বাংলা ব্লগ এখন কমিউনিটি চ্যাটরুম


প্রকাশিত: ০৭:০১ এএম, ১১ মে ২০১৫

‘মিউজিক ইউ স, পিকচার ইউ ফিল’। এমন একটি আপাত বৈসাদৃশ্যযুক্ত স্লোগানের টিভি বিজ্ঞাপন প্রচার হতো আশির দশকের শেষ দিকে। বিজ্ঞাপনটার বক্তব্য কৌতুহলোদ্দীপক হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজ্ঞাপনটি বলতে চাইছে, এই টিভিটা এমনই যে এতে গান শুধু শুনবেন না, দেখবেনও। তেমনি ছবি শুধু দেখবেন না, অনুভবও করবেন! এতো দিন বাদে এখন এমনটি বলা যেতেই পারে- ‘রাইটিং ইউথ কনভার্সেশন, কনভার্সেশন ইউথ দ্য রাইটিংস’। লেখালেখি এখন আর কেবলমাত্র কাগজে লিখে, কাগজে ছেপে ঘরের কোণে বসে একা একা পাঠের বিষয় নয়। লেখালেখি এখন (তা সে সাহিত্য হোক, রাজনৈতিক আলোচনা হোক, বিজ্ঞানের দাঁতভাঙা বিশ্লেষণ হোক কিংবা নিরেট রম্য রচনা হোক) লেখক-পাঠকের কনভার্সেশন।

লেখক লিখেই তার দায় সেরেছেন মনে করার দিন আর নেই। এখন লেখককে লিখে সেটি জনসমক্ষে রেখে চুলচেরা বিশ্লেষণের নিরিখে আলোচনা-সমালোচনায় অংশ নিতে হয়। সেখানেই লেখকের লিখাটি অনুপানে সিদ্ধ হয়ে কখনো রাঙতা মোড়া হতে পারে, আবার কখনো-বা তীব্র প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়ে স্রেফ আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। আর এসবই হয়েছে ব্লগ কালচারের কারণে। আরো খোলাসা করে বললে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে।

আমরা যখন শরৎবাবুর শ্রীকান্ত পড়েছি তখন কারও কারও মনে হয়েছে শরৎবাবু শেষ দিকে দিদিকে একটু নমনীয় করলেই পারতেন! শ্রীকান্ত এতো যে পীড়াপীড়ি করছিলেন, তারপরও দিদি ঠাঁয় বেঁকে রইলেন! দিদি যদি শ্রীকান্তের সঙ্গে যেতে রাজি হতেন তাহলে তো আর সেই দুঃশ্চরিত্র কাপালিক দিদিকে কষ্ট দিতে পারতেন না! বিলক্ষণ, ঠিক এই সময়ে যদি শ্রীকান্ত লিখিত হতো তাহলে নিশ্চয় করেই লিখা নিয়ে ধুন্ধুমার তর্ক-বিতর্ক বেঁধে যেত, এবং লেখক সামাজিক টানাপোড়েনের বাছবিচারের কষ্টিপাথরে নিজের লিখাটি যাচাই করতে পারতেন। আবার এও হতে পারত, এখনকার নিরীখে হয়তো শ্রীকান্ত মোটেই কোনো মহান এপিক হয়ে উঠতে পারতেন না। হয়তো সেটি স্রেফ একটা হুমায়ূনীয় বা সুনীলীয় গার্বেজ হয়ে উঠত। বিষয় সেটি নয়। আবার বিষয় এটিও নয় যে কাগজের জমানার লিখা আর কি-বোর্ডে ওয়েবে লেখার তুল্যমূল্য যাচাই করা হচ্ছে। বিষয়; স্টাইল অব রাইটিংস।

