মেয়েসহ তিন সন্তানকে যুদ্ধে পাঠান মা হাকিমুন্নেছা

মার্জিয়া লিপি
মার্জিয়া লিপি মার্জিয়া লিপি , লেখক, গবেষক
প্রকাশিত: ১০:১১ এএম, ০৮ মার্চ ২০২১

মা হাকিমুন্নেছা বেগম; ডাক নাম মুক্তা। বড় ছেলে মায়ের কাছে মুক্তার চেয়েও দামি। তাই মা হাকিমুন্নেছা নিজের ডাকনাম ‘মুক্তার’ সঙ্গে মিল রেখে তাকে ডাকতে শুরু করেন ‘মুক্তো’ বলে, আসল নাম রাখেন আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার। হাকিমুন্নেছা বেগম মুক্তিযোদ্ধা মেজর এটিএম হায়দার বীর উত্তম, ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম বীর প্রতীক এবং এটিএম সাফদারের গর্বিত জননী।

মা হাকিমুন্নেছা খুব সাধারণ একজন গৃহিণী ছিলেন। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই ছিল না তাঁর। এমনকি গ্রামের মক্তবেও আরবি শিখতে তাঁর যাওয়া হয়নি। মায়ের কাছেই তিনি কোরআন শরিফের পাঠ নেন। এটিএম হায়দার তাঁর ৩৩ বছরের জীবনকালে খুব বেশি মায়ের সান্নিধ্য পাননি। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পরই পাকিস্তানে চলে যান—সেখান থেকেই তাঁর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীতে সামরিক বিদ্যা শেখেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে সন্তান ক্যাপ্টেন হায়দারের যুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না। তবে হায়দার জুলাই মাসে তাঁদের ভারতে চলে যেতে বার্তা পাঠান, তখন থেকে দেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত ভারতেই অবস্থান করেছিলেন।

মা হাকিমুন্নেছার তিন সন্তান—মেজর এটিএম হায়দার বীর উত্তম, ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা বেগম বীর প্রতীক এবং এটিএম সাফদার যখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তখন তিনি মুক্তিযুদ্ধ থেকে আর নিজেকে আলাদা রাখতে পারেননি। যুদ্ধকালীন সব সময়ই তিনি সংসারে যা প্রয়োজন হতো তা থেকে বেশি রান্না করতেন। মা হাকিমুন্নেছা খুবই মানবিক ছিলেন। গোপনে অনেককে সাহায্য করতেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে তাঁর এই গুণটি দেখতে পাওয়া যায়। সেই শৈশব থেকে তাঁর সন্তানদের তিনি বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে শিখিয়েছিলেন। বাড়িতে যারা প্রতিদিন কাজে সহযোগিতা করতেন তাদের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় সন্তানরা সালাম করে যেতেন। তাঁদের প্রতি মাসের খরচ থেকে বাঁচিয়ে গরিবদের দান করার উপদেশ দিতেন। যুদ্ধকালীন তাঁর ছেলে ২ নং সেক্টর কমান্ডার ও গেরিলা যোদ্ধাদের পরীক্ষক কমান্ডো এটিএম হায়দারকে বলতেন, ‘তোর ছেলেরা যখন জীবন দিতে শিখেছে দেশের জন্য তখন দেশ স্বাধীন হবেই।’

হাকিমুন্নেছা ছেলেমেয়েদের কখনই দেশের কাজে বাধা দিতেন না, বিশেষ করে মেয়ে ক্যাপ্টেন সিতারাকেও উৎসাহিত করতেন তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য। তবে তাঁর বড় সন্তান মেজর এটিএম হায়দার যখন শহীদ হন তখন থেকে তিনি খুব নির্লিপ্ত হয়ে যান। মা শুধু তখন বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে ছিলেন। ২০০৬ সালে ১৭ মে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সংসারের কাজকর্মের পর সারাদিন জায়নামাজে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতেন। দোয়া করতেন, ‘আল্লাহ যেন তাঁর সন্তান হত্যার বিচার করেন। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থানার জগদল গ্রামে তাঁর বাড়ি ছিল। বাবা হুরমত আলী ছিলেন স্কুলশিক্ষক। হাকিমুন্নেছা বেগম তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তাঁর বাল্যকাল কেটেছে নানার বাড়িতে, হোসেনপুর থানার গড় বিষ্ণুদিয়া গ্রামে। ১৯২৯ সালে বিয়ে হয় তৎকালীন কিশোরগঞ্জ মহুকুমা থেকে সাত মাইল দূরে অবস্থিত কান্দাইল গ্রামের মোহাম্মদ ইসরাইলের সঙ্গে। মোহাম্মদ ইসরাইল পুলিশ বিভাগের এএসআই ছিলেন। মোহাম্মদ ইসরাইল-হাকিমুন্নেছা দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। ১৯৪২ সালের ১২ জানয়ারি, কলকাতা শহরের ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার (এটিএম হায়দার)।

