উন্নয়নে উচ্ছেদে মানুষ


প্রকাশিত: ০৫:৫৭ এএম, ০৬ জুন ২০১৫

বাজেট পেশ হয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু ক্ষেত্রে তার অসফলতার কথা অকপটে বলেছেন। আবার এই সরকারের আমলে দেশবাসীর জীবন মান উন্নয়নের কথা পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন। আজ বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১৩১৪ ডলার, মোট দেশজ উৎপাদন –জিডিপি ৬ শতাংশের উপরেই আছে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আছে। সব মিলিয়ে এক স্বস্তির কথা আছে তার বাজেট বক্তৃতায়। কিন্তু বাস্তবতা এতসব সাফল্যের পরও আমাদের অনেক মানুষ আজ বেঁচে থাকার জন্য দেশ পাড়ি দিয়ে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে সাগরে ভাসছে।

উন্নয়ন সবাই চায়। কিন্তু তার মূল্য দেয় কে? আজ রাজধানীর আনাচে কানাচে শুধু মানুষ আর মানুষ। কাজের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে তারা আজ এ শহরে ভাসমান। তারা কেবল আসছেই, যাচ্ছে খুব কম। এই যে অভ্যন্তরীণ Displacement, এর সংখ্যা যদি বাড়তে থাকে এমন প্রবলভাবে তাহলে সেটা কি উন্নয়নের কথা বলে? কেউ ভাগ্যের কারণে, কেউবা কারো দ্বারা উচ্ছেদ হয়ে, আর একটি বড় অংশই কাজের সুযোগ না পেয়ে, অনেকেই প্রাকৃতিক কারণে আজ নিজ দেশে উদ্বাস্তু।

যাদের জীবনে এমন ঘটনা ঘটেনি তারা কি কখনো বুঝতে পারবেন নিজের ঘরবাড়ি, জীবিকা, চেনা পরিবেশ, পরিবার-পরিজন, সংস্কৃতি ছেড়ে বাধ্য হয়ে অচেনা এক শহরে দিনাতিপাত করা কতটা কষ্টের? দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, কখনো তা কমছে না যতই আর্থিক উন্নতি দেশের হোক না কেন। বছর বছর এর পরিমাণ জটিল ও বিপুল হচ্ছে। নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একবার ঢাকাতেই এক সেমিনারে বলেছিলেন, মানবিক প্রগতি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে। মানবিক প্রগতি ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন বঞ্চনার সৃষ্টি করে। তবে কি আমাদের সে ধরনেরই কিছু একটা হচ্ছে?

সরকার হয়তো বলবে, এই সাগরে ভাসমান মানুষেরা অর্থনৈতিক কারণে ঘরবাড়ি ছাড়েনি। তারা দালালদের প্রতারণার শিকার  হয়েছে। আবার হয়তো অভ্যন্তরীণ  Displacement বা উচ্ছেদও উন্নয়নের কারণে হয়নি, হয়েছে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে। কিন্তু বড় কারণটি কিন্তু স্রেফ খেয়ে পরে বাঁচতে চাওয়ার তাগিদ। আর এখানেই উন্নয়নের সাথে সুশাসনের সম্পর্ক। মাথাপিছু আয় বাড়ে, প্রবৃদ্ধি কমে না, কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্ম নেই, বেঁচে থাকার সংস্থান নেই। তাই তারা বেপরোয়া।

উন্নয়নের কারণেও বহু মানুষ তার নিজ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়। রাস্তা-ঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প করতে গিয়ে জমি অধিগ্রহণের কারণে অনেক মানুষই টাকা পায় না, কিন্তু হারিয়ে ফেলে নিজেদের ঠিকানা। কিছুদিন আগে এক ডকুমেন্টারিতে দেখলাম রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি দিয়ে, টাকা পয়সা না পেয়ে এখন নিজেদের জমির পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কত মানুষ। এরা এক শ্রেণির দালালের প্রতারণায় জমি হারিয়েছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণের টাকাও পায়নি। তারা বিস্ময়ে দেখছে, তাদের জমিতে ঘর উঠছে, সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে ছুটে আসছেন আর সেখানকার প্রহরীরা তাদের দেখলে লাঠি হাতে তেড়ে আসছে।

আইলা, সিডরের পর কত মানুষ আপন ভূমি ছেড়ে এখন দূরের মানুষ, তার কি কোন পরিসংখ্যান আছে?  Displacement  সম্পর্কে সরকারের সঠিক তথ্য ও নীতি না থাকার কুফল অনেক। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারের জমি অধিগ্রহণ এদেশে বরাবরই এক আতংকের নাম। বারবার এখানে প্রভাবশালীরা বিজয়ী হয়, পরাজিত হয়ে চোখের জলে এলাকা ছাড়ে সাধারণ মানুষ। আয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি থেকে, জিয়াউর রহমানের খাল কাটা, তা থেকে হাল আমলের সড়ক, সেতুসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প, কখনোই ন্যায্যতায় সম্পন্ন হয়নি এসব কাজ।

এতো গেল সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের কথা। আছে বেসরকারি খাতের হামলাও। আর সেটা আরো ভয়ংকর। জমি দখল করে শহুরে ধনীর জন্য আবাসিক প্রকল্প করা, শিল্প করার নামে জমি নিয়ে তাতে শিল্প না করে আবাসন ব্যবসা করার সংস্কৃতি দেশে এক জমি-মাফিয়া শ্রেণির সৃষ্টি করেছে। এরা কারো জমি দখল করে, কাউকে জমি বেঁচতে বাধ্য করে, বাধ্যতামূলক সেই বিক্রিতেও ঠিক মূল্য পায় না এসব মানুষ। এই জমি-মাফিয়ারা, যারা ভূমিদস্যু নামে পরিচিত, কত মানুষ নি:স্ব করেছে তার সংখ্যা হয়তো কোনোদিনই জানা যাবে না।

বন্যা, ঝড়, সংঘাত, এবং উন্নয়ন, নানা কারণে ছিন্নমূল হয়ে চলেছে মানুষ। এই মানুষেরা কেউ সাগরে ভাসে, কেউ রাজধানীতে ভেসে বেড়ায়। এরা কি সরকারের নজর আছে? থাকলে প্রবৃদ্ধির মূল্য নিশ্চয়ই এমন চড়া দামে দিবে না মানুষ।


এইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।