আসন্ন জনশুমারি এবং তৃতীয় লিঙ্গ প্রসঙ্গ

শাকিল বিন মুশতাক
শাকিল বিন মুশতাক শাকিল বিন মুশতাক , সাংবাদিক-কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

প্রতি দশ বছরে হয় জনশুমারি। অনেকে আদম শুমারিও বলে থাকেন এই জরিপকে। বড় কোনো ব্যত্যয় না ঘটলে পরবর্তী জন শুমারি অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২১-এ। সারাদেশে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের কাজটি করবে বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস বা বিবিএস। সরকারি এই সংস্থাটির নাম সারা বছর নানাভাবে গণমাধ্যমের বিভিন্ন খবরের সূত্র হিসেবে উচ্চারিত হলেও গবেষক, সংবাদকর্মী ছাড়া তেমন কেউ আর স্মরণে রাখেন না। কিন্তু সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তায়নে দরকারি তথ্য, উপাত্তগুলোর সরবারহ এঁরাই করেন। নিরবে, নিভৃতে দশকের পর দশক তাঁরা অজস্র পরিসংখ্যানের যোগান দিয়ে গেছেন। এবার তাঁদের সামনে এক চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। তৃতীয় লিঙ্গদের জন শুমারিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠেছে। এর অর্থ হল এর আগেও হয়তো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা এই শুমারিতে ছিলেন কিন্তু তা তাঁদের পরিচয়ে নয় বরং পুরুষ কিংবা নারী হিসেবে। এবার তার ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে।

২০১৩ বাংলাদেশের তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্বরণীয় বছর। এই বছরেই প্রথমবারের মত সরকারিভাবে হিজরারা তৃতীয় লিঙ্গ স্বীকৃতি পায়। মন্ত্রিসভায় স্বীকৃতি পাবার পরের বছরেই রাজধানী ঢাকায় ‘প্রাইড মার্চ’ করেন হিজড়ারা। এরপরের বছরগুলোতে স্বীকৃতির কিছু পলিসিগত সুফল মেলে যেমন, হিজড়াদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নেও পদক্ষেপ নিতে সরকার ২০১৫-তে ট্রাফিক পুলিশে নিয়োগ দেবার একটি সিদ্ধান্ত নেয় (আজ পাঁচ বছর পর ঐ সিদ্ধান্তের কি হাল তা নিয়ে অনুসন্ধান হতেই পারে)। পাশাপাশি একই বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে হিজরা উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়র জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেয়। এসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রাম বিভাগের মহাব্যবস্থাপক গণমাধ্যমকে এমন নির্দেশনার কারণ জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘‘সমাজের সব ধরনের উদ্যোক্তারা যাতে ব্যাংক ঋণ পায়, সেজন্য আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি৷ বাংলাদেশ ব্যাংক দেশে মানবিক ব্যাংকিং চালু করতে চায়৷ এ জন্য কোনো শ্রেণি বা সম্প্রদায় যেন ব্যাংকিং পরিসেবার বাইরে না থাকে সেই ব্যবস্থা করা হবে৷'' যুগান্তকারী এই নির্দেশনারই বা সুফল কতজন হিজড়া পেলেন সেটি নিয়েও মাঠের সাংবাদিকেরা কাজ করতে পারেন। পাঁচ বছরের একটি মূল্যায়ন অবশ্যই হওয়া উচিত।

২০১৯-এ ভোটার তালিকা বিধিমালায় পরিবর্তন এনে তাদের হিজড়া হিসেবে ভোটার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন- ইসি। ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ১৬ ধারার ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা বিধিমালা, ২০১২ সংশোধন করেছে। ফলে ভোটার নিবন্ধন ফরমের ১৭ নম্বরে লিঙ্গ পরিচয়ের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলা এ দুটির সঙ্গে এখন হিজড়া নামে আরেকটি ঘর যুক্ত হয়েছে। এগুলোই সাম্প্রতিক অগ্রগতি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে হিজড়াদের নির্বাচনে অংশ নেবার প্রচেষ্টাও খবরে বেরিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে তাঁদের মূল ধারার সাথে সম্পৃক্ত করবার বিকল্প নেই। আর তাই অধিকার কর্মীরাও লেগে আছেন যেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা তাঁদের নিজ পরিচয়ে নারী কিংবা পুরুষদের মতই দৈনন্দিন জীবন-যাপন করতে পারেন, স্বাভাবিক অধিকার ভোগ করতে পারেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছে হিজড়াদের শুমারির বিষয়টি। বাংলাদেশে হিজড়াদের সংখ্যা কত? সমাজসেবা অধিদফতরের জরিপমতে বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে বেসরকারি হিসেবে সংখ্যাটা আরও বেশি, কারো ধারণা ৪০ হাজার। কেউ ১ লাখও বলে থাকেন। আর এতেই বাঁধছে গোল। সরকারি তথ্য বলছে, ২০১২-২০১৩ অর্থ বছর হতে পাইলট কর্মসূচি হিসেবে দেশের ৭টি জেলায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি শুরু হয়। ৭টি জেলা হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা ,বগুড়া এবং সিলেট। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে বরাদ্দ ছিল ৭২,১৭,০০০(বাহাত্তর লক্ষ সতের হাজার) টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে নতুন ১৪ টি জেলাসহ মোট ২১টি জেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা, গাজীপুর, নেত্রকোনা ফরিদপুর, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, সিলেট।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৪,০৭,৩১,৬০০ (চার কোটি সাত লক্ষ একত্রিশ হাজার ছয়শত টাকা)। ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরের কর্মসূচির বরাদ্দ ৪,৫৮,৭২,০০০.০০ (চার কোটি আটান্ন লক্ষ বাহাত্তর হাজার) টাকা।২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় সম্প্রসারন করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ১১ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা।২০১৯-২০ অর্থ বছরে মোট বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৫,৫৬,০০,০০০/- (পাঁচ কোটি ছাপ্পান্ন লক্ষ) ) টাকা। কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৪ স্তরে (জনপ্রতি মাসিক প্রাথমিক ৭০০, মাধ্যমিক ৮০০, উচ্চ মাধ্যমিক ১০০০ এবং উচ্চতর ১২০০ টাকা হারে) উপবৃত্তি প্রদান ; ৫০ বছর বা তার অধিক বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা জনপ্রতি মাসিক ৬০০ প্রদান ; বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়া জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে তাদের সমাজের মূল স্রোতধারায় আনয়ন ; প্রশিক্ষণোত্তর আর্থিক সহায়তা ১০,০০০/-( দশ হাজার) টাকা প্রদান। অর্থাৎ বরাদ্দ হিসেবে হাজার দশেক মানুষের জন্য খুব কম নয় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। এ জন্য সমাজসেবা অধিদফতরকে ধন্যবাদ। কিন্তু মুশকিল হলো হিজড়াদের যদি সঠিক সংখ্যাটাই জানা না থাকে কিংবা সরকারি শুমারিতে যদি এরা স্থান না পায় তাহলে ‘লাল ফিতার’ নানা শংকা তৈরি হয় কি না?

