শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন


প্রকাশিত: ১২:২০ পিএম, ১৭ মে ২০১৫

১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা-বিরোধী দেশি-বিদেশি চক্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এদেশের মানুষের হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর দক্ষিণ এশিয়ার অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির অস্তিত্বকেই প্রায় বিপন্ন করে ফেলে। এই নতুন রাষ্ট্রের চার রাষ্ট্রনীতি, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের আদর্শকে কেটেছিঁড়ে একে একটি ধর্মপ্রবণ পাকিস্তানি ধাঁচের ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার প্রয়াস চালায়। ফলে সর্বাধুনিক চিন্তা-চেতনার ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রটি অধঃপতনের খাদে এসে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় এদেশের মানুষের হাজার বছরের স্বপ্নের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সম্ভাবনা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবর্তে দেখা দেয় সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা, অস্থিরতা এবং সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের খেলা।
পাঁচ-ছয় বছর ধরে সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তীব্রভাবে ক্ষমতার লড়াই ও বহু পাক্ষিক হত্যা-খুন-গুম ও হানাহানি এবং প্রতিপক্ষকে দেশছাড়া করার প্রক্রিয়ার মধ্যে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ‘হাঁ-না’ গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি দখল করে নেন। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের ঘৃণিত স্বৈরশাসক হিটলারও এ ধরনের গণভোটের মাধ্যমে তার ক্ষমতাকে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু গণবিচ্ছিন্ন এবং নিয়মতান্ত্রিকতাবিহীন অবস্থায় কোনো স্বৈরশাসকই শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না। হিটলার বা জিয়াউর রহমানও তা পারেননি।

জেনারেল জিয়া প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আমাদের এই গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রটির চার রাষ্ট্রনীতি ও মূল আদর্শসমূহ জলাঞ্জলি দিয়ে তথাকথিত গণতন্ত্রের লোকভুলানো কৌশল অবলম্বন করেও দেশে শান্তি-স্বস্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেননি এবং নিত্যদিন বহু তরুণের নিখোঁজ হয়ে যাওয়াসহ সেনাবাহিনীর দুই-আড়াই হাজার লোক হননের পরও তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হননি। তার আমলে সেনাবাহিনীর ভেতরেই ক্ষমতার লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করে এবং প্রায় ১৮টির মতো ব্যর্থ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।

দেশ যখন এরকম একটি জটিল-কুটিল চক্রান্ত-প্রতিচক্রান্তের আবর্তে নিমজ্জিত ঠিক তখনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা মহান পিতার আজীবনের সংগ্রাম ও সাধনায় প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক চার রাষ্ট্রনীতি এবং বিপুল-ব্যাপক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮১ সালের ১৭ই মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় দুষ্টচক্র ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী শক্তির রাষ্ট্র ক্ষমতায় জেঁকে বসা এবং তাদের দুঃশাসনের ফলে ত্যক্ত-বিরক্ত মানুষ বাংলাদেশের গণমানুষের প্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নতুন সভাপতিকে গ্রহণ করার জন্য বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আশা-প্রত্যাশায় উদ্দীপ্ত বিপুল মানুষের ঢল নামে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। বহু বর্ণিল ব্যানারসজ্জিত দীপ্ত শ্লোগানমুখর অসংখ্য মিছিলের সমাবেশ ঘটেছিল বিমানবন্দরে। উপস্থিত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার হাস্যধ্বনি, করতালি ও আবেগঘন ফুলেল শুভেচ্ছায় আওয়ামী লীগের নতুন সভাপতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি ঐতিহাসিক মর্যাদা এবং নতুন রাজনৈতিক আশা-আকাক্সক্ষার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।

দুই
রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও শেখ হাসিনা সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন না। তবে ছাত্র-রাজনীতির অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় দেশের সামগ্রিক রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর একটা সুস্পষ্ট ধারণা যে ছিল সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ছ’বছর বিদেশে বাধ্য হয়ে অবস্থান করার সময়ে সামরিক স্বৈরাচারী সরকার আওয়ামী লীগকে নানাভাবে কোণঠাসা ও ধ্বংস করার অপতৎপরতা রুখে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই তিনি পিতার প্রত্যয়দীপ্ত সাহসের উত্তরাধিকার ও পরিস্থিতি মোকাবেলার পরিচ্ছন্ন দক্ষতা নিয়েই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন দেশের সর্বেসর্বা। তাদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে নানা কৌশলে বাধাগ্রস্থ করারই শুধু চেষ্টা করা হয়নি বহুভাবে আওয়ামী লীগ ও তাঁকে নিন্দিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়। ভরসার কথা, দেশের মানুষ সে-সব বিশ্বাস করেনি। তারা বরং শেখ হাসিনাকেই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নে সক্ষম নেত্রী হিসেবে লক্ষ লোকের বিপুল সংবর্ধনার মাধ্যমে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