খুব বেশি দিন হয়নি ওয়েবে বাংলা লেখালেখির চল হয়েছে। সম্ভবত ২০০৫ সালের দিকে এদেশে ওয়েবে বাংলা ফন্ট ব্যবহার করে লেখালেখির চল হয়েছে। এক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকায় আছে ব্লগ সাইট। ওই সময়কালে কয়েকজন দুঃসাহসী মানুষের চেষ্টায় বাংলায় ব্লগ লেখার চল হয়েছে। প্রথম প্রথম কয়েকজন অতি উৎসাহী মানুষ সেখানে টুকটাক এটা ওটা লিখতেন। সেই লেখার ইন্টারেকশন শুরু হলে ক্রমে লেখকদের উৎসাহ বাড়ে এবং লেখক (ব্লগার) সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন প্রবাসী বাঙালিরা। আগে তারা কষ্টার্জিত ডলার-পাউন্ড ব্যয় করে দেশের প্রিয়জনদের সঙ্গে ফোনেই কথা বলতেন। তারপর বলতেন (লিখতেন) ইয়াহু বা গুগল চ্যাটবক্সে। বলাবাহুল্য তা ইংরেজিতেই।

বাংলা ব্লগ চালু হতেই তারা যেন হাতে টেলিস্কোপ পেয়ে গেলেন! কাজ শেষে ঘরে বসে বা কাজের ফাঁকে অফিসে বা ইউনিভার্সিটিতে বসেই কম্পিউটার খুলে প্রায় সামনা-সামনি আবহে কথা (লেখা) বলতেন। সেই কেমন আছ-ভাল আছি’র আবহ একসময় পরিবর্তিত হতে হতে এখন দাঁড়িয়েছে সেই বিদেশ বিভুঁয়ে একাকী স্মৃতিমন্থণকারী বাঙালিটি আর কেবলই প্রবাসী নষ্টালজিক মানুষ নন। এখন সে-ই পুরোদস্তুর সাহিত্যকর্মী। সমালোচক। বোদ্ধা। দেশের জন্য, দশের জন্য তার মনে উদয় হওয়া চিন্তার প্রচারক এবং ইন্টেলেকচ্যুয়ালিটির অংশ। তেমনি দেশে বসে যারা ছুটছাট চ্যাটরুমে আড্ডা দিতেন তারাও এখন আর কেবলই সময় কাটানো বহেমিয়ান নন।

যে কথা বলছিলাম; বাংলা ব্লগের আজকের যে উন্মেষ তার গোড়াপত্তনকারী ব্লগটির নাম সামহোয়্যারইন ব্লগ। যাদের রেজিস্টার্ড ব্লগারের সংখ্যা এখন প্রায় ৫ হাজার ৭০০। এই ব্লগটির পরপরই গড়ে ওঠে সচলায়তন, আমারব্লগ, মুক্তাঙ্গণ নির্মাণ ব্লগ, প্রথম আলো ব্লগ, নাগরিক ব্লগ, ক্যাডেট কলেজ ব্লগ, বন্ধু আমার ব্লগ, চতুর্মাত্রিক ব্লগ, সোনার বাংলা ব্লগ ইত্যাদি। সব মিলিয়ে ব্লগারের সংখ্যা ঠিক কতো তা বোধ করি কারো পরিসংখ্যানে নেই। হতে পারে ১০ হাজার। হতে পারে আরো বেশি। এই ১০ হাজার ব্লগার, অর্থাৎ ১০ হাজার বাংলা লেখালেখি করা মানুষের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই এখন লেখক। শুধুমাত্র কাগজে লিখে কাগজে বই ছেপে এই পরিমাণ মানুষ লেখক হয়ে উঠতেন তেমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সেক্ষেত্রে বলা যায় এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে লেখক বা লেখকের পর্যায়ে উন্নিত করেছে বাংলা ব্লগ। কিন্তু যে আশা আর সম্ভবনা নিয়ে এই ব্লগগুলো চলছে সেই আশা কি পুরণ হয়েছে? বাংলা ব্লগ কি তেমন কোনো বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছে? বাংলা ব্লগ কি সংবাদপত্রের মতো রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রের নিপীড়ন-নির্যাতনকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছে? এক কথায়- না। পারেনি। কেন পারেনি? ব্লগ মডারেটেড বলে? নাকি এসব লেখাটেখা রাষ্ট্রযন্ত্রের চাঁই বা কড়েবর্গারা পড়েটড়ে দেখেন না? নাকি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের পরিচালক শ্রেণি এটিকে কোনো গণমাধ্যম মনে করেন না? আসলে এর কোনোটিই নয়। ব্লগ তার ‘কাঙ্ক্ষিত’ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি তার বা তাদের নীতিহীনতার কারণে। অভীষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণে বিভ্রান্তির কারণে।

