শুধু সরকারকে নয়, সমাজকেও কৃচ্ছ্রসাধনে উৎসাহ দিতে হবে

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টিভি।
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ১৪ মে ২০২২

ভোজ্যতেলের বাজার যখন অস্থির তখন নতুন করে নিম্নবিত্ত আর দরিদ্রদের জন্য খারাপ খবর হলো পেঁয়াজ, আলু ও ডিমের দামও বাড়তি। বলা হচ্ছে, পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দেওয়ার মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পণ্যটি আসা বন্ধ রয়েছে। এ কারণে দেশের খুচরা ও পাইকারি উভয় বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫ টাকা ও পাইকারিতে ১০ টাকা বেড়েছে। পেঁয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আলু ও ডিমের দামও।

যেসব দ্রব্য বেশিরভাগ আমদানি করে চলতে হয় যেমন- জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, গম ও পেঁয়াজ এগুলোর সরবরাহ এবং দাম নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ আছে এবং তা হলো ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল যে, বিশ্বে খাদ্য বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে এবং এখন সেটা বড় আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে।

করোনা থেকে যখন বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, তখনই যুদ্ধ লাগে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। যার জেরে বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দর। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির পক্ষে ‘ধ্বংসাত্মক’ হতে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের চাষিরা গমসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতে না পারায় বিশ্বে খাদ্য সরবরাহে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। প্রায় একইরকম সতর্ক বাণী দিয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা।

একটা সময় জ্বালানি তেলের দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও বাংলাদেশ সরকার দাম কমায়নি। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার কোনো সুফলই জনগণ পায়নি। এখন তো সেই প্রত্যাশা করার কোনো কারণই নেই। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম অবশ্যম্ভাবী ভাবে বাড়ছে। জ্বালানির খরচ বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, সেচ, পণ্য সরবরাহসহ সব খরচ বাড়বে। ফলে নিত্যপণ্যের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে ভাবা কঠিন।

সব মিলিয়ে পণ্যের দামের চাপে আমজনতা। এরই মধ্যে দাম বেড়েছে ভোজ্যতেলের। দাম বাড়াতে শুরু করেছে বেশ কয়েকটি ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী সংস্থাও। ফলে আশঙ্কায় দিন গুনছে সাধারণ মানুষ। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধ নানান শঙ্কা সৃষ্টি করেছে জনমনে। আন্তর্জাতিক লেনদেন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিপদ বাড়ার কথা আলোচিত হচ্ছে।

পরিস্থিতি এমন যে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে। এতে কমছে রিজার্ভ। গত বুধবার বিক্রি করেছে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার। এতে চলতি অর্থবছরের ডলার বিক্রির পরিমাণ ৫০০ কোটি ছাড়িয়েছে। আমদানি বাবদ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল পরিশোধ ও ডলার বিক্রির কারণে রিজার্ভ কমে হয়েছে ৪ হাজার ১৯৫ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।

এগুলো সবই বলে দেয় যে, পরিস্থিতি ভালো নয়। তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর বন্ধের বিষয়ে পরিপত্র জারি করেছে সরকার।

বৃহস্পতিবার এই পরিপত্র জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, করোনা–পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে পুনরায় আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত এক্সপোজার ভিজিট, শিক্ষা সফর, এপিএ এবং ইনোভেশনের আওতামুক্ত ভ্রমণ ও ওয়ার্কশপ বা সেমিনারে অংশগ্রহণসহ সব ধরনের বৈদেশিক ভ্রমণ বন্ধ থাকবে। এ আদেশ উন্নয়ন ও পরিচালন বাজেট উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

আমরা মনে করি এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। দামি গাড়ি ও নিত্যব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানিও নিরুৎসাহিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলার সময় এখন ৭৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম জমা দিতে হবে।

এর মধ্যেই মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী উপলব্ধি হচ্ছে। বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের সংকট প্রথম প্রমাণ। ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও তা দৃশ্যমান হবে। এ সময় আমাদের সমস্যা নিয়ে ভাবনার বিষয় রয়েছে। দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে, কিন্তু রেমিট্যান্সের অবস্থা অনেকটা ঋণাত্মক। তাই জ্বালানি ও অন্যান্য দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। সরকারকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করতে হবে। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি সব ধরনের জরুরি নয় এমন ভ্রমণ বন্ধ করা যায় কি না চিন্তা করতে হবে।

দেশে খাদ্যপণ্যসহ সবধরনের নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। শুধু সরকারকে নয়, সমাজকেই কৃচ্ছ্রসাধনে উৎসাহ দিতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে কিছু কিছু ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। হয়তো আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সেজন্য জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তবেই গুজব, নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে মুক্ত থাকা যাবে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/ফারুক/এমএস

দেশে খাদ্য পণ্যসহ সবধরনের নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হবে। শুধু সরকারকে নয়, সমাজকেই কৃচ্ছ্রসাধনে উৎসাহ দিতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে কিছু কিছু ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। হয়তো আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সে জন্য জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। তবেই গুজব, নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে মুক্ত থাকা যাবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]