ক্ষমাপ্রার্থনা পূর্বক

তুষার আবদুল্লাহ তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ এএম, ০২ মে ২০২১

গণমাধ্যমের আচরণে পাঠক, দর্শক অবয়বপত্রে যে সমালোচনার ঝড় তুলেন, তাদের এই সুযোগটিকে আমি ঈর্ষা করি। তাঁরা কতো সহজেই দৃশ্যমাধ্যম ও পত্রিকার পেশাদারিত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারছেন। তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যম তার অবস্থান বদল করে নিচ্ছে, এমন কি বাধ্য হচ্ছে ভোক্তার কাছে ক্ষমা চাইতে। আমরা যখন কিশোর বা তরুণ পাঠক তখন এই সুযোগ আমাদের ছিল না। থাকলে শহীদ কন্যা শারমীন রীমা হত্যার পর অভিযুক্ত মুনির-খুকুকে নিয়ে তখনকার দুটি সংবাদপত্র ফলোআপ রিপোর্টের নামে যে কিচ্ছা লিখে যাচ্ছিল, তার প্রতিবাদ করতে পারতাম। মুনির- খুকুর পরকীয়ার কাহিনী এমনভাবে লেখা হতো, যেন তাদের রোমান্সের সময় প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মুনির-খুকুই শুধু নয় আরো বেশ কিছু হত্যা, আত্মহত্যাকে পুঁজি করে গত শতকের ৮০-৯০ দশকের কিছু পত্রিকা ব্যবসা করেছে। তাদের প্রচার সংখ্যা বেড়েছে হু হু করে। বলতে পারেন এখনকার টেলিভিশন, পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের মতোই। এ কাজটি মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক শুধু নয় প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকাও করেছে। আজ দুই একটি পত্রিকার এমন ভূমিকা দেখে পাঠকদের পাশাপাশি দেখছি অনেক সাংবাদিক সহকর্মীর কপাল কুঁচকে গেছে। হয়তো তারা স্মৃতির সড়কে ফিরে যাননি। প্রচার বাড়াতে বা কিছু পয়সার লোভে কতিপয় সংবাদপত্র একাজটি বরাবরই করে আসছে। এক দুইটি পত্রিকার চরিত্রই অবশ্য ছিল কিচ্ছা তৈরি করা। সেই কিচ্ছা ১৮+ সীমার নিচের পরার উপযুক্ত ছিল না। কিন্তু সেলুনে বা দোকানে ঐ পত্রিকা সুলভ ছিল বলে আমাদের নজর এড়াতো না। তখন ঐ কিচ্ছাগুলো কারা লিখতেন, অবশ্যই একজন রিপোর্টার বা গণমাধ্যমকর্মী। তার প্রতি আমার রাগ ছিল। একবার শান্তিনগরে এক পত্রিকা অফিসে গিয়ে মৌখিক ও লিখিত প্রতিবাদ দিয়ে এসেছিলাম লাভ হয়নি। পরে যখন নিজে গণমাধ্যমে এলাম, তখন ঐ পত্রিকার মালিক, সম্পাদকের সামনে যাওয়ার সু্যোগ হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন- আমি ব্যবসা করতে আসছি। দাতব্য করতে আসিনি। সাংবাদিক পুষতে নাকি কাকের চেয়েও কম ভাত লাগে। এমন কথা শোনেও এই পেশা ছাড়িনি। এটাই অপরাধ।

