বৃদ্ধাশ্রমে নয় হৃদয়ে থাকুক মা

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৫৭ এএম, ০৯ মে ২০২১

রোদেলা হানিফ সুমি

মা’ – ছোট্ট একটা শব্দ, কিন্তু কি বিশাল তার পরিধি! সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এই শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার৷ মার অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়৷ তিনি আমাদের গর্ভধারিণী, জননী৷ জন্মদাত্রী হিসেবে আমার, আপনার, সকলের জীবনে মায়ের স্থান সবার ওপরে৷ তাই তাঁকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের হয়ত কোনো প্রয়োজন নেই৷ তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিকে ‘মা দিবস' হিসেবে পালন করা হচ্ছে।

বর্তমানে প্রচলিত মা দিবসের সূচনা হয় ১৯০৮ সালে। শতাব্দীর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক স্কুলশিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করার কথা ভাবলেন। তার সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগেই ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশে কাজ শুরু করেন। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে ১৯০৮ সালে তার মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করেন। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়।

মা মানেই নিশ্চয়তা, মা মানেই নিরাপত্তা, মা মানেই অস্তিত্ব, মা মানেই আশ্রয়, মা মানেই অন্ধকারে একবুক ভালোবাসা, স্নেহের অফুরান ভাণ্ডার। মা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়, আপনজন। আসলে কোনো উপমাই মায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কোনো কিছুর তুলনা হতে পারে না মা। মা তো মা-ই। সেই মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানোর একটি বিশেষ দিন আজ এই দিনে বিশ্বের মানুষ বিনম্র চিত্তে মাকে স্মরণ করে।

মা’ শব্দটি উচ্চারণ করলে কেন যেন গা শিহরিত হয়। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার কারণেই হয়তো এটা হয়ে থাকে। পৃথিবীতে মায়ের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। এ শব্দটির মাঝে লুকিয়ে থাকে অসীম ভালোবাসা আর প্রশান্তি। প্রতিটি মানুষের কাছে তার মা তুলনাহীনা ও অনন্যা। মাকে ভালোবাসা আর তার প্রতি হৃদয় নিঙড়ানো শ্রদ্ধার বিষয়টি পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’

অন্যান্য ধর্মেও মাতৃভক্তি আর তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞান সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। মাকে নিয়ে কবি-গীতিকারসহ বিশিষ্টজনেরা অজস্র ছত্র রচনা করেছেন। নেপোলিয়ান বলেছেন ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ নেপোলিয়ানের এ উক্তি থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় শিক্ষিত জাতি গঠনে মায়ের একটা বড় ভূমিকা আছে।

মা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘আমি যা হয়েছি বা যা হতে চাই, তার সবটুকুর জন্যই আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী। আমার মায়ের প্রার্থনাগুলো সব সময় আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিল।’ বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক বালজাক বলেছেন, ‘মায়ের হৃদয় হচ্ছে এক গভীর আশ্রয়, সেখানে আপনি সহজেই খুঁজে পাবেন মমতার সুশীতল ছায়া।’ জন গে বলেছেন, ‘মা, মা-ই, তার অন্য কোনো রুপ নেই।

মাত্র একটি অক্ষরের শব্দ ‘মা।পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শ্রেষ্ঠ শব্দ, অর্থে অনবদ্য,স্মৃতিতেও মধুময়। মা ডাক শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক মায়াবী সুন্দর মুখ। একটি পরিবারে মায়ের ভূমিকা কতটুকু তা মনীষীদের উক্তির দ্বারাই ভালোভাবে প্রমাণিত হয়। যেমন, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর কাছে এক ব্যক্তি পিতা-মাতার সেবা সম্বন্ধে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে তুমি তোমার মায়ের সেবা করবে’ এমন বক্তব্য তিনবার বলার পরে বাবার সেবা করতে বলেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে মায়ের মর্যাদাকে পরিবারের সবার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে।

মায়ের অপরিসীম ভালোবাসা ও ত্যাগের বিনিময়েই আমাদের এই ভুবনে আগমন। সারা দিনের ব্যস্ত সময়ে মাকে হয়তো আমরা 'ভালোবাসি' কথাটা বলতেও ভুলে যাই। আমার কাছে প্রায়ই মনে হয় মায়ের অনুপস্থিতি আমাদের পরিবার হবে অনেকটা মাঝি বিহীন নৌকার মত। মা তো সেরা ডাক্তার সন্তানের চেহারা দেখেই মনের কথা বলতে পারেন।

