মোদির বাংলাদেশ সফর এবং ক্রিকেট কূটনীতি


প্রকাশিত: ১০:৩৪ এএম, ০২ জুন ২০১৫

নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহলে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। গণমাধ্যমে মোদি-ই আপাত শিরোনাম। টক শো-র আলোচনার বিষয়ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মোড়কে সেই নরেন্দ্র মোদি। মোদির বাংলাদেশ সফর দু’দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে সেটা পরের বিষয়। কিন্তু তার আগে এই সফরের গায়ে এঁটে গেছে ‘ঐতিহাসিক’-শব্দটা। এই সফরের প্রেক্ষাপট উঠে আসছে ইতিহাসের পাতা থেকে। একচল্লিশ বছর আগে ‘মুজিব-ইন্দিরা’ চুক্তির অনেক কিছু কাগজের পাতা থেকে বাস্তবের মুখ দেখতে যাচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে। যাকে কেউ দাবি করছেন ক্ষমতাসীন সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ মনে করছে ছিটমহল বিনিময়সহ স্থলসীমান্ত চুক্তি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ফসল। আমলারা মনে করছেন, নরেন্দ্র মোদির এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন হতে যাচ্ছে; তার কিছুটা তাদের পেশাদারিত্বের নমুনা। আর আমজনতা এতো কিছু বুঝতে চান না। তারা বুঝতে চান বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের ভাগ্যের কি কোনো পরিবর্তন হবে?

হতে পারে। কারণ, প্রতিবেশি দুটো দেশের সম্পর্ক যদি বৈরিতার না হয়ে বন্ধুত্বের হয় তাহলে সেটা দুটো দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অনেক স্বস্তির খবর। স্বস্তিতে থাকা মানে তো উন্নয়নের পথে পা বাড়ানোর রাস্তা খুঁজে পাওয়া। আর উন্নয়ন মানে নিজেদের ভাগ্যেরও কিছুটা পরিবর্তন। ভারত যে এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন চায়;  নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের পর থেকেই সেই বার্তাটা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এরকম একটা বাস্তবতায়  দু`দেশের ক্রিকেট সম্পর্কের কতোটা উন্নয়ন হতে যাচ্ছে তার কোনো আভাস কি পাওয়া যাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে?