সাংবাদিকতায় বয়স বেড়েছে। কিশোর থেকে মাঝ বয়সের দিকে যাচ্ছি। সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, দৈনিকে কাজ করেছি। টেলিভিশনেও দুই দশক কেটে গেল। এমন বেশ কিছু রিপোর্ট লিখতে বা দৃশ্য মাধ্যমের জন্য বানাতে বাধ্য হয়েছি, যা আমি মনে করতে চাই না। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বানিয়েছি। আমার সহকর্মীদেরও বানাতে হয়েছে। একাধিক রিপোর্টের কথা বলতে পারবো, বার্তা কক্ষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছে। রিপোর্টটি লিখতে হবে বলে আমরা কেউ কেউ ছুটি বা অসুস্থ হয়েও পার পাইনি। বাড়ি থেকে ডেকে এনে লেখানো হয়েছে। দৃশ্য মাধ্যমেও তাই। আমি নিজেও আদিষ্ট হয়ে রিপোর্ট তৈরি করিয়েছি আমার সহকর্মীদের দিয়ে। বা তারা সরাসরি আদিষ্ট হয়েছেন। রিপোর্ট তৈরি বা প্রচার হবার পর কোন কোন সহকর্মীর মানসিক অবসাদে ভোগার যন্ত্রণা আমি, আমরা জানি। আমাকে ধরে অঝোরে কেঁদেছেন কেউ কেউ। বার্তাকক্ষ থেকে ‘ওয়াক আউট’র ঘটনাও আছে। এই অভিজ্ঞতা আমার একার নয়। সকল সহকর্মীরই কম বেশি আছে। প্রতিষ্ঠানকেও তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনেক রিপোর্ট তৈরি করতে হয়, কায়দা করে টিকে থাকার জন্য। কায়দা করে বৃহত্তর স্বার্থে যে টিকে থাকার লড়াইয়ে আছি আমরা, এটাও আমাদের অপরাধ।

সাম্প্রতিক একটি আত্মহত্যা বা হত্যা ( তদন্তে প্রমাণিত হবে) কে ঘিরে টেলিভিশন ও পত্রিকায় প্রতিবেদন আসছে। দুই মাধ্যমেই অভিযুক্ত এবং ভিকটিমকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা হচ্ছে। আবার অভিযুক্তকে আড়ালের রাখারও প্রবণতা দেখা গেছে। এর কোন কাজটিই আমরা করতে পারি না। যে মেয়েটির প্রাণ গেল, তাকে নিয়ে গণমাধ্যম যৌন সুড়সুড়ি দেয়ার মতো রিপোর্ট করছে। একটি কারণ ব্যবসা, আরেকটি কারণ কোন পক্ষের আদিষ্ট হয়ে। যেভাবেই করা হোক না কেন সেটি নৈতিকতা বিরুদ্ধ। আবার অভিযুক্তের বিষয়ের নানা তথ্য ও ফুটেজ প্রচার হচ্ছে। এর মাধ্যমে গণমাধ্যম নিজেই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাচ্ছে। এই বিষয়টি সাধারণ পাঠক, দর্শকের পছন্দ হচ্ছে না। তারা প্রতিবাদ, গালি এমনকি সম্পাদকদের ছিঃ ছিঃ বলে ধিক্কার দিচ্ছেন। যাদেরকে ধিক্কার দেওয়া হচ্ছে তারা সেখানে চাকরিজীবী সম্পাদক। মালিকের স্বার্থ রক্ষা করেই তাদের চলতে হচ্ছে। ভাবার অবকাশ নেই, তারা শুধু ব্যক্তি স্বার্থে এমন আদেশ সয়ে যান। তাদেরকে প্রতিষ্ঠানটির শত শত কর্মীর রুজির কথা ভেবেও কতো কি যে সয়ে যেতে হয়।

এই সয়ে যাওয়াটাও অপরাধ আমাদের। পুঁজির একটা আন্তঃ সম্পর্ক আছে। পুঁজি নিজেদের স্বার্থেই একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। যদি না তাদের কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্কের ইতিহাস না থাকে। এই যে হাতে হাত রাখার বন্ধন, সেখানে গণমাধ্যমের সাধারণ কর্মী থেকে নীতি নির্ধারক কারোরই কিছু করার থাকে না। অবয়বপত্র আমাদের সুযোগ দিয়েছে প্রতিবাদ করার, নিজের অভিমত জানানোর। কিন্তু কারো বিচারের দায়িত্ব কেন নিয়ে নিচ্ছি আমরা। কোন পেশাকে ধিক্কার জানানোরও শালীনতাবোধ থাকা প্রয়োজন। অবয়বপত্রের নাগরিকেরা সকল ঘটনায় প্রতিক্রিয়া একই স্বরে জানাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন। এটা মত প্রকাশের সৌন্দর্যকেও নষ্ট করছে।

তারপরও আপনারা আমাদের যেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান না কেন, আমরাই কিন্তু আপনার পাশে আছি। অন্য যে কোন পেশার মানুষের চেয়ে নিকটবর্তী। ধিক্কার দিন, তবুও বলবো সঙ্গে রাখুন। প্রত্যাশাটিও যদি অপরাধ হয়, তবে আমরা সত্যিই অপরাধী।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]