শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হোক এলাকাভিত্তিক

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:০১ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

মো. রহমত উল্লাহ্

মহামারি করোনা সংক্রমণের কারণে প্রায় দেড় বছর সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রথম খোলা হলো প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রথম দিনেই অনেক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণিতে প্রায় শতভাগ ছিল শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, শিক্ষার্থীরা করোনা মোকাবিলা করেই শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়ে লেখাপড়া করতে চায়। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রেও কতিপয় অভিভাবক ব্যতীত প্রায় সকলের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে ব্যাপক আগ্রহ। বিশেষকরে শিক্ষার্থীরা ছিল অত্যধিক সতর্ক। এটি অবশ্যই একটি শুভ লক্ষণ। প্রতিষ্ঠানে এসে শিক্ষার্থীরা যদি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠে তো এটি হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত মঙ্গলজনক। শিক্ষার্থী তথা সন্তানের দেখাদেখি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করবেন অনেক অসচেতন অভিভাবক। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মান্য করা ও টিকা প্রদান দ্রুত সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের টিকা প্রদানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার আগেই গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, ‘করোনা সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনরায় বন্ধ করে দেয়া হবে’। এ বিষয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীও এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়লে আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সুপারিশ করা হবে।' এ ব্যাপারে দ্বিমত করার কোন অবকাশ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কারণে করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেলে অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে পুনরায়। তবে মনে রাখতে হবে, মহামারি করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে শিক্ষাখাত। সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে আমাদের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী। শিক্ষার ক্ষতি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী ও বিভিন্নমুখী হওয়ায় সাধারণভাবে চোখে পড়ে না অনেকেরই। শিক্ষাখাতে এমন কিছু ক্ষতি আছে যা আর কখনোই রিকভার করা সম্ভব হয় না। প্রায় দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় যে সকল শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে ঝরে পড়ে শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে তাদের জীবন থেকে কখনোই আর মুছে দেওয়া সম্ভব হবে না এই ক্ষত।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি করোনা সংক্রমণ কোন এলাকায় বেড়ে যায় তাহলে কি সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ রাখা হবে? এক বা একাধিক এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে সকল এলাকার শিক্ষার্থীরা কি আবারও সরাসরি পাঠদান থেকে বঞ্চিত হবে? আমি মনে করি এমনটি হওয়া মোটেও উচিত নয়। তাই আমি আগেও অনেকবার অনুরোধ করেছিলাম, যে সকল এলাকায় সংক্রমণ কম ছিল সে সকল এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় অন্তত কিছু দিনের জন্য হলেও খুলে দেওয়ার জন্য।

এখনও আবার অনুরোধ করছি, যে সকল এলাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে সে সকল এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখুন। কোন এলাকায় করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ না করে কেবল সেই এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখুন এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে পুনরায় খুলে দিন। এভাবেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো অঞ্চল ভিত্তিক ট্রায়েল এন্ড এরর ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে হবে আমাদেরও।

এই লক্ষ্যে প্রয়োজনে জেলা বা উপজেলা ভিত্তিক শিক্ষা বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদারক কমিটি গঠন করা যেতে পারে এবং তাদের হাতে সেই এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ক্যাডেট কলেজসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহকে এইরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। তাতে করে সংক্রমণের হার বিবেচনায় দেশের কোনো না কোনো এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কোনো না কোনো ধরনের বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিছুকিছু সময়ের জন্য হলেও বারবার খোলা রাখা সম্ভব হবে।

যেহেতু আমাদের সারাদেশে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা ও অবস্থান একই রকম নয়, ইন্টারনেট সুবিধা একই রকম নয়, অভিভাবকদের আর্থিক অবস্থা একই রকম নয়, শিক্ষার হার একই রকম নয়; সেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা বা না রাখার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ অত্যাবশ্যক। অঞ্চল ভিত্তিক সংক্রমণের হার ও অন্যান্য দিক বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি খোলা রাখা সম্ভব হয় তাহলে সেটি অবশ্যই হবে মঙ্গলজনক। করোনা সংক্রমণ কম থাকার সুবাদে কোন এলাকার শিক্ষার্থীরা সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ বেশি পেলে অন্যদের তো কোন ক্ষতি নেই। কারো বিরোধিতা করারও কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। যারা ইন্টারনেটে ক্লাস করার সুযোগ বেশি পাচ্ছে তারা তো তা করছে। কেউ তো এর বিরোধিতা করছে না।

একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, আমাদের দেশের প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় করোনা সংক্রমণের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং সেসব এলাকার মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। ইন্টারনেট ও স্মার্ট ফোনের সুবিধা থেকে কম/বেশি বঞ্চিত পিছিয়ে পড়া সেসব গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যদি করোনা সংক্রমণ কম থাকায় সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ বেশি পায় তাহলে আমাদের সবারই তো খুশি হবার কথা। আমাদের সবারই তো দায়িত্ব লেখাপড়ার সুযোগ বাড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে সামনে এগিয়ে আনা। তারাও তো এ দেশেরই নাগরিক। তারা শিক্ষিত হলে এদেশেরই কল্যাণ হবে। সুতরাং কোনো একটি শহরে বা এলাকায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেলে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ রাখা অনুচিত।

লেখক : সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং অধ্যক্ষ - কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
[email protected]

এইচআর/এমএস

কোনো একটি শহরে বা এলাকায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেলে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে বন্ধ রাখা অনুচিত।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]