ব্যাংকের এমডির অপ্রত্যাশিত পদত্যাগ উদ্বেগের বিষয়

নিরঞ্জন রায়
নিরঞ্জন রায় নিরঞ্জন রায় , সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিষ্ট ও ব্যাংকার, টরনটো, কানাডা
প্রকাশিত: ০৬:০৩ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সাম্প্রতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায় যে এনআরবি ব্যাংকের এমডি অপ্রত্যাশিতভাবে পদত্যাগ করেছেন। কিছুদিন আগে এভাবেই তিনটি ব্যাংকের এমডি একের পর এক পদত্যাগ করেছিলেন। তার আগে আরো একটি ব্যাংকের এমডি পদত্যাগ করেছিলেন। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নিয়ে তিনজন এমডিকে স্বপদে ফিরিয়ে এনেছিল বলেই শুনেছিলাম। একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বা এমডি পদত্যাগ করতেই পারেন। স্বাস্থ্যগত কারণ, পারিবারিক কারণ বা দায়িত্বের চাপ অস্বাভাবিক মনে হলে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিতেই পারেন, যা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটে তখনই যখন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রধান নির্বাহীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় বা যখন ব্যাংকের এমডির ওপর পরিচালনা পর্ষদ নিয়মবহির্ভূত চাপ প্রয়োগ করে। আমাদের দেশের ব্যাংকের এমডির পদত্যাগের নজির খুব একটা নেই। আমাদের ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা অনেক অযাচিত চাপ সহ্য করেই দায়িত্ব পালন করেন। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় আমাদের দেশের ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পরিচালকদের মন জুগিয়েই ব্যাংক পরিচালনা করে থাকেন। এজন্য তাঁদের অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। এরকম একটি অবস্থায় যখন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা অপ্রত্যাশিতভাবে পদত্যাগ করেন তখন এর পিছনে সংকট যে বেশ জটিল তা আর বুঝতে বাকি থাকে না।

ব্যাংকের এমডির অপ্রত্যাশিত পদত্যাগ মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এই ঘটনা একদিকে যেমন দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ক্ষতিকর, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও আমাদের দেশের ব্যাকিং খাত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়, যার প্রভাব দেশের ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর পড়তে বাধ্য। দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ক্ষতিকর এই কারণে যে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সমগ্র ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিতে। অন্যান্য ব্যাংকের এমডিও তখন স্বাচ্ছন্দে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ব্যাংকাররা এই পেশায় ক্যারিয়ার গড়ে তোলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি ব্যাংকাররা পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ বিশ্বের ব্যাংকিং পেশার যেসব প্রকাশনা আছে, সেখানে এই সংবাদ ছাপা হবে যা নেগেটিভ নিউজ আকারে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক লিপিবদ্ধ করে রাখবে। ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যার খেসারত দিতে হবে দেশের ব্যবসায়ীদের।

আমাদের সবার একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ব্যাংকিং কোনো সাধারণ পেশা নয়। চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা আইনজীবীর মত ব্যাংকিং একটি বিশেষায়িত পেশা। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা আইনজীবী রাতারাতি গড়ে তোলা যায় না। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘ পড়াশোনা, অনুশীলন এবং অঙ্গীকার। ব্যাংকিং পেশাও ঠিক তাই। অনেক পড়াশোনা, হাতেকলমে কাজ করা এবং সর্বোপরি পেশার প্রতি কঠোর অঙ্গীকারের (কমিটমেণ্টের) মাধ্যমে একজন ব্যাংকার তৈরি হতে পারে। একথা ঠিক যে সব ব্যাংকার সমান দক্ষ ও অভিজ্ঞ হবেন তেমন কোনো কথা নেই। সেরকম অবস্থা কোন পেশাতেই হয় না। তবে দক্ষতা অভিজ্ঞতা যাই থাকুক না কেন একজন ব্যাংকারকে দীর্ঘদিন হাতেকলমে কাজ করেই এই পেশায় পারদর্শী হতে হয়। আর একারণেই ব্যাংকারদের দিয়েই ব্যাংক পরিচালনা করতে হয়। উন্নত বিশ্বে ব্যাংকিং সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর এক ব্যাবসায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রযুক্তিবিদদের রমরমা অবস্থা। তারপরও ব্যাংকারদের কদরই এখনও সবার উপরে। তাই একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ব্যাংক চালাতে হলে ব্যাংকার লাগবে, অন্য কাউকে দিয়ে হবে না। আর ব্যাংকার তৈরি করতে হলে নির্ভয়ে ব্যাংকারদের কাজ করতে দিতে হবে এবং সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

আলোচনা সমালোচনা যাই থাকুক না কেন আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে ব্যবসায়ীদের যথেষ্ট অবদান আছে। ব্যবসায়ীরাই ঝুঁকি গ্রহণ এবং পুঁজি বিনিয়োগ করেন, তাই তাঁরাও তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সফলতার সঙ্গেই পরিচালনা করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। দেশের ব্যবসায়ীরাই ব্যাংকের মালিক তাই তাঁরা এই প্রতিষ্ঠানকে সফলভাবে পরিচালনা করবেন এটাই স্বাভাবিক। ব্যাংক সফলভাবে পরিচালনার জন্য যে ভালো ব্যাংক কর্মকর্তা লাগবে সেটাও তাঁরা ভালভাবেই জানেন। তাহলে কেন এমন পরিস্থিতির উদ্রেগ হবে যে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের দায়িত্ব ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে তো দেশের ব্যবসায়ীরা ব্যাংক পরিচালনার জন্য যোগ্য ব্যাংকার খুঁজে পাবেন না।

