ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারা : এ অমানবিকতার শেষ কোথায়?

সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫০ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০১৮ | আপডেট: ০১:৫৫ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০১৮
ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারা : এ অমানবিকতার শেষ কোথায়?

ফয়সাল আহমেদ

গত ৩ এপ্রিল দুপুরে হঠাৎই একটি অনলাইন পত্রিকার সংবাদে চোখ আটকে যায়। সংবাদটির শিরোনাম ছিলো- ‘ট্রেনে ছোড়া পাথরে আ. লীগ নেতা আহত’। লিংকে ক্লিক করে সংবাদের ভেতরে ঢুকে জানতে পারি কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে চট্টগ্রামগামী একটি মেইল ট্রেনে বাহির থেকে ছোড়া পাথরের আঘাত লেগে আহত হয়েছেন বোয়ালখালী পৌরসভা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী। পাথরের আঘাতে তাঁর চোখের উপরের অংশ ফেটে গিয়েছে।

২ এপ্রিল সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মেইল ট্রেনটি কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পাঁচ-সাত মিনিট চলার পর এ ঘটনা ঘটে। পরদিন মঙ্গলবার সকালে ট্রেনটি চট্টগ্রাম পৌঁছালে আহত ব্যক্তিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হয়। জহিরুল ইসলাম ট্রেনের ভেতরে জানালার পাশে বসায় বাহির থেকে ছুঁড়ে মারা পাথর তার চোখে সরাসরি আঘাত করে। শুধু জহিরুল ইসলাম নন, দিনের পর দিন ট্রেনের সাধারণ যাত্রীরা এমন নৃশংসতার শিকার হচ্ছেন। তবে ভয়ের বিষয় হচ্ছে খোদ রাজধানীর ভেতরেই এধরনের ঘটনা ঘটছে।

বছর কয়েক আগে ‘তূর্ণা নিশীথা’ ট্রেনের জানালা দিয়ে ছোড়া ঢিল মাথায় লেগে নিহত হয়েছিলেন প্রীতি দাশ নামের তরুণ এক প্রকৌশলী। তিনি তাঁর স্বামী ব্যাংক কর্মকর্তা মিন্টু দাশের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। এসময় সাথে ছিলেন তাঁদের দুই বন্ধু। রাত ১১টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে তূর্ণা নিশিথায় ওঠেন তাঁরা। তাঁদের আসন ছিল ট্রেনের 'ড' বগির ৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০ নম্বর।

প্রীতি বসেছিলেন জানালার পাশের ৪০ নম্বর আসনে। সাড়ে ১১টার দিকে ট্রেনটি ভাটিয়ারীর ভাঙা ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানোর পর বাইরে থেকে জানালা বরাবর উপর্যুপরি পাথর ছোড়া হয়। এর একটি পাথর এসে প্রীতির মাথায় লাগে। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ফেটে রক্তাক্ত হন তিনি। ঘটনার পর সীতাকুন্ড রেলস্টেশনে তাঁদের নামিয়ে দেওয়া হয়।

প্রথমে প্রীতিকে সীতাকুন্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আহা এমন মৃত্যু মানা যায়! কিন্তু আমাদের মেনে নিতে হলো। প্রীতিকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই আরো এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। সেসময় ট্রেনে ছোড়া ইট- পাথরের আঘাতে ট্রেনের সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে গার্ড- চালক পর্যন্ত আহত হয়েছেন, আর তা এখনও অব্যাহত আছে। যেন এসব থামাবার কেউ নেই!

