মানবিক সমাজব্যবস্থার প্রত্যাশা কি অমূলক?
পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। মানুষ তার একমাত্র বাসস্থল পৃথিবীকে নিজের প্রয়োজনেই বদলাতে বাধ্য হচ্ছে। আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো বিশ শতক উনিশ শতকের রেপ্লিকা নয়, তদ্রুপ একবিংশ শতাব্দীকেও আমরা বিশ শতকের রেপ্লিকা বলতে পারি না। একবিংশ শতকের বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি পূর্বের সব ধ্যান-ধারণা ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে। আগামীতে আরও কত পরিবর্তন দেখতে হবে এই মুহূর্তে তা অনুমান করা কঠিন।
আমরা যারা এক সময় বামপন্থি ছিলাম, যারা মার্কসবাদ, লেলিনবাদে বিশ্বাসস্থাপন করে সোনালি যৌবন বাজি রেখেছিলাম তারা মনে করতাম বিশ শতকের শেষ দিকে অর্থাৎ একবিংশ শতকের গোড়ার দিকে পৃথিবীব্যাপী সমাজতন্ত্র কায়েম হবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখছি আমাদের সেই ধারণা ভুল ছিল, কেন ভুল ছিল সেই ব্যাখ্যা এই লেখায় করবো না, শুধু বলবো- ধনসাম্যের পরিবর্তে এখন ধনবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে।
একদিন আমরা হাত উঁচিয়ে স্লোগান দিতাম ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না তা হবে না, তা হবে না।’ যারা ভাবেন এই স্লোগানের দিন শেষ হয়ে গেছে আজ তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এই স্লোগানের দিন শেষ হয়ে যায়নি। আজ পৃথিবীর এক শতাংশ লোকের হাতে যে পরিমাণ অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত আছে, বাকি নিরানব্বই শতাংশ মানুষের হাতেও সেই পরিমাণ সম্পদ নেই। তাহলে অঙ্কটা দাঁড়াচ্ছে এক শতাংশ সমান নিরানব্বই শতাংশ। এক শতাংশ মানুষের হাতে পৃথিবীর সব সম্পদ, সব সুখ বন্ধক রেখে নিরানব্বই শতাংশ মানুষ কি সুখে থাকতে পারে নাকি সুখে থাকা সম্ভব?
মানবসভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাস বলে আমরা বারবার মানুষ হতে চেয়েছি কিন্তু আমরা আসলেই কি মানুষ হতে পারছি? আমরা সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব বলে নিজেদের পরিচয় দেই কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হওয়ার জন্য নয়, প্রতিযোগিতায় নেমেছে সর্বনিকৃষ্ট জীব হওয়ার জন্য। আজ পৃথিবীর দিকে তাকালে ব্যথায় বুক কুকড়ে ওঠে, দেশে দেশে বেড়ে যাচ্ছে ছিন্নমূল, দেশহারা মানুষের সংখ্যা। নির্বিচারে তথাকথিত মোড়ল রাষ্ট্র অত্যাচার চালাচ্ছে গরিব রাষ্ট্রগুলোর ওপর।
অস্ত্র বিক্রির জন্য এখন প্রত্যেকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করে গরিব রাষ্ট্রগুলোকে অস্ত্র কিনতে বাধ্য করছে। যে সময় অস্ত্র পরিহার করে শান্তির পথে, সাম্যের পথে পৃথিবীর যাত্রা করার কথা ছিল সেই সময় পৃথিবীর কোনো কোনো দেশ যুদ্ধের দিকে, রক্তপাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি- এটা কি আদৌ মানুষের স্বপ্ন ছিল? আমরা কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি- সব মানুষকেই আজ এই বিষয়টা ভেবে দেখা দরকার। উদ্দেশ্যহীনভাবে পাগলের মতো ছুটে চললে আমরা শুধু ক্লান্ত হবো, কখনো শান্তি পাবো না। আমাদের উচিত পৃথিবীতে আজ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একযোগে কাজ করা।
একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের আরাম-আয়াশের ব্যবস্থা যেমন করেছে- তেমনি ব্যারামের জন্যও কোনো কিছু বাকি রাখেনি। বিজ্ঞান মানুষকে সীমাহীন ক্ষমতা হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিজ্ঞান মানুষকে যেমন অপরিসীম সৃষ্টি ক্ষমতা দিয়েছে, তেমনি দিয়েছে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাও। আমরা ধ্বংস চাই না, সৃষ্টি চাই। সৃষ্টির পথে থেকেই আমরা রচনা করতে চাই সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। সাম্যের পক্ষে, মুক্তির লক্ষ্যে আজ আমাদের এগোতেই হবে। একমাত্র পৃথিবীকে পাগলামি করে ধ্বংসের হাতে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কিছুতেই বিবেকবান মানুষ সমর্থন করতে পারেন না।
