দৃঢ় হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক


প্রকাশিত: ১০:১৭ এএম, ০২ জুন ২০১৫

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয় বছরে পা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি তিনি ফোর্বস ম্যাগাজিনের করা বিশ্বে শক্তিশালী নারীদের ১০০ জনের তালিকায় ৫৬ নম্বর জায়গাটি দখল করে নিয়েছেন। এ দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারেরও এক বছর হয়ে গেছে। মোদি তার কাজ আর সততার মাধ্যমে ভারত এবং বিশ্বজুড়ে নন্দিত। ভারতের সাধারণ জনগণের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং সমর্থনও পাচ্ছেন।

ধারণা করা হচ্ছে মোদির আসন্ন বাংলাদেশ সফরে দু`দেশের যুগলবন্দী সম্পর্ককে আরো সতর্কভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সম্প্রতি মোদির সঙ্গে বাংলাদেশ সফর নিয়ে কলকাতায় এক আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। মমতাই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তবে সবকিছু ভুলে তিনি মোদির সফরসঙ্গী হিসেবে নামি লিখিয়েছেন।  

তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি মমতার পক্ষ থেকে। তার পার্টি সূত্র জানায়, মমতা শুধুমাত্র স্থলসীমান্ত চুক্তির স্বাক্ষী হতেই মোদির সফরসঙ্গী হচ্ছেন। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি বরাবরের মতোই নীরব ভূমিকা পালন করে আসছেন।  

মোদি সরকার উদারনীতি নিয়ে মমতার মধ্যস্ততায় ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটি আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। আর তাতে আলোচকরা মনে করছেন মোদির সঙ্গে সফরসঙ্গী হিসেবে মমতা ঢাকায় এসে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে সাড়া দিতে পারেন।

মোদি ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভূটান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। বাংলাদেশ সেই হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ দেশ হচ্ছে মোদির সফরের তালিকায়। ভারতের বৈদেশিক নীতি অনুযায়ী, মোদি সরকার যখনই সার্কভুক্ত কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তখন সবাইকে তিনি কোনো না কোনোভাবে খুশি করেছেন। এটি প্রতিবেশী দেশসমূহের প্রতি ভারত সরকারের একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।

মোদি এ পর্যন্ত ১৮টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এগুলোর মধ্যে শক্তিধর দেশ যেমন রয়েছে, তেমনি কম শক্তিশালী দেশও রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দ্বীপসমূহ রয়েছে তার সফরের আওতায়। এ সকল দেশসমূহের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে উজ্জীবিত করতেই মোদি উদারনীতি গ্রহণ করেছেন।

তবে ভারতের সমালোচকরা একমত হয়েছেন যে, মোদি সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে ফারাক বেড়ে চলেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে কিছু সন্দেহও প্রতীয়মান হয়েছে যে, মোদি সরকারের কিছু বিদেশ নীতিতে সফলতা এসেছে। আর অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কারে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা নিয়ে এখানে তেমন সাফল্য দেখাতে পারেননি তিনি। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ঐক্য গড়ে তোলা মোদি সরকারের নীতিতে এখন পর্যন্ত দুঃসাধ্য ব্যাপার।

দু’দেশের প্রধান দুই চুক্তি; স্থলসীমান্ত ও তিস্তা পানি বণ্টন বিষয়ে মোদি প্রথমে বাংলাদেশ সফরে আসতে চাননি। স্থলসীমান্ত বিল ভারতের সংসদে একদম নিপূণভাবে পাস হয়েছে। যদিও আসামের বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ এতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন।

তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে মমতা যদি নিশ্চয়তা দিতেন তাহলে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর আরো বেশি সাফল্যময় হয়ে থাকতো। তবে কেন্দ্র এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও পশ্চিমবঙ্গর জন্য বিশেষ অথনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণার মাধ্যমে মমতাকে চুক্তির টেবিলে আনা সম্ভব হতে পারে।

এ দিকে হাসিনা সরকারের জন্য স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন এখন মাত্র সময়ের ব্যাপার। যদিও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এখনো ঝুলন্ত অবস্থাতেই থেকে যাচ্ছে। মোদির সফরে যদি তিস্তা চুক্তি ঘোষণা করা হয় তাহলে হাসিনা সরকারের জন্য এটি তার বিদেশ নীতির সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হবে।

আর যদি তিস্তা চুক্তি নাও হয়, তারপরও স্থলসীমান্ত চুক্তির সাফল্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনা তার সমালোচকদের উপযুক্ত জবাব দিতে পারবেন। যারা দীর্ঘদিন ধরে ভারতমুখী সম্পর্কের কারণে হাসিনা সরকারকে আক্রমণ করে আসছেন।   

বাংলাদেশের ক্ষতাসীন দল আওয়ামী লীগ এমনিতেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপাক সমালোচনার স্বীকার। আর গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বয়কটের পর বিএনপি এবং বিরোধী জোট এখনো আন্দোলনরত অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশে চলমান আরেকটি আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মানবপাচার। মানবপাচার কীভাবে রোধ করা যায় সে বিষয়ে হাসিনা এবং মোদি সরকার এক সঙ্গে কাজ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এর সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে দু’দেশই। কারণ এ ইস্যুতে দু’দেশর সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
 
মানবপাচার ইস্যুতে বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায় তাহলে ভারত এ অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে একটি গ্রুপ গঠনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে এবং আধুনিক দাসত্ব প্রথা মানবপাচার রোধে কাজ শুরু করতে পারে।

এছাড়া দু’দেশের মধ্যে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা দূর করে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ব্যবস্থা আরো সহজতর করা হতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা এবং ট্রানজিটের বিষয়ে স্থায়ী সমাধানে আসতে হবে।  

মোদির সফরে বাংলাদেশের রেল কাঠামোর উন্নয়ন, নদীখনন, বিদ্যুৎখাত, পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং আরো বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক বাণিজ্য বৈষম্য রয়েছে। বাংলাদেশ আমদানি করে বেশি আর ভারত রফতানি করে বেশি। সীমান্ত দিয়ে অবাধে ভারতীয় ফেনসিডিল প্রবেশের বিষয়েও উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্যও ব্যাপক সাফল্য বয়ে আনবে। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিদেশীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনা হতে পারে মোদির সফরে।

লেখক : বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও পররাষ্ট্র সচিব। লেখাটি ভারতের ট্রিবিউন ইন্ডিয়া অনলাইন থেকে অনুদিত।

বিএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।