গত আট-দশ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্র বা সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে, মানবতার পক্ষে, নিপীড়িত শ্রেণিসমূহের পক্ষে বাংলা ব্লগ তেমন কোনো জোরালো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। চারদিক কাঁপিয়ে দেয়ার মতো আলোড়ন বলতে সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক করার কারণে একবার, আর একবার পিলখানা বিদ্রোহের সময়। এই দুবারই কেবলমাত্র বাংলা ব্লগ সামাজিক প্রচার মাধ্যম হিসেবে আলোচনায় এসেছিল। তাহলে কি ব্লগে যারা লেখেন তারা শ্রেণি সমন্বয়কারী নিরেট জড়বস্তু? বা নিপাট ভদ্রলোকটাইপ স্কেপিস্ট? না। তাও নয়। ওই যে বললাম, লক্ষ্য নির্ধারণে খামতি। আমি কী করতে চাই, আমরা কী বলতে চাই, কেন করতে চাই, কেন বলতে চাই, কতোটুকু বলা যেতে পারে, কতোটুকু বললে যে ক্ষতি হতে পারে তা মাথায় রেখে কতোদূর যেতে পারির মতো বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়নি। তেমন করে কেউ করেননি। সে কারণে কোনোটি হয়ে উঠেছে স্রেফ সাহিত্য আসর, কোনোটি আড্ডাবাজির ক্ষেত্র, কোনোটি গুরুগম্ভীর সমাজচিন্তা বহির্ভূত ইন্টেলেকচ্যুয়াল ক্লাবঘর।

ঠিক এই সময়ে মালয়েশিয়ার একটি ব্লগ সারা বিশ্বে প্রবল আড়োলন তুলেছিল। রাজদ্রোহের অভিযোগে মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় ব্লগার রাজা পেত্রার জেল হয়েছিল। মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় ব্লগার এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ৫৮ বছর বয়সী রাজা পেত্রা কামারুদ্দিনকে একটা পোস্ট লেখার জন্য রাজদ্রোহী অভিযুক্ত করে বিচারের পরে জেলে প্রেরণ করা হয়েছে।

ব্লগাররা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এ নিয়ে যদি মালয়েশিয়ার সরকার আদৌ দুশ্চিন্তা করে থাকতেন তবে সেটা এখন তারা দেখতে পাচ্ছেন। এটা এমন একটা দেশ যেখানে যে কোনো রাজনীতিবিদ যদি তাদের খাসির মাংসের মতো মূল্যও থাকে একটা ব্লগ খুলে বসেন, জেফউই এমন একজন মালয়েশিয়ান যে এই ধরনের ব্লগ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়েছেন এবং সংসদে সংস্কারের দাবি তোলার কথা সাম্প্রতিক নির্বাচনেও বলেছেন।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের বহুল পঠিত একটা ব্লগ আছে, যেমন আছে প্রধানমন্ত্রী হতে আশাবাদী আনোয়ার ইব্রাহিমেরও। অনলাইন ও এর বাইরে মালয়েশিয়ায় রাজা হচ্ছেন স্পষ্টভাষীদের মধ্যে একজন। রাজা পেত্রার (অথবা আরপিকে) মামলা সংসদেও আলোচিত হয়েছে। ব্লগার সংসদ সদস্যরা এটাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও ক্ষমতাসীন জোট সরকারের প্রতিশোধ হিসেবে অভিহিত করেছেন যারা সাম্প্রতিক নির্বাচনে ব্যাপক আসন হারিয়েছে। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো জনপ্রিয় ব্লগারদের বিজয়ী আসন দেখেছে ক্রমবর্ধমান স্বচ্ছতা এবং উপনিবেশ-পরবর্তী বর্ণ অঙ্গীভূতকারী মঞ্চে। মালয়েশিয়ান স্টার একটা বিষয় চিহ্নিত করেছে, এই প্রথম কোনো একজন ব্লগার রাজদ্রোহ আইনে অভিযুক্ত হলেন, এবং আরপিকে এখন ১৫০০ ডলারের উপরে জরিমানা অথবা তিন বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।

