুবেই ছিলাম। আমাদের গোটা এলাকায় মহাসড়কের একটি ব্রিজের দুই পাশের অল্প কিছু এলাকা ছাড়া আর কোনো মাটি ছিল না। সেইটুকু মাটিতেই ছিল এলাকার বাজার হাট, গবাদি পশুর বিচরণ, এলাকার পুরুষদের দিনভর আড্ডা। মনে আছে আমরা সকালে লুঙ্গি পরে সকালে বাড়ি থেকে বের হতাম। আস্তে আস্তে পানি বাড়তো, লুঙ্গি ওপরে তুলতাম। এক পর্যায়ে লুঙ্গি এক হাতে উঁচু করে ধরে সাঁতরে রাস্তায় উঠতাম। সেখানে সারাদিন আড্ডা মেরে, তাস খেলে, ত্রাণ কাজ চালিয়ে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতাম। আমরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে নৌকা নিয়ে বিলের মাঝখানে চলে যেতাম। তারপর আড্ডা মারতে মারতে কাজ সারতাম।

মাঝে মাঝে আমরা নৌকা নিয়ে বেরুতাম আরো ভেতরে বন্যায় আটকে পড়া মানুষদের দেখতে বা কারো জরুরি কিছু লাগবে কিনা জানতে। একবার এক বাড়িতে গেছি নৌকায়। সে বাড়ির পাশে একটি বরই গাছ ছিল। কিন্তু গাছটির পুরোটাই ডুবে ছিল। তাই কেউ দেখতে পাইনি। বরই গাছে ধাক্কা লেগে নৌকা গেল উল্টে। বরই গাছের ডালে-কাটায় লুঙ্গি আটকে ব্যাড়াছ্যাড়া অবস্থা হয়েছিল। শরীরের নানা জায়গা কেটে গিয়েছিল। গাছের কথা যখন এলো, তখন আরেকটা গাছের কথা বলে নেই। আমাদের এলাকায় খুব একটা কাঠাল গাছ নেই। কারণ বন্যায় অনেক গাছই মরে যায়, সবার আগে মরে কাঠাল গাছ। এমনও হয়েছে, ১০/১৫ বছরের পুরোনো কাঠাল গাছ, একবারের বন্যায় শেষ। শুধু কাঠাল গাছ নয়, দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় আরো অনেক গাছ মরে যায়, ডুবে যায় ফসল। মানুষ নিজের চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে গবাদি পশু নিয়ে। অবর্ণনীয় সে দুর্ভোগ।

৮৮এর বন্যায় আমাদের, মানে পুরুষদের দিন তো এভাবে কাটছিল। কিন্তু ঘরের অবস্থা ভাবুন একবার। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে। প্রতিদিন রান্না করাই একটা যুদ্ধ। ঘরে বাজার থাকলে সেই যুদ্ধও না হয় লড়া যায়। কিন্তু যাদের এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, তাদের জন্য যুদ্ধটা একতরফা হয়ে যায়। রান্নার যুদ্ধও না হয় লড়া যায়, কিন্তু বন্যায় আটকে পড়া নারীরা কীভাবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেন, কীভাবে বিশুদ্ধ খাবার পানি জোগাড় করতেন; সেটা এখনও এক রহস্য। কারণ গ্রামের সব টয়লেট ও টিউবওয়েল ডুবে গিয়েছিল। বন্যার শেষদিকে আমরা কোনোরকমে আব্বার তখনকার কর্মস্থল রাঙামাটিতে চলে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষেরই সরে যাওয়ার মত নিরাপদ জায়গা নেই। বন্যা বা নদী ভাঙ্গনের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেকে ঢাকায় চলে আসেন। কিন্তু আমাদের রাজধানীও তো এইসব জলবায়ু উদ্বাস্তুদের ধারণ করার মত মানবিক নয়। বরং এবার করোনা অনেক মানুষকে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। ঢাকায় কাজ নেই; গ্রামের বাড়ি হয় নদীর পেটে নয় পানির নিচে। মানুষ যাবেটা কোথায়?