নিজ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করে জেনারেল জিয়া জাতি ও বিশ্বকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি ছদ্ম চেহারা দেখানোর লক্ষ্যেই সামরিক ছাউনিতে নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করে রিমোট কন্ট্রোলের নির্বাচনে নিজ দলকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে অন্য কয়েকটি দল থেকেও দু-চারজন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করে এনে আওয়ামী লীগকে মাত্র ৩৯টি আসনে জিততে দিয়ে গুরুত্বহীন ও বিপর্যস্ত করে রাখে। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগকে পূর্বের মতো গণসমর্থনসহ একটি শক্তিশালী জাতীয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করা এবং দেশে গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকার নিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন নেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাÐ শুরু করেন।

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে জীবনের ঝুঁকি ছিল। কিন্তু তিনি সে-ঝুঁকিকে গুরুত্ব না দিয়ে দেশে ফেরার এক সপ্তাহ আগে ১১ই মে তারিখে নিউজ উইকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত থেকে বঞ্চিত হয়।’ তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য সম্পর্কে ওই সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারী তরুণ নেত্রী বলেন, ‘যেসব কাজ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে আমি বিবেচনা করি তার মধ্যে থাকবে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করে দলের নেতাকর্মীরা আমার মহান পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আমি তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার প্রত্যয় নিয়েই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবো।’

শেখ হাসিনা তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী দেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত চার রাষ্ট্রীয় নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।

তিন
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে (ক) বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এ সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে।’

শেখ হাসিনা ‘বিপন্ন গণতন্ত্র লাঞ্ছিত মানবতা’ শীর্ষক তাঁর একটি লেখায় সংবিধানের উপর্যুক্ত অংশটি উদ্ধৃত করেছেন। এখান থেকেই তাঁর সংবিধানের প্রতি আস্থা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা কোথা থেকে কীভাবে আসবে তা উপলব্ধি করা যায়। উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের সংবিধানে ওই অংশটি মৌলিক আইনের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংবিধানের প্রতি শাসকদের উপেক্ষা-অবহেলা এবং গণতন্ত্রকে কখনোই নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত না করায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোয় মানবিক অধিকার, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক জীবনধারা গড়ে তোলার সুযোগ নেই দেখেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়মতান্ত্রিক পন্থা ও বিপ্লবী ধারার এক স্বকীয় কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। বাংলাদেশেও সামরিক স্বৈরশাসক ও অগণতান্ত্রিক শক্তির রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কব্জা করে রাখার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে ধারাবাহিকভাবে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং প্রবল গণআন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে সাফল্য লাভ করেছেন। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার রাজনীতির মধ্যে কিছু মৌলিক সাজুয্য ছাড়াও একটা জায়গায় মিল লক্ষ্য করি, সেটি হল সাহস। বঙ্গবন্ধুর সেই অসীম সাহসের কিছুটা শেখ হাসিনাও উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন।

উদাহরণ হিসেবে ১৯৮৭ সালে ঢাকায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যে অগ্নিঝরা মিছিলে নূর হোসেন শহীদ হন সেই মিছিলের একেবারে ভেতর থেকে নেতৃত্ব দেয়া শেখ হাসিনার অসম সাহস এবং ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সমাবেশ ও মিছিলে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে যে গণহত্যা চালানো হয় তার উল্লেখ করা যায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে ঢাকায় তাঁর সমাবেশে গ্রেনেড হামলাও স্বাধীনতা বিরোধী ফ্যাসিস্ট খুনি চক্রের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতারই উদাহরণ। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের এইসব ভয়ংকর হত্যা-প্রচেষ্টার মধ্যেও শেখ হাসিনা তাঁর রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন অকুতোভয়ে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দেশবাসীর কল্যাণের জন্য প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে থেকেও এমন অঙ্গীকারদীপ্ত রাজনৈতিক সংগ্রামের নজির বাংলাদেশে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর জীবনেই দেখা যায়।

