উদীয়মান অর্থনীতির রোল মডেল এখন বাংলাদেশ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ২৪ অক্টোবর ২০২০

মর্তুজা হাসান সৈকত

জিডিপির অগ্রগতিতে পাকিস্তানের পর এবার ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দেশ ভারতকেও পেছনে ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল মনিটরিং ফান্ড (আইএমএফ)। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৮৮ ডলারে উন্নীত হতে পারে, এই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়াবে ১৮৭৭ ডলার। তারা আরও বলছে, এ বছর সবচেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বিশ্বের শীর্ষ তিন দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে শুধু গায়ানা ও দক্ষিণ সুদান।

যে ভবিষ্যদ্বাণী আইএমএফ করেছে, সেটা যে ভারতের জন্য সুখকর হবে না, তা অনুমেয় ছিল। হয়েছেও তাই। কারণ, মোট জিডিপির দিক থেকে বর্তমানে ভারত বিশ্বের প্রথম ৫টি দেশের একটি। মাত্র এক যুগ আগেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের অর্ধেক ছিল, এমন একটি দেশকে এত অল্প সময়ের ভেতরে পেছনে ফেলে দেওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। তাই বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বিষয়টি অনেক বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষান রেড্ডির মতো যে সমস্ত রাজনীতিকরা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা সম্পর্কে কিছুদিন আগেও বাজে মন্তব্য করেছিলেন, কটুকথা বলেছিলেন; তাদের মুখে চপেটাঘাত হয়ে এসেছে এ প্রতিবেদন।

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সাংবাদিক শেখর গুপ্ত বলেছেন, ভারতের উচিত বাংলাদেশসহ সব প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে সম্মানের সঙ্গে কথা বলা। উদ্ভূত পরিস্থিতে বিজেপির মুখপাত্র অর্থনীতিবিদ সঞ্জু ভার্মা বলেছেন, বর্তমান মূল্যে ভারতের জিডিপি ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর বাংলাদেশের জিডিপি ৩৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাই ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা বাতুলতামাত্র। কিন্তু তার এই বক্তব্য সব মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। কারণ, বাংলাদেশের চাইতে ভারতের জনসংখ্যা সাড়ে ৮ গুণ বেশি, এটাও মাথায় রাখতে হবে।

তাই, ভারতের মতো একটা বিশাল অর্থনীতির দেশকে অর্থনৈতিক সূচকে টপকে যাওয়া বাংলাদেশের একটি বড় অর্জন হিসেবেই গণ্য হচ্ছে দেশ বিদেশে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু বাংলাদেশের এ উত্থানের প্রশংসা করে বলেছেন- ‘এমার্জিং ইকোনমির যে কোনো দেশের এগিয়ে যাওয়া ভালো সংবাদ। বাংলাদেশ ২০২১ সালে মাথা পিছু জিডিপিতে এগিয়ে যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ৫ বছর আগে জিডিপিতে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ২৫ শতাংশ এগিয়ে ছিল’।

গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি তথ্য হচ্ছে, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে এমন সংবাদ সম্প্রতি জানা গেলেও, হাঙ্গার ইনডেক্স, নারীর ক্ষমতায়ন, টিকাদান, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যু রোধ ইত্যাদি সূচকে কিন্তু অনেক আগেই পেছনে ফেলেছিল। ভারত কেবলমাত্র মাথাপিছু জিডিপি এবং মানব উন্নয়ন সূচক- এ দুইটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল এতোদিন।

গত ১৭ অক্টোবর দ্যা ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষি খাতকে পেছনে ফেলে দেশটি এখন অনেক বেশি শিল্প ও সেবা খাতনির্ভর। এই খাতেই তারা এখন লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করছে যার ফলে দেশটি তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ভারত শিল্প খাতকে চাঙা করতে হিমশিম খাচ্ছে আর মানুষ এখনো অনেক বেশি কৃষি খাতনির্ভর। এর বাইরে আরও কিছু সামাজিক সূচকও বাংলাদেশকে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

