আইনের বাস্তবায়ন ও পরিবারের দায়

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ১৪ অক্টোবর ২০২০

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আন্দোলনকারীরা ধর্ষণকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি জানিয়ে আসছে। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশে সই করেন বলে তার প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। এর আগে গতকাল সোমবার (১২ অক্টোবর) ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০০০’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এ আইনে ছয় মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই এবং আমরা আশা করি এর সুফলও দেশবাসী ভোগ করবে।

তবে একটি বিষয় আমাদের মাথায় রাখা উচিত যে, মৃত্যুদণ্ড দিলেই যে ধর্ষণ কমবে বা কোনো নারী আর ধর্ষিত হবে না, এমনটি ভেবে নিশ্চিত বসে থাকা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কেননা সমাজের সর্বত্রই আজ অস্থিরতা বিরাজ করছে। এসব অস্থিরতা থেকে দেশকে মুক্ত করা একা আইনের পক্ষে একটি কঠিন বিষয়। এ জন্য প্রতিটি পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সোচ্চার হতে হবে। যুবকদের সংশোধনের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আমরা সবাই যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করব কেবল তখনই সম্ভব একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ গড়া।

আমরা লক্ষ করছি মানুষ যেন আজ কীসের নেশায় মত্ত হয়ে দিগ্বিদিক ঘুরছে আর হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে নৃশংস সব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বময় মহামারি করোনায় যেখানে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে আর সবাই যেখানে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে সেখানে যত ধরনের খারাপ কাজ আছে তা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মানুষ নামে কলঙ্ক নরপশুরা যেন নৃশংস সব কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়েছে। আজ দড়িবেঁধে নারীর নির্যাতনের খবর পেলে আগামীকাল পাচ্ছি নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের খবর, পরের দিন নারীকে চার টুকরো করে নৃশংসভাবে হত্যার খবর। এককথায় বলা যায় আজ আমরা চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছি।

যুবকরা যেখানে আদর্শ নাগরিক হিসেবে সুন্দর পৃথিবী গড়ার লক্ষ্য নিয়ে পড়ালেখা শেষ করে দেশের উন্নয়নে কাজ করার কথা সেখানে তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অন্যায় কাজে। আজকের তরুণ সমাজ আগামীর দেশ ও জাতির কাণ্ডারী। একটি দেশ ও জাতির জন্য যৌবন হচ্ছে একটি আদর্শ স্বপ্ন। যে জাতির যুবসমাজ যত দক্ষ এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারী সে জাতি তত বেশি দ্রুত উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু আজ আমরা কী দেখছি? বর্তমান সময়ে অধিকাংশ যুবসমাজ মাদক-আক্রান্ত হয়ে ধ্বংসের অবলীলায় নিপতিত হতে দেখা যায়। বিভিন্ন ধরনের মাদকের সয়লাব যুবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়াতে তারা কোনো না কোনো উপায়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। মাদক বর্তমানে এত ব্যাপক আকার ধারণ করছে, যার ভয়ানক প্রভাব ও বিস্তার লক্ষ করা যায় আমাদের মানুষ গড়ার আঙিনা-শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও। এটি বর্তমান সময়ে যুবসমাজের জন্য একটি ভয়ানক পরিণতি ও অশনিসংকেত।

সম্প্রতি যুবসমাজের কর্মকাণ্ডের প্রতি তাকালে জাতিকে অবাক হতে হয়। কারণ দেশ ও জাতির কর্ণধার সেই যুবসমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। তাদের অনেকেরই নৈতিক কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নেই। এই যুবকদের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত, কেউ অসামাজিক, কেউ চাঁদাবাজি, কেউ অস্ত্রবাজি, কেউ চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, প্রভৃতি অন্যায় অপকর্মে লিপ্ত। দেশে একের পর এক নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, এর বেশিরভাগ অপরাধ যুবকদের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে। এছাড়া মাদরাসায় যে শিশুরা বলাৎকারের শিকার হচ্ছে তারও বেশিরভাগ যুবকদের দ্বারাই হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব কেন ঘটছে? এর জন্য দায়ী কে? আমরাই বা এর জন্য কী করতে পারি? একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, মানবশিশু বেড়ে ওঠে সামাজিকীকরণের মাধ্যমে। এর প্রথম ধাপ হচ্ছে পরিবার। পরিবার, খেলার সাথী, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম ইত্যাদির প্রভাব শিশুদের ওপর পর্যায়ক্রমে পড়তে থাকে। পরিবার হচ্ছে সন্তানের সুশিক্ষার প্রধান স্থান। আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি আমাদের সন্তানরা কেন এতটা জঘন্য হয়েছে যে পিতার পরিচয় দিতে ঘৃণা হয়। আজ যে সন্তানের জন্য নিজের পরিচয় দিতে ঘৃণাবোধ করি তা কিন্তু একদিনে হয়নি। সন্তান জন্ম দিলেই যে ভালো হবে তা কিন্তু নয়। সন্তানকে উত্তম আদর্শ দিয়ে গড়ে তুলতে হয়। মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে গেলে পেরোতে হয় অনেক বাধা-বিপত্তি।