যে মা না হলে আমাদের পৃথিবীতে আসা কল্পনা করা যায় না সে মায়েরা কী আজ ভালো আছেন? তাদের সবাই কী তিনবেলা খাবার পাচ্ছেন? বৃদ্ধ বয়সে সন্তানেরা কী তাদেরকে ঠিকমতো সেবা দিচ্ছেন? উত্তরটা হ্যাঁ ও না দুটিই হতে পারে। দেশে আজ শত মা নিজ সন্তান দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছেন। সন্তানের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। যে মা দীর্ঘদিন পেটের মধ্যে সন্তানকে রেখেছেন এবং ছোট থেকে বড় করে তুলেছেন সে মায়েরা আজ সন্তানের কাছে ভালো ব্যবহার পান না। সন্তানের বিরাট অট্টালিকা থাকলেও মায়ের জন্য একটি কুঁড়ে ঘরেরও ব্যবস্থা করেন না। মায়ের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে।

আজকাল পত্রিকার পাতা খুললে শত মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। কোন মা চিকিৎসার অভাবে, কোন মা তীব্র শীতে গরম কাপড়ের অভাবে আবার কেউ খাদ্যাভাবে মারা যাচ্ছেন। যে মা তার সন্তানকে খেয়ে-না খেয়ে মানুষ করেছেন। নিজের ভাগের খাবারটুকু সন্তানকে দিয়েছেন। সে মা আজ সন্তান বেঁচে থাকতে এমন অবহেলায় মারা যাবে তা মেনে নেয়া যায় না। সন্তানের গায়ের চামড়া দিয়ে মায়ের জুতো বানালেও সন্তান লালন পালনের ঋণ শোধ হবে না ।

মা দিবসে আমাদের মায়েদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। মা’ই পৃথিবীতে সবচেয়ে সম্মানের দাবিদার। বাবা বেঁচে না থাকলেও সন্তানের জন্য খুব একটা কষ্ট হয় না। কিন্তু মা হারিয়ে গেলে সে ঘাটতি কখনো পূরণ হয় না। মায়ের আদর এবং স্নেহ পেয়ে পিতার ভালোবাসার কথা মনে থাকে না। সামান্য কষ্ট পেলে মা যখন সন্তানের নাম ধরে ডাকেন তখন মনের মধ্যে প্রশান্তি অনুভব করা যায়। আবার বড় ধরনের বিপদেও মা যখন কাছে নিয়ে উৎসাহ দেন তখন সকল বাধা ও জীর্ণতা সন্তানের কাছে পরাজিত হয়।

আজকের এ দিনে আমরা শপথ নিবো, শুধু মা দিবসেই নয়, প্রতিটি দিনে, প্রতিটি ক্ষণে তিনি যেন আমাদের সেবা পরিচর্যা ও ভালোবাসা পান। শিশু থেকে বিবাহ পরবর্তী জীবনে মা যেন সন্তানের চিকিৎসা-সেবার অভাবে অবহেলার পাত্র না হন সেদিকে লক্ষ্য রাখব।

ছোটবেলায় তারা আমাদের জন্য যে কষ্ট করেছেন তার জন্য আমরা তাকে সর্বদা মান্য করব। সর্বোপরি পরম করুণাময় আমাদের মায়েদেরকে সুস্থ রাখেন তার জন্য দোয়া করবো। গাঢ় হোক মায়ের সাথে ভালোবাসার বন্ধন আর খুশিতে থাকুক আমাদের মায়েরা- এটাই হোক আজকের প্রত্যাশা। প্রতিদিনই হোক মা দিবস।

আব্রাহাম লিংকন ও দিয়াগো ম্যারাডোনা'র মা নিয়ে দুটি উক্তি দিয়েই মা দিবসের লেখাটি শেষ করতে চাই- আব্রাহাম লিংকন বলেছেন– যার মা আছে সে কখনই গরীব নয়। দিয়াগো ম্যারাডোনা বলেছেন -আমার মা মনে করেন আমিই সেরা, আর মা মনে করেন বলেই আমি সেরা হয়ে গড়ে উঠেছি। বৃদ্ধাশ্রমে নয় প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে থাকুক মা।

[email protected]

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]