কৃষি অব্যবস্থাপনাতেই পেঁয়াজের ঝাঁজ

মোস্তফা হোসেইন
মোস্তফা হোসেইন মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত: ১২:০৫ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

আবারও পেঁয়াজ নিয়ে হৈ চৈ। কথা নেই বার্তা নেই, সকালের বাজারের তুলনায় বিকেলের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে আকাশছোঁয়া। উছিলা কি? ভারত রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। খুব ভালো কথা ভারত থেকে পেঁয়াজ আসবে না, এটা তো দুদিন পর থেকে বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার কথা। দোকানে থাকা পেঁয়াজগুলোর দাম বেড়ে গেলো কেনো? আর মানুষও কোন কারণে হুমড়ি খেয়ে পড়লো বাজারে। যার ঘরে ১০ কেজি পেঁয়াজ লাগে মাসে তিনি একাই কিনে ফেলছেন ৩০ কেজি।

লাইন ধরে পেঁয়াজ কেনার এই অবস্থা কেন? ৩০ কেজি পেঁয়াজ কিনে ঘরে আনলে কি তিনি আগামী মৌসুম পর্যন্ত বাড়তি দামে পেঁয়াজ কেনা থেকে রক্ষা পাবেন? অথচ সরকারি হিসাব মতে আরও কয়েক মাস চলার মতো পেঁয়াজ দেশে মজুত আছে। সেই মজুত শেষ হওয়ার আগেই আবার আমদানি করা পেঁয়াজে দেশে পৌঁছে যাবে।

আসলে পেঁয়াজই শুধু নয় একসময় তেল ও চিনি নিয়ে এমন হতে দেখেছি। পেঁয়াজের ঝাঁজতো প্রতি বছরই বাড়ে। নিত্য ঘটনার মতো। আর আমাদেরও একই দৃশ্য দেখতে হয়। দোকানীরা সুযোগ বুঝে পকেট ভারি করে, ক্রেতারা কামড়াকামড়ি করে। সবচেয়ে বড় কথা, মূল জায়গাটা থাকে অছোঁয়া।

আমরা প্রতিবছরই দেখি পেঁয়াজের চাষীরা সর্বোত চেষ্টা করছেন উৎপাদন বজায় রাখতে। তারা তাদের বুদ্ধি অনুযায়ী উৎপাদন করেন। এখানে সরকারের কৃষি ব্যবস্থাপনা কতটা ভূমিকা রাখছে তা কিন্তু কেউ দেখছে বলে মনে হয় না। দেশের চাহিদা ও উৎপাদন বিশ্লেষণ করে পরবর্তী বছরে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করার কোনো প্রচেষ্টা কি আছে আমাদের এখানে? যতদূর জানি নেই। গয়রহ একটা হিসাব দেয়া হয় এত টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। কতটন ঘাটতি আছে সেটাও একটা হিসাব দেওয়া হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ীই গত কয়েক বছর পর্যন্ত পেঁয়াজের উৎপাদন স্থিতিশীল। আর চাহিদাটাও তেমনি। কয়েক বছর ধরে গড়ে পেঁয়াজের উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ১৭ লাখ টন। মতান্তরে ২৫ লাখ টন। এটা এক যুগ আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে সত্যি কথা। কিন্তু চাহিদার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে না। চাহিদা তো ৩২ লাখ টন। সেই হিসাবে চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি হয়নি। আর এই বিষয়গুলো আমাদের নিয়মিতই দেখতে হচ্ছে।

আমাদের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কম। তাই চাষের শুরুতেই অধিকগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চালের প্রতি আমাদের নজর দিতে হয়। একসময় সাড়ে ৭ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারতাম না আমরা। পাকিস্তান আমলে না খেয়ে মানুষকে মরতে হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলো ওঠেপড়ে লাগে চালের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য।

এক পর্যায়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের চালের উৎপাদন বিশ্বমাত্রায় পৌঁছেছে। আমরা গর্ব করতে পারি চালের উৎপাদন বৃদ্ধি বিষয়ে। একসময়ের খাদ্য ঘাটতির দেশটি ধাপে ধাপে বিশ্বের তৃতীয় চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে স্থান করে নিতে পেরেছে। আমাদের দেশের চালের ২ কোটি ৯০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে বিপরীতে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে। কোনো কোনো হিসাবে চাহিদার পরিমাণ ২ কোটি ৭০ লাখ টন। বেশিটাও যদি আমলে নেই আমাদের চালের উদ্বৃত্তের পরিমাণ ৭০ হাজার মেট্রিক টন।