আমাদের ব্যাবসায়িরা একদিকে যেমন অন্যান্য অনেক সাধারণ ব্যবসার মালিক, তেমনি ব্যাংকেরও পরিচালক। কিন্তু অন্যান্য সাধারণ ব্যাবসা পরিচালনার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনার এক বিস্তর পার্থক্য আছে। ব্যাংককে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম মেনে ব্যাবসা পরিচালনা করতে হয়, যা অন্যান্য সাধারণ ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), স্টক এক্সচেঞ্জ, রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) এবং আরো অনেক সংস্থার নিয়ম ও বিধিবিধান মেনে ব্যাংক পরিচালনা করতে হয়। এতগুলো দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার অসংখ্য বিধিবিধান মেনে চলার বাধ্যবাধকতা অন্যান্য সাধারণ ব্যাবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নেই। এই বিষয়টি পরিষ্কার বুঝতে পেরে তা ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে না পারার কারণেই ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীকে নিয়মবহির্ভূত চাপের মধ্যে ফেলা হয়। অবশ্য দেশের সব ব্যাবসায়ী বা ব্যাংকের চেয়ারম্যান / পরিচালক এমনটা করছেন তা বলা যাবে না। তবে অনেকেই করছেন যার দায় নিতে হচ্ছে সমগ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে এবং ব্যাংকের পরিচালকদের।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ব্যাংকিং যথেষ্ট স্ট্রেসফুল জব। আমরা যে উন্নত বিশ্বের একটি সিস্টেম-নির্ভর ব্যাংকে চাকরি করি সেখানেও যথেষ্ট স্ট্রেস আছে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে আমাদেরও চাকরি হারাতে হবে এবং এমনকি জেলেও যেতে হতে পারে। পার্থক্য হচ্ছে এখানে চাকরিটাই স্ট্রেসফুল, কিন্তু কাজের পরিবেশটা মোটেও স্ট্রেসফুল নয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে ব্যাংকের চাকরি যত না স্ট্রেসফুল, তার চেয়ে অনেক বেশি স্ট্রেসফুল ব্যাংকে কাজের পরিবেশ। বাংলাদেশে ব্যাংকারদের চতুর্মুখী চাপের মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। ব্যবসায়ীদের চাপ, রাজনীতিবিদদের চাপ, বাংলাদেশ ব্যাংকের চাপ, বিএসইসির চাপ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চাপ। এর সঙ্গে নতুন যোগ হয়েছে দুদকের চাপ। এত বহুমুখী চাপ সামলে কোনো মানুষের পক্ষেই সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। এর উপর যদি পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। সব চাপে যেখানে পরিচালনা পর্ষদের ব্যাংকারদের পাশে থাকার কথা, সেখানে তারা যদি নিজেরাই চাপ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তো ব্যাংকারদের দায়িত্ব পালন করাই সম্ভব নয়। এই অবস্থার যদি উন্নতি করা না হয় তাহলে ব্যাংক চালানোর জন্য উপযুক্ত ব্যাংকার আর থাকবে না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এক পর্যায় পেটের দায়ও খাট হয়ে যায়, যদি মাত্রাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা হয়, যার বড় প্রমাণ কয়েকটি ব্যাংকের এমডির অপ্রত্যাশিত পদত্যাগ।

অনেকক্ষেত্রে সাময়িক ব্যাবস্থা হিসেবে পদত্যাগ করা এমডিকে ফিরিয়ে এনে একরকম জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়, যেমনটা আগে তিন পদত্যাগী এমডির ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু এরকম ক্ষণস্থায়ী সমাধান খুব একটা কাজে আসে না। একবার পদত্যাগ করে পুনরায় কাজে যোগ দিয়ে সেই প্রধান নির্বাহীরা কতটা স্বাচ্ছন্দে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আসলে সমস্যার মুলে হাতে দিতে হবে। করপোরেট গভর্নেন্স বা সুশাসন বলতে যা বোঝায় তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাজ এবং প্রধান নির্বাহীসহ ম্যানেজমেন্টের কাজের মধ্যকার যে সীমারেখা থাকা বাঞ্ছনীয়। সেটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে পারলেই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং এমডির নেতৃত্বে ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পেশাদার সম্পর্ক বিরাজ করবে। এবং সেটা করতে হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যদি নির্ধারণ করা হয় যে নতুন গ্রাহকের অন-বোর্ডিং এক বছর পূর্ণ না হলে ঋণ মঞ্জুর করা যাবে না বা গ্রাহকের রেটিং অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ নির্ধারিত বা অনুমোদিত হবে। এই শর্তগুলো যখন প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিপালন করা হবে তখন ব্যাংকের পরিচালক বা চেয়ারম্যান চাইলেও তো সিস্টেম এর বাইরে যেয়ে ঋণ মঞ্জুর করবে না। বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরতে পারলে পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হতো কিন্তু ভিন্ন প্রেক্ষাপট বিধায় সে সুযোগ এখানে নেই, তাই অন্য কোনো পরিসরে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। মোটকথা দেশের অর্থনীতির স্বার্থে, ব্যাংকিং খাতের স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক বানিজ্যের স্বার্থে ব্যাংকারদের স্বাচ্ছন্দে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক, চেয়ারম্যানদের সংগঠন এবং এমডিদের সংগঠন একত্রে বসে আলোচনার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে মানসম্পন্ন কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে পারে।

লেখক: সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিষ্ট ও ব্যাংকার, টরনটো, কানাডা।

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।