চার
গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বিপুল মানুষকে পক্ষভুক্ত করতে সক্ষম হন এবং স্বৈরশাসক এরশাদের ভোট কারচুপি ও মিডিয়া ক্যুর নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে রাখার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেন। তখন অন্য কয়েকটি দলও ভিন্ন মঞ্চ থেকে এই সংগ্রামে যুক্ত হওয়ায় আন্দোলন গুণগত স্তরে উঠে আসে। ফলে বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রপতি এরশাদ ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে ১৯৯০ সাল থেকে বহুপাক্ষিক গণতন্ত্রের সূত্রপাত হয়। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ভূমিকা ছিল প্রবল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি দেশের গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম লক্ষ্য নির্ধারণ করেন বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নই হবে তাঁর গণতান্ত্রিক শাসনের মূলভিত্তি। তিনি তাঁর একটি লেখায় বলেছেন, ‘আমি মনে করি আমাদের রাজনীতির একটা পরিবর্তন প্রয়োজন।... আন্দোলন হবে সমাজ সংস্কারের জন্য, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য। আর এ উন্নয়ন মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়। এ উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য, সমাজের অধিকাংশ মানুষ যারা বঞ্চিত, জীবনের নানারকম চাহিদা মেটাতে পারে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা হতে বঞ্চিত.. বঞ্চিত একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই থেকে। বঞ্চিত কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে।’ তাদের সামগ্রিক উন্নয়নই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অংশ। উন্নয়নকে এভাবে বিন্যস্ত করতে পারলে দারিদ্র্য দূরীকরণও সম্ভব এবং সামাজিক স্বস্তি ও শান্তিও তাতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই লক্ষ্য নিয়েই তিনি দেশ শাসনের মৌলনীতি নির্ধারণ করেছেন।

আমাদের এই অঞ্চলের স্থিতিশীল সামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে আরো অনেক বেশি কার্যকর ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে দেখি। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তি এই ব্যাপারে বিশ্বে একটি অনন্য নজির হিসেবে উল্লেখ করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পাহাড়ি মানুষকে তাদের বসতি, সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণ ও শান্তিপূর্ণভাবে বাঁচার অধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর স্বৈরাচারী সামরিক সরকার সেখানে যে দুঃশাসন ও নিপীড়ন চালালো তাতে সেখানে শুধু স্বাভাবিক শান্তি বিনষ্ট হলো না, শত শত শরণার্থি দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করলো এবং হাতে অস্ত্র তুলে নিলো তাদের অধিকার রক্ষার দাবিতে। এতে শুধু পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি বিনষ্ট হলো তাই নয়, এর প্রভাব পড়লো সারাদেশে এবং দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য তা হয়ে উঠলো এক অস্বস্তির বিষয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে গেলো যে বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত হলো বাংলাদেশ। এমন একটি অবস্থায় ১৯৯৭ সালের ২২শে ডিসেম্বর শেখ হাসিনা পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করে ওই অঞ্চল এবং গোটা দেশে যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করলেন তা গোটাবিশ্বকেই অভিভূত করে। শেখ হাসিনার এই রাষ্ট্রনায়কোচিত উদ্যোগ এবং শান্তিচুক্তি স্থাপনে তাঁর সাফল্য শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয় গোটা বিশ্বেই তাঁকে শান্তি ও উন্নয়নের রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

শুধুই শান্তিচুক্তি নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আরো যে কতগুলো অমীমাংসিত আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান করলেন তার জন্যও বিশ্বব্যাপী তিনি প্রশংসিত হলেন। ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর ভারতের সঙ্গে দীর্ঘকালের অমিমাংসিত গঙ্গার পানিচুক্তি স্বাক্ষরও তাঁর এক ঐতিহাসিক সাফল্য। আন্তর্জাতিক এই সমস্যার সমাধানের সমান্তরালে দেশেও তিনি উন্নয়নমূলক বহু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৯৭ সালের ২৩শে জুন উত্তর বাংলার সঙ্গে পূর্ব বাংলার যোগাযোগে শত বছরের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে তিনি উদ্বোধন করলেন দেশের সর্ববৃহৎ ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু সেতু। ২০০০ সালে তাঁরই উদ্যোগে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিবস ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেল। ১৯৯৬ সালের তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ হিসেবে পরিগণিত হলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১’র শাসনকালে এ ধরনের আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিশেষ করে পার্বত্য শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠার সাফল্যের জন্যে ১৯৯৯ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাকে ইউনেস্কোর শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর এই অনন্য সাফল্যের কারণেই তিনি ‘ডটার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান। উন্নয়ন, দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও যাতায়াতের অবকাঠামো নির্মাণে সাফল্য, সহায়-সম্পদহীন দুঃখী মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি সাধন, কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অগ্রগতি, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি, নারী উন্নয়ন প্রভৃতি কারণে তিনি জাতীয় নেতা থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনের একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন। তাঁর এই সাফল্য একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় না। সেজন্যই শুধু ইউনেস্কোর ‘ফেলিক্স হুফে শান্তি পুরস্কার’ নয়, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাফল্য লাভ করার জন্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘সেরেচ পদক’ নরওয়ের মহাত্মা গান্ধী ফাউন্ডেশনের ‘গান্ধী পদক’ প্রভৃতি লাভ করেন। আরো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দারিদ্র্য বিমোচনে শেখ হাসিনার সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরে থাকা স্বত্তে¡ও ইতালিতে অনুষ্ঠিত জি-৮ সম্মেলনে তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এক বিরল সংবর্ধনা প্রদান করে। ক্ষমতার বাইরে থাকা এশীয় দেশের কোনো নেতাকে এভাবে আমন্ত্রণ জানানোর নজির নেই। তিনি যে বিশ্বের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতার আসনে স্থান লাভ করেছেন এই ঘটনা তারই প্রমাণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামরিক সমস্যার রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় তিনি যে সাফল্য লাভ করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে এটি এক অনন্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সবশেষে কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় দুটি আমি উল্লেখ করতে চাই তা হলো, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী উন্নয়ন কর্মসূচিতে শেখ হাসিনার বিশাল সাফল্য এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর নিষ্ঠা ও অঙ্গীকার একজন ভবিষ্যৎমুখী নেতা হিসেবে তিনি যে সম্ভাবনাময় ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা আমাদের দেশে অনুন্নত সামাজিক কাঠামো এবং সংস্কারাচ্ছন্ন মানস জগতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। সম্প্রতি মায়ানমার এবং ভারতের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের জয়লাভ এবং ভারতের সঙ্গে সীমান্তচুক্তির বাস্তবায়ন তাঁর অসাধারণ নেতৃত্ব এবং ক‚টনৈতিক পারদর্শিতার পরিচায়ক। মূলত দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ায় একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠা আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত।