শেখ সাদীর ভাষায় বলতে হয় ‘মনুষ্যত্ব দয়া এবং বীরত্বের ওপর নির্ভর করে। শুধু মানবরূপ গঠনকে কখনো মানুষ বলে ধরে নেয়া উচিত নয়। মানুষ বলে পরিচিত হতে হলে জ্ঞানের দরকার। শুধু আকৃতি দিয়ে মানুষ হতে পারে না।’

সন্তান জন্মের পর থেকেই তাকে উত্তম নৈতিক আদর্শ দিয়ে বড় করতে হবে। আমাদের সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে মেশে, বাইরে কী করছে তা কি কখনও খোঁজ করেছি? ছোট ছোট অন্যায়কে আমরা দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়েছি। সন্তানের অন্যায়কে আমরা দিনের পর দিন মেনে নিয়েছি আর যখন সে বড় ধরনের অন্যায় করে বসেছে তখনও তাকে বাঁচানোর শত চেষ্টা করছি। এই যদি হয় আমার অবস্থা তাহলে আমার সন্তান ধর্ষণ বলুন আর অন্যান্য মন্দকাজ কেন করবে না। সে তো এসব অন্যায়কে অন্যায় মনে করছে না, কেননা সে জানে যে এসব কাজে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। আমি যাই করি না কেন আমার পরিবার আমার পক্ষেই থাকবে। আমাকে উদ্ধার করে আমাকে আদর যত্নই করবে।

আসলে বর্তমান সময়ে যুবসমাজের সার্বিক অবক্ষয়ের বড় কারণ হলো সন্তানদের প্রতি পরিবারের দায়িত্বশীলদের যথাযথ তদারকির অভাব। সমাজের অনেক পিতা-মাতা, নিজ সন্তানের চলাফেরা ও গতিবিধির প্রতি লক্ষই রাখেন না। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন ভাবতেই পারতাম না যে সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে থাকা যায়। সমাজের যে ছেলেটি কিছুটা বখাটে তার সাথে কথা বলতেও ভয় পেতাম এই ভেবে যে না জানি পরিবারের কেউ দেখে ফেলে যে আমি তার সাথে সময় কাটিয়েছি।

যুবকদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় এবং সমাজকে অবক্ষয়মুক্ত করতে হলে প্রতিটি পরিবারকে এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। অপরাধ দমনে যতই আইন করা হোক না কেন প্রতিটি পরিবার যদি সোচ্চার না হয় সেক্ষেত্রে অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। যুবকদের প্রেমময় রূপের কারণে দরিদ্র, অসহায়, প্রবঞ্চিত ও নিগৃহীত জনতা লাভ করে নতুন জীবন-প্রদীপ্ত হয় অভিনব উদ্দীপনায়। যুবকদের এই সুন্দর জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের উত্তম আদর্শে গড়ে তুলি তাহলে একজন যুবক হতে পারে দেশ, জাতি ও সমাজের আদর্শ। পথহারা যুবকদের সংশোধনের জন্য হতে পারে আলোকবর্তিকা।

সম্প্রতি সত্য ও সুন্দরের পথ ত্যাগ করে যুবসমাজ উগ্র ও বিকৃত জীবনযাপনে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে এবং চরম অবক্ষয়ের মধ্যে জীবন খুঁজে বেড়াচ্ছে। বলাবাহুল্য, ডাকাতি, খুন, ছিনতাইসহ দেশে প্রতিনিয়ত যেসব অপরাধ ঘটে চলছে সেসবের একটি বড় অংশের পেছনেই রয়েছে মাদক।

বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, মাদকসেবনকারীদের প্রায় ৮৫ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ২৯ বছর। তাদের একটি বিশাল অংশই মাদকদ্রব্য কেনার জন্য টাকা জোগাড় করতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সুনাগরিক তৈরির পথেও এই মাদক বাধার সৃষ্টি করছে। মাদকাসক্তদের বাঁচাতে পরিবারের হস্তক্ষেপ বিশেষভাবে প্রয়োজন।

পরিশেষে এটাই বলব- হে যুবক! উচ্ছৃঙ্খল জীবন পরিহার করে সমাজ ও দেশের উন্নয়নের অংশীদার হও। ভবিষ্যতের জন্য তুমি কী রেখে যাচ্ছ সেই চিন্তা করো। সুন্দর এ জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না। তুমি কি কখনও ভেবে দেখেছো, তোমার অপরাধের কারণে তোমার পিতা-মাতাসহ পুরো পরিবারে কতটা কষ্ট এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হবে? তোমার অপরাধে শুধু তুমি নিজেই শেষ হচ্ছো না বরং পুরো পরিবারকে তুমি শেষ করে দিচ্ছ।

যৌবন একটি আদর্শ স্বপ্ন, এই স্বপ্নকে হেলায় নষ্ট করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই আসুন, শুধু আইনের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি পরিবার সোচ্চার হই। শৈশব থেকেই সন্তানের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেই এবং তাদের সোনালী ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি। নতুন এই আইনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হোক এবং প্রতিটি পরিবার হবে আরও সোচ্চার এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এইচআর/বিএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]