মূলত, গত এক যুগে শেখ হাসিনার শাসনামল বাংলাদেশের এ বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থানে মূল ভূমিকা পালন করছে। এই সময়কালে দেশের অর্থনীতি তরতর করে এগিয়ে গেছে, তিনগুণেরও বেশি বড় হয়েছে জিডিপি। নির্মাণ হচ্ছে বড় বড় অবকাঠামো। অন্যদিকে, গত তিন-চার বছর ধরেই ভারতের অর্থনীতি ধুঁকছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে এসেছে, আর বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে প্রত্যাশার চাইতেও অধিক গতিতে। তদুপরি, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় চীনা বিনিয়োগকারীদের অনেকেই ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এটাও ভারতকে পিছিয়ে দিয়েছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মহামারি করোনার প্রকোপ। এসব ব্যাপার ভূমিকা রেখেছে ভারতের অবনমন আর বাংলাদেশের ঊর্ধ্বগমনে।

তাছাড়া, মহামারি করোনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনঃরুদ্ধার অন্যান্য যে কোন দেশের তুলনায় অনেক দ্রুত ঘটছে। অবশ্য এই বিষয়ে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদরাও কিছুদিন আগে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। অর্থনীতিকে এমন সচল ও চাঙ্গা রাখার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ভূমিকা পালন করেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে বড় মাপের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দ্বার উন্মুক্ত করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে তিনি বাজিমাত করেছেন। এর ফলে মহামারিকালেও বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত হয়েছে।

সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন নতুন রেকর্ড অর্জন করেছে বাংলাদেশ। রিজার্ভ ছাড়িয়েছে ৪০ বিলিয়ন ডলার। ম্যানিলা ভিত্তিক দাতা সংস্থা এডিবি জানিয়েছে, শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের সাফল্যে ভর করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। একই সঙ্গে কাটছে করোনা মহামারি সঙ্কট। ফলে আশা করা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৬.৮ শতাংশ। যদিও সরকার জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে ৮.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এমন সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে ভারতের সংবাদপত্র দ্যা ইকোনমিক টাইমস বলেছে, করোনাকালে ভারতের সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ যখন ধীরে এগোচ্ছিল, সেই সময়ে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, সিঙ্গাপুরের অগ্রযাত্রার সাথে তার তুলনা চলে। এইচএসবিসি’র সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চে বলা হয়েছে, বর্তমানে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরের মতো দেশ যেখানে বাংলাদেশের পেছনে থাকবে।

সিঙ্গাপুর স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল আগে সে দেশের নেতা লি কুয়ান ইউ মালয়েশীয় পার্লামেন্টে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা ছোট দেশ হতে পারি, সম্পদহীন হতে পারি, কিন্তু আমরা একদিন সিলোনের (শ্রীলঙ্কার পূর্ব নাম) মতো সমৃদ্ধিশালী দ্বীপরাষ্ট্র হব’। সেই সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থান সবার জানা। শ্রীলঙ্কার চাইতে প্রায় চার গুণ বড় তাদের অর্থনীতি। বাংলাদেশও শেখ হাসিনার গত এক যুগের শাসনামলে এগিয়ে গেছে দুর্বার গতিতে। বেশকিছু সামাজিক সূচকের পাশাপাশি অর্থনীতির সূচকেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। এমডিজি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, এসডিজি বাস্তবায়নের পথে। মাত্র এক যুগ আগেও যে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় দ্বিগুণ ছিল, তারাও পেছনে পড়ে যাচ্ছে। এক সময়ের কথিত 'তলাবিহীন ঝুড়ি' আজ বিশ্ব দরবারে উদীয়মান অর্থনীতির রোল মডেল যার নেতৃত্বে, কৃতিত্ব তো তাঁকে দিতে হবেই।

লেখক : কবি, কলামিস্ট।
[email protected]

এইচআর/এমএস

বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, সিঙ্গাপুরের অগ্রযাত্রার সাথে তার তুলনা চলে। এইচএসবিসি’র সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চে বলা হয়েছে, বর্তমানে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরের মতো দেশ যেখানে বাংলাদেশের পেছনে থাকবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]