একাত্তরের মার্চের পর ছেলে ক্যাপ্টেন হায়দার মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর থেকেই মোহাম্মদ ইসরাইল পরিবার বিশেষ করে মেয়ে পাকিস্তান মেডিকেল আর্মির কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন সিতারার নিরাপত্তার কথা ভেবে উৎকণ্ঠায় ভুগছিলেন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সপরিবারে ভারতেই চলে যাবেন। একাত্তরের জুলাই মাসের শেষ দিকে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা জামাল, বকুল ও সুশীল ক্যাপ্টেন হায়দারের চিঠি নিয়ে হাজির হলেন। তিনি খবর পাঠিয়েছেন, “পাকিস্তানিরা খুঁজে খুঁজে বাঙালি আর্মির লোকদের মারছে। ওরা তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও মারছে।

আপনাদের দেশে থাকা আর নিরাপদ নয়। আমি যে তিনজনকে পাঠালাম, আপনারা তাঁদের সঙ্গে চলে আসুন।” বাবা মোহাম্মদ ইসরাইলও যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তল্পিতল্পা বাধা হলো। যাত্রী সাতজন—গন্তব্য নৌকায় করে গোজাদিয়া ঘাট থেকে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেলাঘরে মা-বাবা পৌঁছানোর পরও হায়দার তাঁদের দেখতে যেতেন না দেখে বাবা মোহাম্মদ ইসরাইল একদিন রেগেমেগে বলেন, “দেখেছ, কীরকম বেয়াদপ ছেলে! আমি এখানে আছি, সে আমার খবরও নেয় না!” মা হাকিমুন্নেছা বেগম ক্যাপ্টেন হায়দারের বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “ওর কি আর অবসর আছে? দিনরাত ছোটাছুটি করে বেড়ায়। দেশ স্বাধীন করা তো সহজ কাজ নয়।” সেপ্টেম্বর মাসের শেষের কোনো একদিন মেজর হায়দার গাড়িতে করে মেলাঘরের তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান, সঙ্গে ছিল মুক্তিযোদ্ধা জালাল।

jagonews24

সাক্ষাতে মা বললেন, “হায়দার, তোর প্রশিক্ষণ দেওয়া ছেলেরা ঢাকায় বীরের মতো যুদ্ধ করছে। মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করছে। ওরা ধরা পড়ছে, পাকিস্তানিরা ওদের মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারছে না। ওরা জীবন দিচ্ছে তবু মুখ খুলছে না। হায়দার, তোর এই ছেলেরা আমাদের দেশকে স্বাধীন করবেই।” মায়ের কথা শুনে মেজর হায়দারের চোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ে। হয়তো ঢাকায় ধরা পড়া নিখোঁজ রুমি, বদি, চুল্লুদের কথা মনে করেন।

ক্যাপ্টেন হায়দার প্রথমে ২ নং সেক্টরের সহ-অধিনায়ক ও পরে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একজন গেরিলা কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। তাঁর বোন ডা. সিতারা বেগম, বীর প্রতীক।

এটিএম হায়দার স্কুলজীবন শুরু করেন পাবনার বীণাপাণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে কিশোরগঞ্জ রামানন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবন থেকেই হায়দার একজন ভালো খেলোয়াড়, সাঁতারু ও স্কাউট ছিলেন। তিনি সৎ, দরদি, কঠোর পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক আদর্শ মানুষ। ১৯৫৮ সালে একজন স্কাউট হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর জানুয়ারিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে হায়দার কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (আইএ) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে চলে যান। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর প্রথম পর্বে পড়াকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কমিশনের জন্য মনোনীত হন।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। হায়দার পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে ট্রেনিং করেন এবং কমিশন প্রাপ্তির পর গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার হিসেবে নিয়োজিত থাকেন। পরে তিনি চেরাটে এসএসজি (ঝঢ়বপরধষ ঝবৎারপব এৎড়ঁঢ়) ট্রেনিংয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য, চেরাটের এই ট্রেনিংটি ছিল মলূত গেরিলা ট্রেনিং। এখানে ৩৬০ জন অফিসারের মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র দুজন। ট্রেনিং শেষ করার পর মুলতান ক্যান্টনমেন্টে তার পোস্টিং হয় এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে এটিএম হায়দারকে বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং ১৫-২০ দিন পর তাঁকে আবার কুমিল্লায় ‘কুমিল্লা’ সেনানিবাসে নিয়োগ দেয়া হয়।

jagonews24

১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে পুনরায় নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তন) সেনাবাহিনীর ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়নের কর্মকর্তা হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শুরু থেকেই ২নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেলাঘরে অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সব মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা ট্রেনিংসহ হায়দার মুক্তিযোদ্ধাদের শপথগ্রহণ করাতেন। মেলাঘরে হায়দার প্রথম একটা স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন। এই কোম্পানিকে তিনিই ট্রেনিং প্রদান করতেন।

কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওপর তারের ঘাটপুল ও মসুল্লিরেলপুল, ঢাকা-চট্টগ্রামের রাস্তায় ফেনীতে অবস্থিত বড়পুল ধ্বংসসহ একাধিক অপারেশনের নেতৃত্ব দেন মেজর হায়দার। অক্টোবরের ৭ তারিখ খালেদ মোশাররফ নিয়মিত ব্রিগেডকে ফোসের্র কমান্ড গ্রহণ করলে তিনি সেক্টর অধিনায়কত; লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে এবং খুব দ্রুত গেরিলাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ঐদিন প্রথম ঢাকা বেতারে ও টিভি থেকে মেজর হায়দার ঘোষণা পাঠ করেন—“মুক্তিবাহিনীর প্রতি নির্দেশ শীর্ষক শিরোনাম”। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে তাঁকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করে ।

এটিএম হায়দারের ছোট বোন ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম ও একমাত্র ছোট ভাই এটিএম সাফদার (জিতু) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এটিএম সাফদার ভারতের মেলাঘরে অবস্থিত ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নেন এবং শালদানদী এলাকায় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের আগরতলাস্থ ৯২ বিএসএফ ক্যাম্পের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধবিষয়ক যোগাযোগ ও খবরাখবর (অফিসিয়াল) আদান-প্রদান করতেন।

ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বিশ্রামগঞ্জে বাংলাদেশ হাসপাতালে কাজ করতেন। পাঁচশ বেডের এই হাসপাতালে কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। হাসপাতালটি সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ছিল। স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশে সেনাবাহিনীতে মেজর হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাসে ১৩ ইস্ট বেঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ৮ম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে পিতার জরুরি টেলিগ্রাম পেয়ে জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়তা করার জন্য ঢাকায় আসেন, যদিও পিতা মো. ইসমাইল টেলিগ্রামে জমির কথা উল্লেখ করেননি। মেজর হায়দার ঢাকা এসে যুদ্ধকালীন সহযোদ্ধা আরেক কিংবদন্তি বীরসেনা জেনারেল খালেদ মোশাররফের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।

jagonews24

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আবু তাহেরের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন সেক্টর কমান্ডার ও জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল খন্দকার নাজমলু হুদার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বহু কমান্ডো আক্রমণের নেতৃত্ব দানকারী মেজর হায়দার, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সের ময়দানে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ মুহূর্তে অপূর্ব ভঙ্গিতে স্টেনগান কাঁধে মেজর হায়দার ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের মঞ্চে নিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

১৯৭৮ সালে মেজর হায়দারের বড় বোন আখতার বেগমের বাসায় মেজর হায়দারের স্মরণে মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানী সাহেব সকলকে উদ্দেশ করে বলেন, “আমি একটা কথা স্বীকার করতে চাই যে, ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে আমিই হায়দারকে বলেছিলাম খালেদ মোশাররফ ও জিয়ার (রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) দ্বন্দ্ব মিটমাট করতে সাহায্য করতে। কারণ, হায়দারকে দুজনই খুব পছন্দ করত। আমার কথায়ই হয়তো হায়দার বঙ্গভবনে গিয়েছিল খালেদ মোশাররফের সঙ্গে আলাপ করতে।” (পৃষ্ঠা ২১৪, মুক্তিযুদ্ধে মেজর হায়দার ও তাঁর বিয়োগান্ত বিদায়) উল্লেখ্য এমএজি ওসমানী মেজর হায়দারকে মাই ডিয়ার সান সম্বোধন করতেন। ১১ নভেম্বর ১৯৭৫ রোজ মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের খড়মপট্টি এলাকায় সমাহিত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তি বীর সেনানীকে।

ডা. ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীরপ্রতীক
ডা. ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি পাকিস্তান আর্মির মেডিকেল কোরের একজন চিকিৎসক ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় ছুটিতে বাড়ি ছিলেন। ছুটির পর কাজে যোগ না দেওয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে ধরিয়ে দিতে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। সিতারা বেগম ১৯৪৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মোহাম্মদ ইসরাইল এবং মা হাকিমুন্নেছা। বৈবাহিক সূত্রে তিনি সিতারা রহমান নামে পরিচিত। বড় ভাই এটিএম হায়দারও সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।