আরেকটি বিষয় আলোচনা না করলে শেখ হাসিনার পরিপূর্ণ পরিচয় উদ্ঘাটিত হয় না। রাজনৈতিক শত ব্যস্ততার মধ্যেও লেখালেখির ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা আমাদের বিস্মিত করে। তাঁর লেখায় রাজনৈতিক নানা বিষয় যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি তাঁর জীবনদর্শন এবং কর্মকৌশল ও কর্মনীতির প্রতিফলনও বটে। তাঁর লেখার ভাষায়ও পটুত্ব ও পরিশীলন লক্ষ্য করা যায়। লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা কেউই বোধহয় গুরুত্বের সঙ্গে লেখালেখি করেন না। বড় ব্যতিক্রম শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা পিতার ওই উত্তরাধিকারটিও যে পেয়েছেন সেটি আমাদের জন্য এক পরম পাওয়া। আসলে বঙ্গবন্ধুর মতোই বাংলার মাটি-মানুষ এবং সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর যে গভীর সখ্য তা আংশিক পারিবারিক সূত্রে এবং বাকিটা নিজের গভীর বোধের ফলেই অর্জিত হয়েছে। তিনি যে বিষয়টি তাঁর মহান পিতার মতো অনুভব করেছেন তা হলো দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক ঘটাতে না পারলে শক্তিশালী রাজনীতির ভিত্তি নির্মিত হয় না। সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় সংযোগের ফলেই তাঁর নেতৃত্ব এতটা মৃত্তিকাপ্রোথিত। এ কারণেই রাজনৈতিক বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার অনন্য নজির সৃষ্টি করে তিনি অন্য প্রতিপক্ষ দলসমূহকে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত করে বাংলাদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।

শেখ হাসিনা শুধু আমাদের দেশ বা আমাদের এই অঞ্চলেরই নন, গোটাবিশ্বেরই একজন বিশিষ্ট রাষ্ট্রনেতা হিসেবে দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। তিনি তাঁর আদর্শ, পরিকল্পনা ও জীবনবোধের আলোকে বহুক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, সংস্কারসাধন এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধন করে বাংলাদেশকে বিশ্বে দিয়েছেন অপার সম্ভাবনার দেশ হিসেবে এক নতুন ভাবমূর্তি। এজন্যই বিশ্বের সমাজচিন্তক এবং অর্থনীতিবিদেরাও বাংলাদেশের এত দ্রুতগতিতে সামনে উঠে আসা এবং সামাজিক সূচক ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারে চিত্তাকর্ষক অগ্রগতি লাভ করায় বিস্মিত হয়েছেন এবং তাঁরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যেই একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে।’ এই সাফল্যের রূপকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফলেই বাংলাদেশ সামাজিক ও মানবিক বহুসূচকে ইতিমধ্যে ভারত, পাকিস্তানসহ বহুদেশকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় ১৩১৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভ ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গড় আয়ু বেড়েছে। বিদেশে খাদ্য রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে। আর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রেও যে সাফল্য এসেছে তা বিস্ময়কর।

আজকের এই দিনে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।

লেখক: মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

এইচআর/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।