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে ২০২১ সালে ৬ষ্ঠ ডিজিটাল জন শুমারি করা হবে। আর এ কাজে সহায়তা করবে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন- নাসা। নাসার প্রযুক্তিতে দশমিক ৫ মিটার এলাকাও চিহ্নিত করা যাবে সহজে। এমনকি একটা সুচ পড়ে থাকলেও ধরা পড়বে ক্যামেরায়। ফলে পদ্ধতিতে জনশুমারি সঠিকভাবে হবে বলে মনে করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো - বিবিএস।

সবশেষ জন শুমারি ও গৃহগণনা অনুষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। পঞ্চম আদমশুমারি বলে পরিচিত। ২০১১ সালের ৫ দিনব্যাপী (১৫ থেকে ১৯ মার্চ) এ গণনা অনুষ্ঠিত হয়। বিবিএস প্রতি ১০ বছর পর পর আদমশুমারি পরিচালনা করে থাকে। জানা গেছে এবারের পদ্ধতিতে দেশের একটি খানাও (পরিবার) বাদ পড়বে না। স্যাটেলাইট ইমেজ দেখে আদমশুমারিতে সারাদেশে কয়েক লাখ গণনাকারী তথ্য সংগ্রহ করবেন। একজন মানুষও গণনার বাইরে থাকবে না। সব মানুষের অবস্থান নিশ্চিত করা সহজ হবে স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে। আদমশুমারি মানেই সারাদেশ ব্যাপী বিশাল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু ডিজিটাল এই শুমারিতে কোনো খাতা-কলমের ব্যবহার থাকবে না। সব কিছুই অনলাইনে ডাটা সংগ্রহ করা হবে। শুমারির প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ‘পপুলেশন অ্যান্ড হাউজিং সেনশাস ২০২১’ প্রকল্পের আওতায় ৬ষ্ঠ আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশে প্রথম আদমশুমারি হয় ১৯৭৪ সালে। তারপর ১৯৮১ সাল থেকে প্রতি ১০ বছর পর পর আদমশুমারি হয়ে আসছে।

তবে আশার কথা, শুনিয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র মহাপরিচালক মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর এক ওয়েবিনারে তিনি জানিয়েছেন আগামী জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জনশুমারিতে নারী-পুরুষের পাশাপাশি হিজড়াদের আলাদা লৈঙ্গিক পরিচয়ে যুক্ত করা হবে। জনশুমারির নির্দিষ্ট ফরমে নারী-পুরুষের পাশাপাশি আলাদা লিঙ্গ হিসেবে হিজড়া অপশন থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। প্রথমে চ্যালেঞ্জ বলছিলাম কেন? শোনা যাক তাঁর মুখ থেকেই, ‘যেহেতু হিজড়ারা বেশিরভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ভাসমান, তাই সবাইকে জনশুমারির আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ’।

করোনাকালীন পরিস্থিতিতে শব্দভান্ডারে নতুন করে আলোচিত একটি শব্দ এই ওয়েবিনার। আলোচ্য ওয়েবে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারটি অনেকগুলো কারণে গুরত্বপূর্ণ ছিল, যার অন্যতম এতে সরকারি, আধা-সরকারি নানা গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে যুক্ত রাখা। যার ফলে বিবিএস এর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্যটি পাওয়া গেলো। এমন একটি আয়োজনের ধন্যবাদ যেমন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি–বন্ধু’র প্রাপ্য তেমনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকেও ধন্যবাদ অধিকারহীনতার শত নেচিবাচক খবরের মাঝেও এমন একটি আয়োজনের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আশার আলো দেখাবার জন্য। তবে ওয়াচডগ হিসেবে আমরা সংবাদের মানুষেরা তাকিয়ে থাকবো, শুমারিতে অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী অগ্রগতি দেখবার জন্য।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]