পৃথিবীর চারদিকে আজ দেখছি মানবসৃষ্ট পাপ মহামারির আকার ধারণ করেছে। দেশে দেশে যুদ্ধ-গৃহযুদ্ধ নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো পুঁজির লোভে উন্মাদ হয়ে গেছে, মানুষকে যে কাজে মানায় না, যে কাজ করলে মানবতার চরম অমর্যাদা হয়, আজ তারা পৃথিবীব্যাপী সেই কাজগুলোই নির্লজ্জের মতো করে যাচ্ছে। তাদের লালসার রাশ টেনে ধরতে না পারলে এই পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না, শ্মশানে পরিণত হবে। আমরা যারা শান্তির সপক্ষে দণ্ডায়মান তাদের উচিত সংঘাতের পথ, ধ্বংসের পথ পরিহার করে কল্যাণের দিকে যাত্রা করা। এই যাত্রা যত দ্রুত শুরু হবে ততই মানুষের জন্য মঙ্গল বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে।
পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় দৃষ্টি দিলেই চারপাশের নৃশংস ঘটনা দেখতে পাই। আদিম যুগেও মানুষ যা করতে দ্বিধা করতো, আধুনিকতার প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেও সেই বর্বর কাজগুলো করেই মানুষ এখন এক ধরনের বিকৃত সুখ অনুভব করার চেষ্টা করছে। মানুষ এত বিকৃত হচ্ছে কেন? কি কারণে উল্টো দিকে চলতে শুরু করেছে লোভে অন্ধ ক্ষণজীবী মানবসন্তান?
আজ ইউরোপজুড়ে অশান্তি। এশিয়ায়ও শান্তি নেই। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন ও নির্যাতন বিশ্ববাসীর আবেগকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকমে রক্ষা পেলেও বাংলাদেশ পড়েছে তীব্র সংকটে। সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশ ও পৃথিবীকে যে বার্তা দিতে চায় সেটা যে শুভ বার্তা নয় এটা মোটামুটি নিশ্চিত। শুধু মিয়ানমার নয় সিরিয়ায় সাম্প্রতিককালে যে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী তার বিবরণ দেওয়া অসম্ভব। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? প্রতিদিন যে রক্ত ঝরছে সেই হিসাব আর কত কষতে হবে আমাদের? এর কি কোনোই সমাধান নেই? এই সংঘাতের বৃত্ত থেকে কি কখনোই মুক্তি সম্ভব নয়?
সমগ্র পৃথিবী এর আগে দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। দেখেছে আরও অসংখ্য ছোট-বড় গৃহযুদ্ধ। ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে পড়েও অসংখ্য দেশ সর্বস্বান্ত হয়েছে। এত যুদ্ধ-বিগ্রহ, শোষণের অভিজ্ঞতা থাকতেও মানুষ কেন আজ আবার যুদ্ধের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে সেটাই সবচেয়ে বেদনাদায়ক। একবিংশ শতাব্দীর এই উৎকর্ষের যুগে এসেও কেন আমরা দিন দিন অমানবিক হয়ে উঠছি, হিংস্র থেকে হিংস্রতম হচ্ছি আমাদের আজ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া দরকার।
বর্তমান পৃথিবী এখন একটি মানবিক সমাজব্যবস্থা প্রত্যাশা করছে। এই মানবিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আমাদের সবাইকে আজ লোভ পরিহার করতে হবে। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে ওঠে অসাম্প্রদায়িক আচরণ করতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চা দেশে দেশে আরও ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মারণাস্ত্র উৎপাদন সর্বাংশে পরিহার করতে হবে। যে নিরন্ন মানুষের মুখে আমরা একমুঠো অন্ন তুলে দিতে পারি না, সেই অনাহারি মানুষকে হত্যা করার অধিকার কি আমাদের আছে? নাকি সেই অধিকার থাকতে পারে? আমরা যদি কারও মঙ্গল করতে না পারি, তাহলে তার অমঙ্গল কামনা করি কেন?
