আমাদের কন্যারা যাবে কোথায়
গত ২১ মে যমুনা ফিউচার পার্কের এক দোকানের বিক্রয়কর্মী গারো তরুণীকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয় কিছু দুর্বৃত্ত। এরপর কয়েকজন মিলে তাকে ধর্ষণ করে। দুই ধর্ষককে আটক করা হয়েছে।
২৬ মে শিশু ছাত্রীকে ধর্ষণ করায় রাজধানীর হলিক্রিসেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন কে (২৫) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
গত ২৮ মে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রভাষক একে এম আনিসুজ্জামানকে চাকরিচ্যুত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২৯ মে’র খবর, নাটোরের বড়াইগ্রামে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় ধর্ষক।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই চারটি খবর গণমাধ্যমে এসেছে যখন মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের এক শিশু ছাত্রীকে যৌন হয়রানির চেষ্টার অভিযোগের প্রতিবাদে আন্দোলন চলছে। এরকম আরো কিছু সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। একই রকম আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে যা গণমাধ্যমে আসেনি। এই চারটি খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নির্যাতনকারি দুজন গ্রামের তরুণ, একজন দোকানি, একজন স্কুল শিক্ষক, একজন বিশ্বদ্যালয় শিক্ষক। নির্যাতনের শিকার শিশু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। নির্যাতনকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, স্কুল শিক্ষককে কারাদণ্ডিত করা হয়েছে, দুই ধর্ষককে আটক করা হয়েছে। খবরের বিশ্লেষণ শুধু এইটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে মনে হবে নির্যাতনকারিরা ধরা পড়ছে, শাস্তি পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো হাজারে একজন নির্যাতনকারিও শাস্তি পায় না। আর লাখো ঘটনার একাংশও গণমাধ্যমে আসে না। এই কয়টি উদাহরণতো শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।
নির্যাতনের শিকার পোশাক শিল্পের নারীদের গোপন কান্নার শব্দ কী আমরা পাই? শিল্প কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বীমাসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মজীবী নারীদের ওপর যে যৌন নির্যাতন চলে তার হিসেবও আমরা রাখি না। এমনকি যারা মানুষের দোর গোড়ায় খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেন সেই গণমাধ্যমেও যেসব নারী নির্যাতন হয় সে খবরতো সব সময় চাপা পড়েই থাকে। অর্থাৎ নারীর ওপর যৌন নির্যাতন হচ্ছে সর্বব্যাপি। স্বীকার করি আর না-ই করি আমরা পুরুষেরা অনেকেই যৌন নির্যাতক। কেউ শারীরিকভাবে, কেউ মানসিকভাবে। এই সংখ্যাটা কম নয়। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অফিস আদালতই নয়, বই মেলা, বৈশাখে বর্ষবরণ থেকে শুরু করে বাসে ওঠা নারী কিংবা বিকেলে হাঁটতে বের হওয়া নারীর ওপর ঝাপিয়ে পড়ছি।
চারটি খবর তুলে ধরেছিলাম মূলত নির্যাতনকারি কারা তা বোঝাতে। দেখা যাচ্ছে একজন অশিক্ষিত তরুণ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের শিক্ষক পর্যন্ত যৌন নির্যাতনকারি আর শিশুরাই এর বেশি শিকার। ক’বছর আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় একটি খবর পড়েছিলাম মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে স্কুলের ছাত্রীদের অর্ধেকই যৌন হয়রানির শিকার। খবরটি পড়ে তখন মনে হয়েছিল সভ্যতার এতো উঁচুতে অবস্থান করেও সেখানে স্কুলের মেয়েরা অধিক হারে নির্যাতরে শিকার হচ্ছে! ভোগ বিলাসে থেকে তাদের নীতি নৈতিকতার ক্ষয় হচ্ছে ভেবেছিলাম। তাদের তুলনায় আমরা ভালোই আছি মনে করে একটু আত্মতৃপ্তির ঢেকুরও তুলেছিলাম। আমেরিকান এসোসিয়েশন অব ইউনিভার্সিটি উইমেন যৌন হয়রানির ওপর গবেষণাটি করে বলেছিল বিষয়টি সর্বব্যাপি এবং স্কুলের জন্য এটা একটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের চিত্রটা মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। যদিও আমার কাছে ওই রকম কোনো ডাটা নেই তবে বিভিন্ন সময় বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনদের কাছে নারীদের ঘরে ফেরার পর যে গল্প শুনি তাতেতো দেখি আমরা অনেকেই একটা ধর্ষকের মন নিয়ে চলি। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি গণমাধ্যমে আসে আর অধিকাংশ ঘটনা লোক লজ্জার কারণে নির্যাতিতরা চেপে রাখে। শুধু ধর্ষণের কিছু ঘটনা প্রকাশ পায়। এটা সত্যি দিনকে দিন আমাদের চরিত্রের ক্ষয় হচ্ছে।