সানগাই বুলোহ কারাগারের সামনে মুক্তির জন্য মোমবাতি নিয়ে রাত্রি জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং কুয়ালালামপুরের ডাউনটাউনে নিশি জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরকেপির মুক্তির জন্য তৈরি ফেসবুকের একটা গ্রুপ খোলা হয়েছিল।

২০০৮ সালের মে মাসে মিশরের ব্লগার ও সাইবার অ্যাকটিভিস্টরা সরকারি নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং বেতন বৃদ্ধি ও শ্রেয়তর জীবনের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে মিশরের ব্লগার, সাইবার অ্যাক্টিভিস্ট এবং অ্যাক্টিভিস্টদের চরম মূল্য গুনতে হয়েছে। দাঙ্গাকারী, প্রতিবাদকারী ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ফলে ৬ এপ্রিল ধর্মঘটের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আন্দোলনের বিবরণ ওয়েবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে যে সমস্ত অ্যাক্টিভিস্ট তাদেরও নিপীড়ন করা হয়েছে।

৬ ও ৭ এপ্রিলের অস্থিরতার সময় মিশরের ব্লগাররা ঘড়ির কাটা অনুসরণ করে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করেছে কর্মজীবিদের বিক্ষোভে দেশটির টালমাটাল চিত্র, আল মহল্লা নামক একটা টেক্সটাইল মিলে হাজারের মতো লোকের দাঙ্গার খবর। এই বিক্ষোভে প্রথম হতাহতের ঘটনা সেখানে ঘটেছে, কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন, অসংখ্য আহত হয়েছেন ও অনির্দিষ্ট সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী, আয়োজক এবং স্রেফ দর্শকদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্লগ পোস্ট, ইউটিউভে ভিডিও, টুইটার ফিডস, ফ্লিকার সটস, ফেসবুক মেসেজ এবং আরো যতো অনলাইন মাধ্যম রয়েছে এসব ঘটনা সেখানে তারা তুলে ধরেছেন। গ্রেফতারের ছয় সপ্তাহ পরেও অন্তরীণ থাকা সহকর্মীদের অনতিবিলম্বে মুক্তি দেবার দাবি জানিয়ে এ বিক্ষোভ চলেছে। হয়রানি ও শারীরিকভাবে নিগৃহীত এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশের হাত থেকে মুক্তি প্রাপ্তরা নিজেদের দুর্দশার কাহিনী বিশ্বকে জানানোর জন্য অনলাইনের শরণাপন্ন হয়েছেন।

না। ঠিক এরকম দেশ কাঁপানো, রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো ঘটনা বাংলাদেশের কোনো ব্লগে ঘটেনি। এর পেছনে আর যে কারণই থাকুক, সবচেয়ে বড় কারণ বোধ করি শ্রেণি-চেতনা। বাংলাদেশের যারা ব্লগ লেখেন তারা কোনো না কোনোভাবে সমাজের একটু সুবিধাপ্রাপ্ত বা সৌভাগ্যবান এলিট কাতারে ধাবমান অ্যাম্বিশিয়াস অংশ। এরা ঠিক সেই মাপের অ্যাক্টিভিস্ট বা প্রতিবাদী আন্দোলনকারী নন। রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই থাকুক তা যে ব্লগ ব্যবহার করেও প্রচলিত ধারণার মতো করেই বলা যায়, প্রতিবাদ করা যায় সেটি হয় বোঝেন না, নয়তো নিজেদের সুবিধাবাদী শ্রেণি অবস্থানের কারণে ‘নিশ্চুপ নিরূপদ্রপ শান্তিকামী’ থাকতে পছন্দ করেন।

