নির্বাচন ২০২৬: বদলে যাওয়া রাজনীতির বড় পরীক্ষা
আর একদিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল কাঙ্ক্ষিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে একটি সাংবিধানিক এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এজন্য ভোটারদের আলাদা একটি গোলাপি রঙের ব্যালট পেপার দেওয়া হবে, যেখানে ‘জুলাই সনদ’ ও সংবিধান সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে চারটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নির্বাচন। আর সেই নির্বাচন যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তবে গণতন্ত্র সংকটে পড়ে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কেবল ভোটের দিনটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং নির্বাচনের পূর্বাপর পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক করতে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রধান পূর্বশর্ত হলো একটি শক্তিশালী ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন। কমিশনকে কেবল কাগজে-কলমে নয়, প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবেও স্বাধীন হতে হবে। তারা যেন সব সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারে সেটি নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত জরুরি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, মোট ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। প্রধানত দুটি বড় জোট ও কয়েকটি দল স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
১০ দলীয় জোট: এর নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই জোটের প্রার্থীরা মূলত ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন।
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য: এর নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই জোটে আরও আছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টি, খেলাফত মজলিসসহ অন্যান্য দল।
অন্যান্য দল: ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি (জি এম কাদের), গণঅধিকার পরিষদ এবং বাম গণতান্ত্রিক জোটের দলগুলো স্বতন্ত্রভাবে বা নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। দলটিকে এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ও প্রতীক স্থগিত করেছে এবং সরকার দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিরুদ্ধে 'মানবতাবিরোধী অপরাধের' অভিযোগে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় অন্য দলগুলো (বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত) আওয়ামী লীগ সমর্থক সাধারণ ভোটারদের সমর্থন আদায়ের জন্য কৌশলগত প্রচারণা চালাচ্ছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সভা-সমাবেশ, প্রচারণা এবং মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে। এক্ষেত্রে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরপেক্ষতার চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ২ হাজার ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী । ভোটের দিন একই সাথে নতুন সংবিধান বা রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে একটি গণভোট (Referendum) অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সভা-সমাবেশ, প্রচারণা এবং মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে। এক্ষেত্রে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে নিরপেক্ষতার চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেই হবে।
নির্বাচন চলাকালীন সিভিল প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা এবং নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
সাধারণ ভোটাররা যেন কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা চাপের মুখে না পড়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই বা এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার সংস্কৃতি কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
নির্বাচনে অর্থের ঝনঝনানি এবং পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করতে নির্বাচনি ব্যয়সীমা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। নির্বাচনি বিধিমালা লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা কমিশনের থাকতে হবে। প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিল করে এ ব্যাপারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
একটি নিখুঁত ভোটার তালিকা স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রথম ধাপ। মৃত ব্যক্তি বা দ্বৈত ভোটারের নাম বাদ দিয়ে একটি আধুনিক ডাটাবেজ নিশ্চিত করতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করতে হবে, যাতে প্রযুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং সাংবাদিকদের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য লাইভ সম্প্রচার এবং ফলাফল গণনার সময় প্রার্থীদের প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা উচিত।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম আস্থার পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনের পদ্ধতি বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো গেলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

দুই.
সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল ভিত্তি হলো একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন : নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ‘নির্বাচন কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রস্তাব করা হয়েছে ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বাসন: পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে নিরপেক্ষতার অভাব থাকায়, ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পুনর্গঠন করা হয়েছে।
ইভিএম (EVM) বর্জন: স্বচ্ছতা ও জনমতের ভিত্তিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম বর্জন করে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভোটের দিন ও তার পূর্ববর্তী সময়ে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন: সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারসহ প্রায় ৯ লাখ ৩৯ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অস্ত্র সমর্পণ ও তল্লাশি: নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নজরদারি: ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা, বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ড্রোন ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন। নির্বাচনের দিনই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যা সাংবিধানিক সংস্কারের পথ সুগম করবে।
আসন্ন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘না’ ভোট (None of the Above - NOTA) প্রদানের সুযোগ আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এটি সব আসনের ব্যালট পেপারে থাকবে না।
শর্তসাপেক্ষ উপস্থিতি: নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুধু সেই আসনগুলোতে ব্যালট পেপারে ‘না’ ভোট থাকবে যেখানে মাত্র একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
উদ্দেশ্য: কোনো প্রার্থী যাতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই ‘হাইব্রিড নো ভোট’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ফলাফল: যদি ‘না’ ভোট ওই একক প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বেশি হয়, তবে সেই আসনে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আচরণবিধি কঠোর করা: প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই, বিদেশের সম্পদের হিসাব প্রকাশ এবং নির্বাচনি ব্যয় কঠোরভাবে মনিটর করার বিধান রাখা হয়েছে।
গুজব প্রতিরোধ এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ডিজিটাল সেবা চালু করা হয়েছে। হটলাইন ও ডিজিটাল তদারকি: নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ জানাতে বিশেষ হটলাইন চালু করেছে নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ।
পর্যবেক্ষণ নীতিমালা: দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য একটি নতুন ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
নিখুঁত ভোটার তালিকা: মৃত ও দ্বৈত ভোটার বাদ দিয়ে একটি আধুনিক ও ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
অপ্রয়োজনীয় দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করাই এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য।
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন কেবল নির্বাচন কমিশনের একার কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া যেখানে সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চাই পারে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এমএস