এবারের বন্যা এখনও ৮৮এর মত ভয়াবহ হয়নি। সে বন্যার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অনেক উঁচু করা হয়েছে। তাই অন্তত বন্যায় আর মহাসড়ক ডোবার আশঙ্কা নেই। ঢাকাকে নিরাপদ রাখতে বাঁধ দেয়া হয়েছে। তাই ঢাকার চারপাশে বন্যা ধেয়ে এলেও আমরা তা টের পাবো না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ঢাকায় বসে বন্যার ভয়াবহতা ও ভোগান্তির মাত্রা সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। ঢাকায় নিরাপদ ফ্ল্যাটে বসে আমরা আহা-উহু করবো, বিশাল বিশাল কলাম লিখবো, জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দেবো, টকশো গরম করবো; কিন্তু আমরা কখনোই বন্যাদুর্গত মানুষের দুঃখ-কষ্ট, চাহিদা-অভাব বুঝবো না। তাও বন্যা এলে শহরের মানুষদের অনেকে ত্রাণ নিয়ে ছুটে যায়। কিন্তু এবার সে তৎপরতাও কম। কারণ কদিন আগে করোনায় ঘরবন্দী মানুষকে ত্রাণ দিয়ে ক্লান্ত দাতারাও।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের মানুষকে নিয়মিতই ঝড়-বন্যা-সাইক্লোনের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়। তাই এটা তাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। কীভাবে দুর্যোগ মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হয়, সেটা তাদের চেয়ে ভালো আর কেউই জানে না। নদীমাতৃক বাংলাদেশে বন্যা ফিবছরের ঘটনা। বরং বন্যা না হলে আমাদের জমি উর্বরাশক্তি হারাবে। কিন্তু এবারের মত উপর্যুপরি দুর্যোগ সামাল দেয়া যে কারো জন্যই কঠিন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু পিঠ ঠেকানোর জন্য একটা দেয়াল তো লাগবে। এবার করোনা-আম্পান-নদীভাঙ্গন আর উপর্যুপরি বন্যা গরীব মানুষের পিঠ থেকে দেয়ালটাও ভাসিয়ে নিয়েছে।

যতই অভ্যস্ত হই না কেন, বন্যা একটি জটিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সবকিছু ডুবে গেলে মানুষের আর করার কিছু থাকে না। কিন্তু আসল বিপদ শুরু হয়, বন্যা চলে যাওয়ার পর। পত্রিকায় যখন লেখা হয়- বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি। তখন আসলে পরিস্থিতির সত্যিকারের অবনতি ঘটে। পানি যতদিন থাকে, ততদিন চেয়ে-চিন্তে, ত্রাণ নিয়ে দিন তবু কেটে যায়। কিন্তু পারি নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় আসল দুর্ভোগ। সব ফসল ভেসে গেছে, ঘরে খাবার নেই, করার মত কাজ নেই, বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই, শুরু হয় নানান রোগ, পানি নেমে গেছে বলে ত্রাণ নিয়েও কেউ আসে না। তাই পানি নেমে যাওয়ার পর আসল দুর্যোগে তারা কাউকে পাশে পায় না।

এবার পরিস্থিতি আরো খারাপ। কারণ করোনার কারণে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। অর্থনীতির চাকা মন্থর বলে প্রান্তিক মানুষগুলো এমনিতেই বিপদে আছে। তাও যখন করোনা আতঙ্ককে পাশে রেখে মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছিল। তারপর আম্পান এসে তাদের শুইয়ে দিয়েছে। আর এখন বারবার বন্যা এসে তাদের ভাসিয়ে নিচ্ছে যেন। বন্যা এলে আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলি, বন্যার পানিতে যেন সব দুর্যোগ, দুর্দশা দারিদ্র ভেসে যায়। কিন্তু এবারের বন্যায় দারিদ্র নয়, দরিদ্র মানুষের ভেসে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে। অনেক মানুষ এবার নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হবেন। এবার দেশের বিশাল এলাকার মানুষের জীবনে ঈদ আসেনি। সামর্থ্য থাকলেও অনেক এলাকায় পশু জবাই করার মত জায়গাই ছিল না।

এখন সরকারকেই এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও প্রয়োজনে ত্রাণ দিতে হবে, ঔষধ দিতে হবে। পানি নেমে গেলে বীজ, সার, কীটনাশক দিতে হবে। ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকতে হবে। আশার কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কাটা জানেন এবং সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মমতার হাত পাশে থাকলে বানভাসি মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবে।

৩ আগস্ট, ২০২০

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]