প্রশ্ন হচ্ছে এখানেই। প্রথম চাহিদা হিসেবে আমরা চালের দিকে নজর দিয়েছি। চাল উৎপাদনে আমরা সফল হয়েছিই শুধু নয়, উদ্বৃত্ত উৎপাদনও করতে পেরেছি। এখন আমাদের দ্বিতীয় চাহিদা ( উৎপাদন ও চাহিদার হিসাবে) পেঁয়াজের দিকে নজর দেওয়ার কথা। সেটা করতে গেলে জমিতো অতিরিক্ত পাওয়া যাবে না। আমাদের ধানের জমিতে হাত দিতে হবে। এটা নতুন কিছু নয়। আমরা রবিশস্য চাষ কমিয়েই কিন্তু ধান উৎপাদন বাড়িয়েছি। এমন জায়গাও আছে যেখানে রবিশষ্য আর বর্ষাতি ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসল হতো না। এখন সেখানে আমরা রবিশষ্য পুরোটা বন্ধ করে দিয়েছি। রবিশষ্যের জমিতে ধান উৎপাদন করতে গিয়ে চাষী কিন্তু লাভবান হয়নি। বরং একদিক ঢাকতে গিয়ে আরেকদিক উদোম হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে পেঁয়াজ ও মরিচে ঝাঁজ ও ঝাল কমাতে হলে পরিকল্পিতভাবে ধান থেকে কিছু অংশ রবিশষ্যে ফিরে যেতে হবে।

এক্ষেত্রে চাষীর নিরাপত্তা দিতে হবে সরকারকে। ধরা যাক চাষী মরিচ ও পেঁয়াজ চাষ করলো। ফসল ঘরে নেয়ার পথে তার ব্যয় নির্বাহের জন্য ফসল বিক্রি করতে গেলো। দেখো গেলো বাইরের পেঁয়াজ এসে বাজার ভরে গেছে। কৃষকের মাথায় হাত। গত মৌসুমে এমন হয়েছেও। পেঁয়াজ এমন একটা ফসল যা ঘরে রাখা মোটামুটি ঝুঁকিপূর্ণ। সেই অবস্থায় কৃষককে রক্ষা করবে কে? কৃষক যদি উৎপাদন ব্যয় না তুলতে পারে তাহলে সে কেন আবার সেই ফসল করতে যাবে? মূল কথা হচ্ছে- কৃষি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে যে আমাদের প্রতিবছর পেঁয়াজ কাণ্ড দেখতে হচ্ছে এটা কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না।

প্রশ্ন আসতে পারে সিন্ডিকেটের বিষয়। সিন্ডিকেট আছে অবশ্যই। তারা ওৎপেতে থাকে কখন শিকার ধরা যাবে। ভারত যদি একটু এদিক সেদিক করে তাহলেই তারা শিকার ধরার মতো সাধারণ ক্রেতার মাথা চিবিয়ে খায়। কৃষি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে পারলে সহজেই সিন্ডিকেটদেরও দমিয়ে আনা যাবে। এক্ষেত্রে আবারও চালের উদাহরণ দিতে পারি।

দুই বছর আগের একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে পারি। বাংলাদেশ ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধ করায় সেবছর ৯ মাসেই তাদের চাল রফতানি ১০.২% কমে যায়। এটা রয়টার পরিবেশিত সংবাদ। তারা সেবছর ৮৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন চাল রফতানি করতে পেরেছিল। আমরা ভুলে যাইনি পেঁয়াজের মতো সিন্ডিকেটের নাকানিচুবানী আমরা চালেও খেয়েছি। যেহেতু উৎপাদন বেড়েছে আমদানি হচ্ছে না তাই তাদেরও দৌড়াত্ম্য কমেছে। তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আমাদের কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো। রবিশস্য মৌসুম আসন্ন। এখনই নজর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আমাদের ভারতের উপর নির্ভর করে থাকতে না হয়। আর সিন্ডিকেটের নাকানীচুবানীও না খেতে হয়।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]