পুরুষদের চরিত্রের ক্ষয় এভাবে যদি হতেই থাকে তাহলে আমাদের কন্যাদের কোথায় পাঠাবো? স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়! শিক্ষকেরাই তো দেখি বড়ো নির্যাতনকারি । পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে ঢুকে পুরুষ সহকর্মী বা বসদের হাতে আবারো তারা নির্যাতিত হচ্ছে। অর্থাৎ নারী হলে মুক্তি নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার আর সাতভাগ নারী জীবনে কখনো না কখনো ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই ডাটার মানে আমরা যতোই সভ্য দাবি করি আসলে এখনো সভ্য হয়ে উঠতে পারিনি।
এখন কথা হলো এর প্রতিকার কী হতে পারে। নারী নির্যাতনরোধে দেশে আইনতো কম নেই। যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০,নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন-১৯৮৩, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন-১৯৯৫, পরবর্তী সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ প্রণয়ন করা হয়। ২০০৩ সালে এর সংশোধনী করা হয়। এতো আইন কানুন থাকার পরও যৌন নির্যাতন বেড়েই চলছে।
এসব আইনের মধ্যেই আমরা হারিয়েছি আমাদের অনেক কন্যার ভবিষ্যত। অনেক কন্যা অভিমানে পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে। আমরা ভুলে গেছি ২০০১ সালে নারায়ণগঞ্জে চারুকলার ছাত্রী সিমি বানুর আত্মহত্যার কথা, মনে রাখিনি ধর্ষিত হওয়ার পর ২০০২ সালে মহিমা খাতুনের আত্মহত্যার খবর, ২০০৩ সালে ধর্ষিত হয়ে গার্মেন্টস কর্মী শাহীনুরের ট্রেনের নিচে আত্মহত্যার কথাও নিশ্চয় আমরা মনে রাখিনি। মনে রাখলে আজ মোহম্মদপুরে স্কুলে আন্দোলন করতে হতো না, বৈশাখের মেলায় কন্যাদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার কথা মনে হলে রক্ত শীতল হয়ে যেতো না।
অর্থাৎ আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই। আর শাস্তির ঘটনাও খুব কম। যে হারে নির্যাতন হয় সে হারে যদি শাস্তি হতো পাশাপাশি শাস্তির ঘটনা যদি ফলাও করে প্রচার করা হতো তাহলে অন্তত আমাদের মধ্যে যারা সম্ভাব্য নির্যাতক তারা একটু ভয় পেতো বা সাবধান হয়ে যেতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ হওয়ার পর নির্যাতনকারির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই নামমাত্র শাস্তি দিলেই চলবে না। তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। সাথে সাথেই ফৌজদারি মামলা করে নির্যাতককে কারাগারে পাঠিয়ে দিতে হবে।
নয়তো ওই নির্যাতনকারি স্বরুপে আবির্ভুত হতে বেশি সময় নেবেন না। এমনই একটি ঘটনা ২০১১ সালের। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়। কিছুদিন পরই তিনি ফিরে আসেন এবং তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এমন আরো উদাহরণ দেওয়া যায়। তাই বলছি শাস্তি হতে হবে দৃষ্টান্তমূলক। নির্যাতকরা জীবনে কখনোই যেন কোনো নারীর দিকে খারাপ দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকাতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
দীর্ঘ আইনের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা অতীতে দেখেছি ইভ টিজিঙের মাত্রা কমাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
এক্ষেত্রে হাইকোর্টের যে রায়টি আছে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন দরকার। রায় অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ রাখার যে বক্স থাকবে সেগুলো প্রতিদিনই খুলে দেখতে হবে এবং প্রতিদিনের বিচার প্রতিদিনই করতে হবে। আমরা অসভ্য বলেই আমাদের কঠোর আইনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। আর এটা করতে হলে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে গণজাগরণ ঘটাতে হবে নয়তো আমাদের নারীদের মুক্তি নেই। আর নারীদের নীরবতা ভাঙতে হবে। যা শুরু হয়ে গেছে। 
এইচআর/এমএস