ফেভারিট তকমাটা না হয় থাকুক ভারতেরই
পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ ফেভারিট , বিশ্বকাপের পরপরই পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের আগে এমন কথা বলেছিলেন দেশ সেরা তো বটেই বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের পুরোধা সাকিব আল হাসান। পাকিস্তান সিরিজের পরপরই ভারতের বিপক্ষে সিরিজের আগে উল্টো কথা বলছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাম সাকিব। আসন্ন সিরিজে ভারতকে ফেভারিট বলে মন্তব্য করেছেন এই অলরাউন্ডার।
মজাটা হচ্ছে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের আগের বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের বিপক্ষে সিরিজের আগের বাংলাদেশ যে অন্তত মনস্তাত্ত্বিভাবে এগিয়ে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। কেননা এবারের সিরিজের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ ও একমাত্র জয়টি ছিল ১৬ বছর আগে। এমন দলকে ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ করার পর টি২০- ম্যাচেও হারিয়েছে বাংলাদেশ। ফর্মের উত্থান- পতন বাদ দিলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একই পাল্লায় মাপা হয় ভারত-পাকিস্তানকে। আর প্রশ্নটা এই জায়গাটিতেই। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা দলের অপরিহার্য ক্রিকেটারটি ভারতের মুখোমুখি হওয়ার আগে হঠাৎ করেই কেনই বা রক্ষণাত্মক হয়ে গেলেন?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আঙ্গিনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সাকিব। বিশ্বের সব বড় আসরগুলোতে তার সমান কদর। আর তাই সাকিবের কথাকে শুধু কথার কথা বলার কোনো সুযোগ নাই। বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ সফর নিয়ে পাকিস্তান আর ভারত এই দুটো দেশের প্রেক্ষিত ভিন্ন। এবারের সফরের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন অনুভব করেনি পাকিস্তান। সিরিজ শুরুর আগ থেকেই বাংলাদেশকে নিয়ে চরম ঊন্নাসিকতা দেখিয়েছে রমিজ রাজারা। মাঠে নামবে আর বরাবরের মতই জয় উৎসব করবে এর বাইরে দ্বিতীয় ভাবনাটা পাকিস্তান ম্যানেজম্যান্টের ছিলোই না। বাংলাদেশের কাছে একের পর এক ম্যাচ হারের পর পাকিস্তানি মিডিয়া ও সাবেক গ্রেটদের আহাজারি থেকে এটা সুস্পষ্ট যে এই সফরে ভিন্ন কিছু ঘটতে পারে এ নিয়ে তাদের কোনো মানসিক প্রস্তুতিই ছিল না। ‘বাংলাদেশের বিপক্ষেও হারছি’ এই কষ্ট, এই আক্ষেপটাই বড় হয়ে উঠেছে ইমরান খানদের কাছে। সাকিব তার কথার মধ্য দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বাস্তবতার জমিন।
ভারতের প্রেক্ষিতটা সম্পূর্ণই এর বিপরীত। পুরোটাই ক্রিকেটীয়। সতর্কতা আর কৌশলের অংশ। বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে থেকেই বাস্তবতার মাটিতে পা রেখেছে ভারত। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার আগে থেকেই বাংলাদেশ নিয়ে সতর্ক কৌশল নিয়েছে দলটি। বাংলাদেশ শক্ত প্রতিপক্ষ, তাদের হারানো কঠিন, এমন কথা বলেছেন সুনীল গাভাস্কর থেকে সৌরভ গাঙ্গুলী পর্যন্ত। এই সতর্কতার অংশ হিসাবেই এবারের সফরে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে আসছে ভারত। কোনো ঝুকির পথে হাঁটেনি তারা। এই সফরে আসতে চাননি মহেন্দ্র ধোনি, বিরাট কোহলিরা। খুব স্বাভাবিক কারণেই তাদের আবদারের চেয়ে দেশের স্বার্থকেই বড় করে দেখেছে ভারতীয় ম্যানেজম্যান্ট। সবটাই ক্রিকেটীয় কৌশল। সব কথার এক কথা বাংলাদেশ সফর নিয়ে ভারত যথেষ্ট কৌশলী, যথেষ্ট রক্ষণাত্মক। সুতরাং প্রকাশে মনোভাবে কৌশলী হওয়াটাই সব থেকে যুক্তিযুক্ত। আর সেটিই করেছেন সাকিব। কৌশলের জবাবে কৌশলী হওয়া। নিজেদের উপর বাড়তি চাপ না নেয়া।
পাকিস্তান আর ভারত দুটো দেশের বর্তমান প্রেক্ষিত নিয়ে আরও কিছু বিষয় উল্লেখের দাবি রাখে। ওয়ান ডে ক্রিকেটে একটা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে চলছে পাকিস্তান ক্রিকেট। ওয়ানডে নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন দীর্ঘদিনের অধিনায়ক ক্রিকেট মস্তিষ্ক খ্যাত মিসবাহ-উল-হক। গুছিয়ে ওঠার আগেই বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে হয়েছে দলটিকে। আর বিশ্বকাপের দল নিয়ে খেলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপেই একটা ইউনিট হিসাবে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখেন মাশরাফি মর্তুজারা। বাংলাদেশের এই স্পিরিটের সঙ্গে পাল্লা দেয়াটা সম্ভব হয়ে ওঠেনি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পথে থাকা পাকিস্তানের। ওয়ানডে ক্রিকেটে পাকিস্তানের ঠিক ভিন্ন মেরুতে অবস্থান ভারতের।