তারপরও যেটুকু ইতিবাচক হয়েছিল তাও শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না ফেসবুক এর কারণে। ব্লগে লিখতে যেমন খানিকটা হলেও পড়াশুনা করতে হয়, লেখার অভ্যেস করতে হয়, ফেসবুকে ওসবের বালাই নেই। ছোট ছোট বাক্যে মনের কথা বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমানোতে ফেসবুকের জুড়ি নেই। সেই ফেসবুকই এখন ব্লগের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে! অথচ হওয়া উচিৎ ছিল পরিপূরক।

এরই ভেতর একটি বড় ধরনের কাজ অবশ্যি বাংলা ব্লগে হয়েছিল এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলা ফন্ট নিয়ে দ্বন্দ্ব। প্রচলিত বাংলা ফন্ট বিজয়ের সঙ্গে বিপ্লবাত্মকভাবে উঠে আসা অভ্রর দ্বন্দ্ব। বিজয়-অভ্র দ্বন্দ্বটিই এযাবতকালের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্লগে আলোচিত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক ব্লগার এতে অংশ নিয়ে একটা সাইবার মুভমেন্ট গড়ে তুলেছিলেন।

‘বিসিসির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট তারেক বরকতউল্লাহ, যিনি জাতীয় ক-বোর্ডেও লেআউট ও বিজয় কি-বোর্ড বিতর্ক নিরসনের জন্য কাজ করছেন, তিনি বিজয় ও ইউনিবিজয় কি-বোর্ড নিয়ে চলমান বিতর্ক সম্পর্কে একটি সুসংবদ্ধ ধারণা দেন। জাতীয় কি-বোর্ডের সঙ্গে বিজয়ের যে বিতর্ক রয়েছে এবং এটি কীভাবে সমাধান হচ্ছে, সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, কম্পিউটারে বাংলাভাষা ব্যবহার প্রমিত করার জন্য জাতীয় কমিটি আছে। বিভিন্ন কি-বোর্ড নিয়ে চলা সম্প্রতি যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, কপিরাইট বিষয়ে এ ধরনের সমস্যা মীমাংসার জন্য এ কমিটির অধীনে এ বিষয়ক একটি সাব-কমিটি করা আছে। সেখানে এসবের সঠিক সমাধানের বিষয়টি দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের আছে অনেক সমস্যা ও অভাব। আছে অনেক সম্ভাবনাও। তাই এই দেশে মানুষের মুখের ভাষা লেখালেখি করা নিয়ে ব্যবসা না করে যদি এটির  লেআউট উন্মুক্ত করে দেন তবে বিজয় লেআউটের জনকের কথা দেশের মানুষ চিরকাল মনে রাখতো। পাশাপাশি অভ্র-এর নির্মাতাদেরও আরও বিনয়ী হওয়া ও বিজয় লে-আউটের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত ছিল। কারণ, অভ্র-র জনপ্রিয়তার একটি অনবদ্য কারণ কিন্তু ইউনিবিজয় লেআউটই! অভ্রর চেয়েও ভালো কিছু বিনামূল্যে কেউ যদি দেয় তবে অবশ্যই সে সমাদর পাবে। অভ্রর মতো সফটওয়ার আরও আসুক। আপাতত অন্তত অভ্র যেন টিকে থাকে এবং মুক্ত সোর্স সফটওয়্যার হিসেবে প্রকাশ পাক।

বলাবাহুল্য অভ্র টিকে আছে, এবং ভালোভাবেই টিকে আছে শুধু নয়, তার প্রসারও ঘটছে দ্রুত গতিতে। এই বিজয়-অভ্র দ্বন্দ্ব চলাকালিন অভূতপূর্ব সাড়া পড়েছিল ব্লগস্ফিয়ারে। শত শত ব্লগার প্রাতিষ্ঠানিক একচেটিয়াত্বকে চ্যালেঞ্জ করে তৈরি হওয়া অভ্রর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অনেক কারণেই এই মুভমেন্টটি ছিল ব্লগস্ফিায়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