শেষ বাক্যটা পড়ে অনেকের ভ্রূ কুচকে যেতে পারে! প্রশ্ন জাগতে পারে; নরেন্দ্র মোদির এই সফরের সঙ্গে আবার ক্রিকেটের সম্পর্ক খোঁজা কেন! খুঁজতে হচ্ছে। কারণ; নরেন্দ্র মোদি নিজে। সেই সঙ্গে দু`দেশের ক্রিকেট সম্পর্কের অতীত এবং বর্তমান। কথাগুলোর একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। নরেন্দ্র মোদি নিজে মানে এই মোদি একজন ক্রিকেট অনুরাগী। ক্রিকেট সংগঠক। যিনি গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন। ছিলেন গুজরাট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও। সেই সূত্রে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গেও ছিল তার সংশ্লিষ্টতা। আর বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা ছিল অনেক বড়। বাংলাদেশ তাদের প্রথম টেস্টও খেলেছে ভারতের বিপক্ষে। সেটা পনের বছর আগের কথা। তারপর বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আচরণ অনেকটা ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ! এখন পর্যন্ত ভারত তাদের মাটিতে বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে আমন্ত্রণ জানায়নি! যেমনটা অস্ট্রেলিয়া করেছিল  প্রতিবেশি নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। নিউজিল্যান্ড টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ছাব্বিশ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে টেস্ট খেলার সুযোগ পেতে! কারণ; অস্ট্রেলিয়ানরা ঠিক টেস্ট খেলার যোগ্য মনে করেনি কিউইদের! এটা তাদের এক ধরনের নাক উঁচু স্বভাবের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আচরণটাও প্রায় সেরকম! ভারত এখনো মনে করে না; বাংলাদেশ তাদের মাটিতে টেস্ট খেলার যোগ্য হয়েছে! ভারতীয়দের এই নীতির কারণে এখনো বাংলাদেশের ভারত সফর হলো না! অনেকে বলেন এটা বাংলাদেশের ক্রিকেট কূটনীতির ব্যর্থতা! কিন্তু তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে ভারতীয়দের বড়ভাই সুলভ আচরণ! ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ অবশ্য বার বার বলেছেন; প্রতিবেশিদের সঙ্গে ভারত মোটেও ‘বিগ ব্রাদার’-র মতো আচরণ করতে চায় না। ‘বিগ ব্রাদার’ নয়, ‘এলডার ব্রাদার’-এর মতো আচরণে বিশ্বাসী তাঁরা। এই কথার সঙ্গে যদি তাঁদের বিশ্বাস মেলানোর চেষ্টা করি, তাহলে ক্রিকেট অঙ্গনে খুব ইতিবাচক কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কের ইতিবাচক দিকটাতেই বিশ্বাস রাখতে চায়। আর সেই বিশ্বাসের জায়গাটা আরো বড় মনে হয় মোদির ক্রিকেট কূটনীতির দক্ষতা দেখে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিলেন তিনি। সেই সফরে মোদি ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছিলেন সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে। ক্যানবেরা থেকে মেলবোর্ন যেখানেই গেছেন, যেখানেই বক্তব্য রেখেছেন তিনি, ক্রিকেট উঠে এসেছে সেখানে। শুধু মোদি নন, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোটও ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছিলেন দুটো দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের উদাহরণ তুলে ধরতে। সেই সফরে মোদি পাশে রেখেছিলেন সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, ভিভিএস লক্ষণের মতো তারকাদের। অন্যপাশে অ্যবোটের সঙ্গী অ্যালেন বোর্ডার, স্টিভ ওয়াহ, গ্লেন ম্যাকগ্রার মতো নক্ষত্র! এবং মোদির সেই সফরকে যদি সফল বলতে হয়; তাহলে অবশ্যই বলতে হবে সেই সাফল্যের অন্যতম অনুঘটক ছিল ক্রিকেট।

কিন্তু মোদির বাংলাদেশ সফরে ক্রিকেট কি আদৌ আলোচনায় উঠবে? মোদি ক্রিকেটানুরাগী। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বোধ হয় আরো এক ধাপ এগিয়ে থাকবেন ক্রিকেট তথা খেলাধুলার ক্ষেত্রে তার ভালোবাসার ব্যাপারে। স্বাভাবিকভাবে এদেশের মানুষ আশা করতেই পারে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার মূল্যবান সময়ের মধ্যে সামান্যতম হলেও ক্রিকেট আসতেই পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ দলের ভারত সফর নিয়ে আলোচনাটা হওয়া দরকার। আর সেই প্রেক্ষাপট কিন্তু তৈরি হয়ে আছে। কারণ, মোদির সফর শেষ হওয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরই ভারতীয় ক্রিকেট দল সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসছে। তাহলে বাংলাদেশ কবে যাবে ভারতে? এই প্রশ্নের উত্তরটা হয়তো দুটো দেশের বোর্ড কর্তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে ক্রিকেট কূটনীতির একটা চাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিতেই পারেন নরেন্দ্র মোদির দিকে। মোদির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া এলে ভারতীয় ক্রিকেট কর্তারা বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানাতে  দ্বিধা করবেন কি? মনে হয় না। যদিও বাংলাদেশের তুলনায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড অনেক বেশি স্বাধীন নীতি নির্ধারণী ব্যাপারে। তবে বিশ্বে ক্রিকেট কূটনীতিতে সফল দেশটার নামও ভারত। চীন-পাকিস্তান-শ্রীলংকা প্রত্যেকটা দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক উন্নয়নে ক্রিকেটকে ব্যবহার করেছে ভারত। ভারতের অস্ত্রটাই বাংলাদেশ ব্যবহার করলে লাভ ছাড়া ক্ষতি কি?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ইনজুরি টাইম’ ‘এক্সট্রা টাইম’ ব্যাপক পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। তিনি কাজ করেছেন দেশের নেতৃস্থানীয় বিভিন্ন দৈনিকে, টেলিভিশন এবং দেশি-বিদেশি রেডিওতে।

এইচআর/বিএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।