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগরে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হন ট্রেনের গার্ড আবদুল কাইয়ুম। মালবাহী খালি ট্রেন ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁওয়ে যাচ্ছিল। ওই ট্রেনে গার্ডের দায়িত্ব পালন করছিলেন জনাব কাইয়ুম। ট্রেনটি রাত পৌনে ১১টার দিকে শমসেরনগর স্টেশন ও মনু স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকায় পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ে। একটি পাথরের টুকরা কাইয়ুমের কপালে লাগলে তিনি গুরুতর জখম হন। পরে ট্রেন থামিয়ে তাঁকে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে পাঠানো হয় মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে। সেখানেও অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এর আগে ২০১৩ সালে আগস্ট মাসের ২২ তারিখ ঘটেছিল এমনই আরো একটি দুর্ঘটনা। সেবার আহত হন সরাসরি ট্রেনের চালক। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মহানগর গোধূলী ট্রেনে দুর্বৃত্তের ছোড়া পাথরের আঘাতে ট্রেনটির চালক আবদুল্লাহ আল বাকি আহত হয়েছিলেন। রাতের বেলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের কাছে শহরের কলেজপাড়া মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। ট্রেনটি স্টেশনে থামার পর আহত চালককে স্টেশনের কাছের একটি ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আমরা জানতে পারি, সীমান্তবর্তী এলাকায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ট্রেনে পাথর ছোড়া হয়। মাদক ও অন্যান্য পণ্য পাচারকারীদের সঙ্গে রেলের কিছুসংখ্যক কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। ঠিক জায়গামতো ট্রেন না থামালে পাচারকারীরা পাথর ছুঁড়ে মারে। ফলে বাধ্য হয়ে চালক ট্রেন থামায় আর এই সুযোগে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সারাদেশে প্রায় ২ হাজার ৯শ’ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও খুলনা-পার্বতীপুর লাইনে প্রতিনিয়তই পাথর ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, পূর্বাঞ্চলের ষোলশহর, ফৌজদারহাট, সীতাকুন্ড, চৌমুহনী, কুমিল্লার শশীদল, ইমামবাড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, কসবা, পাঘাচং, ভাতশালা, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, নরসিংদী, পুবাইল, গফরগাঁও, গৌরীপুর, মোহনগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, দেওয়ানগঞ্জ, টঙ্গী, তেজগাঁও, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, লালমনিরহাট, পীরগঞ্জ, গাইবান্ধা, বুনারপাতা, সোনাতলা, আজিমনগর, খুলনা-পাবর্তীপুরের জামতৈল, কোটচাঁদপুর, নোয়াপাড়া, দৌলতপুর, রংপুরের আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, পীরগঞ্জ, কাউনিয়া, বামনডাঙ্গা এলাকায় চলন্ত ট্রেনে সবচেয়ে বেশি ঢিল ছোড়া হয়।
একটি দৈনিক পত্রিকার ২০১৩ সালে করা এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে বিভিন্ন ট্রেনের প্রায় ৩৫টি দরজার গ্লাস পাথর নিক্ষেপের কারণে ভাঙছে। এসব গ্লাসের একেকটির দাম ১০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। গড়ে ১ লাখ টাকা হিসাবে প্রতি মাসে ৩৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে রেলওয়ের। ৫ বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ছোড়া পাথরের আঘাতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো যাত্রীর চোখ, মুখ ও মাথায় মারাত্মক আঘাত লাগছে।

এসব ঘটনা বারবার ঘটলেও সর্তক হচ্ছে না রেল বিভাগ কিংবা সরকার। ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পর কিছু দিন সক্রিয় থেকে আবার তারা আগের মতোই ঝিমিয়ে পরে। কিন্তু এসব ভয়াবহ অপরাধ যেন পুনরায় আর সংগঠিত না হয় সে জন্য নেওয়া হয় না কোন স্থায়ী, কার্যকরী উদ্যোগ।

রেলওয়ে আইন অনুযায়ী যাত্রীদের ক্ষতি করতে ট্রেনে পাথর ছুড়লে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়া রয়েছে ১০ বছরের জেল থেকে বিভিন্ন মাত্রার অর্থদণ্ডের বিধি। তবে এ আইনে কারো শাস্তি হওয়ার কথা আমাদের জানা নেই। আর যদি হয়েও থাকে তারও প্রচার নেই। ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে প্রাণঘাতী এসব অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। অন্যতায় এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

সারাদেশে সড়ক পথে নিত্য লেগে থাকা অমানবিক জ্যাম আর হরদম ঘটতে থাকা দুর্ঘটনার কবল থেকে বাঁচতে বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ যখন রেল পথটাকেই নিরাপদ বাহন বলে মনে করে আসছে তখন এসব ঘটনা চিন্তা বাড়িয়ে দেয় বৈকি। আমরা চাই, আমাদের নিশ্চিন্ত যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রিয় ট্রেনটি যেন নিরাপদেই পথ চলতে পারে।

ট্রেনে ছুঁড়ে মারা পাথরের আঘাতে দুই চোখ হারানো আখাউড়ার রাধানগর গ্রামের দরিদ্র তরুণ সঞ্জীব কুমার বিশ্বাস, রাজধানীর শান্তা-মারিয়া কলেজের ছাত্রী বুশরা নওশাদ, আজমপুর থেকে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে হজ ক্যাম্পে আসা হাজী আরফ চাঁন, ফতুল্লার ব্যবসায়ী মামুন মিয়া, উত্তরার শামিম মোল্লা এরা সবাই ট্রেনে চড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্বৃত্তদের ছোড়া ইট-পাথরের আঘাতে এরা কেউ হারিয়েছেন হাত- পা কিংবা চোখ। কিন্তু এভাবে আর কতদিন?

লেখক: সাংবাদিক।

এইচআর/আরআইপি

‘আমরা জানতে পারি, সীমান্তবর্তী এলাকায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে ট্রেনে পাথর ছোড়া হয়। মাদক ও অন্যান্য পণ্য পাচারকারীদের সঙ্গে রেলের কিছুসংখ্যক কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। ঠিক জায়গামতো ট্রেন না থামালে পাচারকারীরা পাথর ছুঁড়ে মারে। ফলে বাধ্য হয়ে চালক ট্রেন থামায় আর এই সুযোগে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়। ’