দলটির অধিনায়ক ‘ক্যাপ্টেন কুল’ হিসেবে বিবেচিত মহেন্দ্র সিং ধোনি। বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটে নাম্বার ওয়ান অধিনায়ক তিনি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে তাদের জয়টি অনেক কালিমা লেখা। স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের গৌরব পুনরুদ্ধারে ধোনি বাহিনি যে মরিয়া থাকবে তা বলাই বাহুল্য। একটা বড় টার্গেটকে সামনে রেখেই নিজেদেরকে প্রস্তুত করছে ভারত। স্বভাবতই বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটাও অনেক কঠিন। বাস্তবতা খুবই ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছেন ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি। বলেছেন ‘এ সিরিজটা আমাদের জন্য কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। আমাদের সবাইকে সেরাটা দিতে হবে।’
ওয়ানডে সিরিজ ও টি২০ ম্যাচে চরমভাবে ভরাডুবি হওয়ার পরও টেস্টে পাকিস্তানের ঘুরে দাঁড়ানোটা বাংলাদেশের জন্য হতে পারে শিক্ষণীয়। মিসবাহর নেতৃত্বে টেস্টে অভিজ্ঞ দল নিয়েই মাঠে নামে পাকিস্তান। মিসবাহ- ইউনুস খান ফেরার পর পাল্টে যায় পুরো দলটি। এ সময়ে উপমহাদেশের সেরা টেস্ট দল পাকিস্তান, এটাও বুঝিয়ে দেন মিসবাহ। বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট সিরিজে হারিয়েছে তারা, ড্র করেছে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। ক্রিকেটীয় জায়গা থেকে মূল্যায়ণ করলে ওয়ানডে দলের চেয়ে পাকিস্তান টেস্ট দল ঢের এগিয়ে। টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সত্যিটা হলো ‘টেস্ট জিততে তুলে নিতে হবে ২০ উইকেট। টেস্ট বোলিংয়ে উপমহাদেশে পাকিস্তানের ধারে কাছে কেউ নাই। ওয়াহাব রিয়াজরা পুরনো বলে রিভার্স সুইং করিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারেন মরা উইকেটে। লেগ স্পিনার ইয়াসির শাহ টার্ন ও গুগলির জাদুতে ধসিয়ে দিতে পারেন যে কোন ব্যাটিং লাইন আপ।
উপমহাদেশে টেস্ট ক্রিকেটে যে জায়গাটিতে পাকিস্তান, ওয়ানডে ক্রিকেটে ঠিক একই অবস্থানে ভারত। ওয়ানডে ক্রিকেটে উপমহাদেশের নাম্বার ওয়ান ভারত। আর উপমহাদেশের কন্ডিশন ভারতের জন্য তো পোয়াবারো। উপমহাদেশের ব্যাটিং উইকেটে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের রান উৎসব থামানোটা ক্রিকেটে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর অন্যতম। উপমহাদেশের কন্ডিশনে ভারত কতটা বিপজ্জনক এর জন্য একটা উদাহরণই যথেষ্ট। এটা আর নতুন করে বলার কিছু নাই যে উপমহাদেশে ধারাবাহিকতার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু উপমহাশে কন্ডিশনে ভারতের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে লঙ্কানদের পক্ষেও। ২০১২ সালের জুলাই মাসে সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজে মুখোমাুখি হয়েছিল শ্রীলঙ্কা- ভারত। ৫ ম্যাচের ওই সিরিজে সফরকারী ভারতের কাছে ১-৪ ব্যবধানে হেরে যায় স্বাগতিক লঙ্কানরা।
সব মিলিয়ে ভারতের বিপক্ষে ফেভারিট দাবি করার দায়িত্বটা কিন্তু অনেক বড়। এনিয়ে অনেক কথা উঠত মিডিয়াতে। স্বাভাবিকভাবেই সামলাতে হত বাড়তি চাপ। পুরো পরিস্থিতি বুঝেই ঠিক ভারতের মতোই রক্ষণাত্মক পথে হেঁটেছেন সাকিব। এ প্রসঙ্গে কিংবদন্তীর অলরাউন্ডার ওয়াসিম আকরামের একটা কথা স্মরণ করা যাক। একটা সময় সারাক্ষণ গরম গরম কথা বলে বিতর্কেরও জন্ম দিচ্ছিলেন ‘পিন্ডি এক্সপ্রেস’ খ্যাত শোয়েব আখতার। কিন্তু মাঠে নেমে সেভাবে উইকেট পাচ্ছিলেন না এই গতি সম্রাট।
ওই সময় গ্রেট ওয়াসিম আকরাম বলেছিলেন ‘নিজে এত কথা না বলে শোয়েবের উচিৎ বলকে কথা বলানো।’ আকরামের কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে গরম গরম কথা না বলে সেই স্ট্যামিনা মাঠে দেয়াটাই একজন ক্রিকেটারের আসল কাজ। সাকিবদের কাছ থেকে আসল কাজটাই চাই সবাই। সিরিজের পর কে ফেভারিট সেটাই বড় কথা। ভারতের সাফল্য বেশি, তাই সিরিজের আগে ভারত ফেভারিট এটা মেনে নিয়ে আসল কাজে মনোযোগী হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।
এইচআর/এমএস