স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন সিতারা। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর বাবা মো. ইসরাইল মিয়া পেশায় ছিলেন আইনজীবী। কিশোরগঞ্জে সিতারা বেগম শৈশব কাটান। সেখান থেকে মেট্রিক পাস করার পর হলিক্রস কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ডাক্তারি পাস করার পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেনা মেডিকেলে লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। সেই সময় তাঁর বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা মেজর এটিএম হায়দার পাকিস্তান থেকে কুমিল্লায় বদলি হয়ে আসেন। তিনি কুমিল্লার তৃতীয় কমান্ডো যোগ দেন। ১৯৭০ সালের উত্তাল দিনগুলোতে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

jagonews24

ব্যাটালিয়নে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিতারা ও ভাই হায়দার ঈদের ছুটি উদযাপনের জন্য তাঁদের কিশোরগঞ্জের বাড়িতে যান কিন্তু সেই সময় দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। হায়দার তাঁর বোনকে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে তিনি তার বোন সিতারা, বাবা-মা ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চলে যেতে বলেন। কিশোরগঞ্জ থেকে মেঘালয়ে পৌঁছাতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগে যায়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বা অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সেক্টরে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। এ রকম একটি হাসপাতাল ছিল ২ নম্বর সেক্টরে। নাম বাংলাদেশ হাসপাতাল। এখানে ডা. জাফরউল্লাহ, ডা. মোবিন, ডা. ক্যাপ্টেন আখতার, ডা. সিতারা বেগমসহ আরও অনেক চিকিৎসক, মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রী ও সেবিকা নিয়োজিত ছিলেন। এটি প্রথম স্থাপিত হয় সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের সোনামুড়ায়। পরে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তা সীমান্ত এলাকা থেকে স্থানান্তর করা হয় আগরতলার সন্নিকটে বিশ্রামগঞ্জে। সেখানে হাসপাতালটির ঘরের কাঠামো ছিল বাঁশ দিয়ে তৈরি। চারদিকে বাঁশের বেড়া, মাটির ভিত এবং বাঁশের চারটি খুঁটির ওপর মাচা বেঁধে বিছানা। একেকটি ঘরে ৪০-৫০টি বিছানা। অপারেশন রুম প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা। ওপর-নিচ চারদিকে প্লাস্টিক। ভেন্টিলেশনের জন্য কয়েক স্থানে ছোট ছোট ফোকর। বেশিরভাগ সময় দিনের বেলাতেই এখানে অপারেশন হতো। রাতে জরুরি হলে হারিকেন বা টর্চলাইট জ্বালিয়ে অপারেশন হতো। শেষদিকে অবশ্য জেনারেটর ছিল।

ডা. সিতারা বেগম জুলাই মাসের শেষে বাংলাদেশ হাসপাতালে যোগ দেন। পরে হাসপাতালের সিও (কমান্ডিং অফিসার) হিসেবে কাজ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখসমরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিদিনই এই হাসপাতালে পাঠানো হতো। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা সেদিনগুলোতে যে অবদান রেখেছেন তা অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ হাসপাতালে মেধা, শ্রম ও দক্ষতা দিয়ে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য স্বাধীনতা-উত্তরকালে ডা. সিতারা বেগমকে বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হয়েছে। ডা. সিতারা বেগমের স্বামী ডা. আবিদুর রহমান। তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। ডা. সিতারা বেগম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়লাভ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও একটা আনন্দ ছিল। পরবর্তী সময়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্তি, রেষারেষি, হিংসা আমাদের একেকজনকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধসহ জাতীয় চার নেতা, আমার বড় ভাই বীর উত্তম এটিএম হায়দারসহ আরও অনেককে। এজন্য দেশের প্রতি আমার অভিমান ছিল। দেশের পতাকা দেখলে আমার কান্না আসে।”

হায়দার বীর উত্তম, ক্যাপ্টেন সিতারা বীর প্রতীক ও মুক্তিযোদ্ধা এটিএম সাফদার জিতু
মুক্তিযোদ্ধা : ২নং সেক্টর

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ সাক্ষাৎকার গ্রহণের স্থান : ইসরাইল ভবন, শোলাকিয়া, কিশোরগঞ্জ।

কৃতজ্ঞতা : সাইফুল হক মোল্লা, ক্যাপ্টেন সিতারা ও এটিএম সাফদার জিতু

১. তথ্যসূত্র:

মার্জিয়া লিপি, ২০১৯, ‘ একাত্তর মুক্তিযোদ্ধার মা’ ; অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ৪৬/১ হেমেন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০।

এইচআর/ফারুক/জেআইএম

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আবু তাহেরের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন সেক্টর কমান্ডার ও জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল খন্দকার নাজমলু হুদার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বহু কমান্ডো আক্রমণের নেতৃত্ব দানকারী মেজর হায়দার, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সের ময়দানে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ মুহূর্তে অপূর্ব ভঙ্গিতে স্টেনগান কাঁধে মেজর হায়দার ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের মঞ্চে নিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]