আমরা এখন এমন এক সময়ে বসবাস করছি যে সময় সত্যিকার অর্থেই চরম অস্থির। অস্থির সময়ের সন্তান হিসেবে আমরাও গা ভাসিয়ে দিচ্ছি ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস আর স্বার্থপরতায়। কিন্তু আমরা যদি দাসপ্রথাবিরোধী নেতা আব্রাহাম লিংকনের দিকে তাকাই, তাহলে মানবতাবাদী শিক্ষা নিতে পারি। আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একটি অসচ্ছল পরিবার থেকে নিজের শ্রম ও প্রজ্ঞা দিয়ে বরেণ্য হয়েছিলেন, হৃদয় জয় করেছিলেন কোটি কোটি মানুষের। ভারতবর্ষের মহাত্মা গান্ধীও আদর্শ ও প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছেন বিশ্ববাসীর কাছে।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করে, নির্লোভ জীবনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শুধু বাঙালির সামনেই নয়, বিশ্ববাসীর সামনে সততা ও মহানুভবতার যে কীর্তি সৃষ্টি করেছেন তার কোনো তুলনা নেই। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কথাও আমরা ভুলে যাই কেন? দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের যে উদাহরণ বঙ্গের এই নির্ভীক সন্তান সৃষ্টি করেছেন তা এক বিরল ইতিহাস।
আমরা নৃশংস রাষ্ট্রনায়ক হিটলারকে দেখেছি, দেখেছি হিটলারের দোসর ইতালির মুসোলিনি ও জাপানের তোজোকে। কুখ্যাত একনায়কেরা যুগে যুগে পৃথিবীব্যাপী যে তাণ্ডব চালিয়েছে, নির্বিচারে যে পরিমাণ মানুষ হত্যা করেছে তার পরিসংখ্যান ইতিহাসের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ আছে।
আমরা একটি গল্প জানি, যে গল্পটি একজন ভূমিলোভী মানুষের। তাকে বলা হয়েছিল- তুমি দৌড়াও। তুমি যতদূর দৌড়াতে পারবে, ততদূর পর্যন্ত জমিই তোমাকে দেওয়া হবে। জমির লোভে দৌড়াতে দৌড়াতে লোকটি একসময় মারা গেলেন, সেই সঙ্গে মারা গেলো তার সম্পদ-আকাঙক্ষাও।
বিশ্ববিখ্যাত লেখক টলস্টয় জমিদার ছিলেন। লেখালেখি করেও তিনি প্রভুত সম্পদ অর্জন করেছিলেন। তিনি এক পর্যায়ে ঘর থেকে শূন্য হাতে বের হয়ে যান। মৃত্যুবরণ করেন নিঃসঙ্গ-সামান্য মানুষের মতো। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সাড়ে তিন হাত ভূমিই মানুষের শেষ সম্বল। তাই যদি হয়, তাহলে পৃথিবীতে আমরা এত সম্পদের পাহাড় কার জন্য, কীসের জন্য রেখে যাচ্ছি?
আমাদের যৌবনে একটা গান শুনেছিলাম- ‘পৃথিবী বদলে গেছে- যা দেখি নতুন লাগে’, আসলেই তাই। পৃথিবী প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। এই বদলানোতে আমরা আশাবাদী হতে পারতাম যদি বদলানো শুভ হতো, কিন্তু আমাদের এই মুহূর্তে আশাহত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। পৃথিবী বদলাচ্ছে বটে, তবে এই বদলকে অবশ্যই কল্যাণমুখী করতে হবে, মানবিক করতে হবে। অন্যকে কষ্ট দিয়ে, মৃত্যু যন্ত্রণার ভেতর ঠেলে দিয়ে পৃথিবীকে যারা বদলাতে চায় সেই বদলানোকে আমাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
মানুষই মানুষের ভরসার জায়গা। মানুষই মানুষের সুখ-দুঃখের একমাত্র আশ্রয়স্থল। মানুষকে অকারণে কিংবা অর্থের লোভে হত্যা করে যারা আনন্দ পায়, ধন-সম্পদের পাহাড় গড়তে চায়- আমাদের সবার উচিত হবে তাদের ঘৃণা করতে শেখা। পৃথিবীর সবকিছুই সুন্দর, মূল্যবান, সম্মানীয় এই কথাটি আমাদের মনে রাখতে হবে।
পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই- ‘যাহা-কিছু হেরি চোখে কিছু তুচ্ছ নয়/ সকলই দুর্লভ বলে আজি মনে হয়।/ দুর্লভ এ ধরণীর লেশতম স্থান,/ দুর্লভ এ জগতের ব্যর্থতম প্রাণ।’ পৃথিবীতে সবাই সুখে থাকুক। নির্বিঘ্ন হোক আমাদের সবার জীবন। জয় হোক মানবতার, জয় হোক ভ্রাতৃত্ববোধের।
১৫ মে ২০২৩
লেখক: রাজনীতিক, লেখক ও মহাপরিচালক, বিএফডিআর।
এইচআর/ফারুক/জেআইএম