তা বাদে ২০১০ সালে প্রবর্তিত ডয়েচে ভেলে আয়োজিত সেরা বাংলা ব্লগ পুরস্কার ঘোষণা ছিল ব্লগ ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রথমবারের মতো এ আয়োজনে বাংলাদেশের ব্লগার আলী মাহমেদ জিতে নিয়েছিলেন প্রথম পুরস্কারটি।

বেস্ট অফ ব্লগস বা সেরা ব্লগ প্রতিযোগিতার ষষ্ঠ আসরের চূড়ান্ত বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল জার্মানির আন্তর্জাতিক সম্প্রচার কেন্দ্র ডয়চে ভেলে থেকে। আলী মাহমেদের ব্লগ উঠে এসেছিল শ্রেষ্ঠ বাংলা ব্লগ হিসেবে। এছাড়া ইংরেজি ব্লগ ‘উশাহিদি’ জিতে নিয়েছিল শ্রেষ্ঠ ওয়েব ব্লগ-এর পুরস্কার। ১৫ এপ্রিল জার্মানির রাজধানী বার্লিনে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলন থেকে ঘোষণা করা হয় বিজয়ীদের নাম।

এই প্রথম, বিশ্বের অন্যতম বড় এই আসরে যুক্ত হয় বাংলা ভাষা। চূড়ান্ত বিজয়ী নির্ধারণের সময় বাংলা ভাষার বেশ কয়েকটি ব্লগ ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছিল। ভাষা অনুযায়ী সেরা বাংলা ব্লগের পুরস্কারটি জয় করেছেন আলী মাহমেদ। এই প্রসঙ্গে বাংলা ভাষার জুরি বাংলাদেশের অন্যতম ব্লগ সাইট সামহোয়ারইন ব্লগ ডট নেট থেকে গিয়েছিলেন সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা।

এবছর বিজয়ী নির্ধারণের ব্যাপারটা এতো সহজ ছিল না। কারণ, বেস্ট অফ ব্লগস (সংক্ষেপে ববস্) এর এবারের প্রতিযোগিতায় শুধু যে ১১টি ভাষা অংশগ্রহণ করেছিল- তাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জমা পড়েছিল মোট ৮,৩০০টি ব্লগ।

মোটামুটি এই হচ্ছে বাংলা ব্লগের উত্থান থেকে ক্রমবিকাশের সংক্ষিপ্ত ধারা। কিন্তু শুধু এতোটুকুতেই তো বাংলা ব্লগের থিতু হবার কথা ছিল না। বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী বাঙালি কোনো দিনই অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ায়নি (যদিও এই ধারণাটি একপ্রকার বাগাড়াম্বর মাত্র), সেই বাঙালি কেন কেবল লেখক-পাঠক হয়েই বিশ্ব চরাচরের আনাচে-কানাচে নিজেদের ঐতিহ্যের কথা, বিজয়ের উপাখ্যান ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাচ্ছে না? প্রথমে যে শ্রেণি অবস্থানের কথা বলেছি তার বাইরেও আরও কারণ আছে। সে কারণগুলোর অন্যতম ব্লগকে বা ওয়েবসাইটকে এখনো আন্দোলন সংগ্রাম বা সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ভাবতে না পারা, বা ভাবতে না শেখানো। এজন্য যেমন ব্লগের কর্ণধাররা দায়ী, তেমনি সমানভাবে দায়ী ব্লগ ব্যবহারকারীরা। মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা নেট সংযোগে খরচ করে তারা কেবল চ্যাটরুমের আবহে আবদ্ধ থাকবেন, না ব্লগকে সামাজিক ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে পরিচালিত করবেন, তুলে ধরবেন সেটি মোটাদাগে পরিষ্কার বিভাজন বা নির্ধারণের সময় এসে গেছে।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক

বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]