‘মাননীয়’ সম্ভাষণ সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর সবিনয় উচ্চারণ

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান , সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা
প্রকাশিত: ০৯:০৭ পিএম, ১৬ মে ২০২৬

একটি ছোট্ট শব্দ ‘মাননীয়’। রাজনীতি বা ক্ষমতার প্রশ্নে এই বিশেষ্য সম্বোধন চর্চা যুগ যুগ ধরেই সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়ে বসেছে। অতীতে এই শব্দটির বহুল ব্যবহার কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। আর জবাবদিহিহীন কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা মাত্রই ক্ষোভের আঁচড় বসায়। দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক রূপান্তরযাত্রায় এই শব্দটি তাই সংগতিপূর্ণ নয় মোটেও। আলসারের মতো বাসা বাঁধা এই শব্দ জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের জন্য ভয়ানক। এটি উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে যতো না শ্রদ্ধার তার চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে জাহির করে। নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে নিজের নামের আগে ‘মাননীয়’ শব্দটি সম্বোধন না করতে পুনরায় অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মঙ্গলবার (১২ মে) মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে মতবিনিময় অনুষ্ঠানের প্রশ্নপর্বে একজন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করার আগে সম্মানসূচক মাননীয় সম্ভাষণের জবাবে ‘নো মাননীয় প্লিজ’ উচ্চারণ করেন তারেক রহমান। সবিনয়ে তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘দয়া করে মাননীয় বলার দরকার নেই, শুধু প্রাইম মিনিস্টার বললেই হবে’। এর মাধ্যমে দেশের চলমান সম্বোধন সংস্কৃতিতে বড় রকমের পরিবর্তনের বার্তা দিলেন সরকারপ্রধান। অসচ্ছতার সর্বগ্রাসী থাবা নয়, সুস্থ ও স্বচ্ছতার রাজনীতির ধারায় বিশ্বাস করেন। তিনি চিরায়ত সম্বোধন সংস্কৃতি থেকে এই শব্দটি বাদ দিয়ে নিজেকে ক্ষমতার দাম্ভিকতার পরিবর্তে উল্টো জনগণের প্রতি নিজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনুভূতিকেই জাগ্রত করেছেন। সাধারণের সঙ্গে নিজেকে গেঁথেছেন বিনি সুতোর মালায়।

ভাষার সংযত ব্যবহারে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও শিষ্টাচারকে লালনের মধ্যে দিয়ে বিশ্বাস ও নীতির প্রশ্নে দেশ গড়ার সংগ্রামে বাবা-মা’র মতোই একজন তারেক রহমানকে করে তুলেছে আপসহীন। একাধিকবার ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেও চলতি বছরের শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানী শেরাটন হোটেলে ঢাকার একজন সাংবাদিক নেতা বিএনপির প্রধানকে ‘মাননীয়’ বলার প্রতিক্রিয়ায় তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘দয়া করে আমার নামের আগে মাননীয় সম্বোধন করবেন না।’ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও একই ধারাবাহিকতা জারি রেখেছেন। তার এই অনন্য বিনয় গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতেও তাকে করে তুলেছে যুগশ্রেষ্ঠ। প্রমাণ করেছেন ক্ষমতা তার জন্য কেবলই সেবা ও ত্যাগের এক মহান দায়িত্ব। এজন্য জনগণের কাতারেই নিজেকে রাখার চেষ্টা করেছেন। আগেভাগেই তাড়িয়েছিলেন রাজনীতিতে কদমবুসি সংক্রামক রোগ বিশেষকেও। স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গিতায় আত্মসম্মান ও নৈতিকতার এই অবক্ষয় থেকেই বের করতে চান রাজনীতিকে। এটি ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়া নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তনের অনন্য এক উপাদান, যা সবার জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

মানুষ মাত্রই গভীরভাবে অনুকরণপ্রবণ। হাল সময়ের রাজনীতি শিক্ষার বদলে বশ্যতা উপহার দিয়েছে। নেতা, সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সৌজন্যমূলক বা সম্মানসূচক সম্ভাষণে ‘মাননীয়’ শব্দটির ব্যবহার বহুলচর্চিত। এর পেছনে কোনো সাংবিধানিক বা সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা যদিও নেই। তবে এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত রীতিও বটে! কেউ বক্তব্যের সুযোগ পেলেই এই শব্দের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আনুগত্যের মানদণ্ডে নীতি-নৈতিকতা সেখানে হয়ে উঠে অনুপস্থিত। একটি মানবিক ও অন্তর্ভূক্তিমূলক দেশ গড়ে তুলতে হলে সরকারপ্রধানের এই শব্দের ব্যবহার রোধ কেবল প্রতীকী অর্থেই নয় কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দিতে পারে সহনশীলতার বার্তা।

সাধারণ চোখে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের বড় হাতিয়ার ‘রাজনীতি’। একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে সততাই মূলত রাজনৈতিক নৈতিকতার মেরুদণ্ড। এই বিষয়ে মতভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু এ কথাটি যৌক্তিক দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পন্থা হচ্ছে রাজনীতি। দেশের স্বার্থ বড় করে দেখা গণমানুষের কল্যাণে নিবেদিত একজন রাজনীতিকের নির্মোহ জীবন যেখানে দেশপ্রেমের মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। অনেক সময় স্বার্থপরতার রাজনীতির চরম খেসারত দিতে হয় দেশকে। ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার বন্দোবস্ত প্রকারান্তরে ব্যর্থতা ও পারস্পরিক আস্থাহীনতা তৈরি করে; যা ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসে। এক্ষেত্রেও একটি টেকসই ও যৌক্তিক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

একজন প্রজ্ঞাবান, দৃঢ়, সংযত ও দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তাধারার তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বক্তব্য কোন ভাষণ নয় ঠিক যেন সুদীর্ঘ কথোপকথন। যেখানে আত্মম্ভরিতা বা অহংকারের কোনো ছোঁয়া নেই। বলিষ্ঠ আত্মবিশ্বাস থেকেই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চারণে বলেছেন- ‘দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’ ‘লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট’ নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রের রূপান্তরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দূরদর্শী চিন্তার সমন্বয় খুঁজে পেয়েছেন ঢাবির শিক্ষার্থীরা। যার মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীল আচরণ। যিনি বিরোধীকে শত্রু হিসেবে না দেখে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মানসিকতা পোষণ করেন। তার জীবনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য লুকিয়ে রয়েছে তার সরলতায়। স্বভাবতই এ কারণেই ক্ষমতানির্ভর ‘মাননীয়’ সম্বোধন বা সম্ভাষণ তার অপছন্দ। এমন একজন সরকারপ্রধানের কথাবার্তা ও আচরণ থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম শিখবে এবং অনুপ্রাণিত হবে। তার এই জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতিই পারবে দেশের টেকসই উন্নয়নের পথ মসৃণ করতে।

লেখক : পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।