ইমরান খানের ফোনে কাশ্মীর ইস্যু

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:২৬ এএম, ৩০ জুলাই ২০২০

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জটিল সময় নির্ধারণ করে ফোন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ইমরান খান গত ২২ জুলাই দুপুরে টেলিফোন করে ১৫ মিনিট ধরে আলাপ করেছেন শেখ হাসিনার সঙ্গে। যখন চীন-ভারত উত্তেজনা চলছে আর ভারতের সব প্রতিবেশীকে নিজেদের বলয়ে নেয়ার সফলতা দেখাতে চাচ্ছে চীন। চীন-ভারত উত্তেজনায় বাংলাদেশ নীরব ভূমিকা পালন করছে। পাকিস্তান বরাবরই চীনের বন্ধু। এই সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে যদি ‘পারস্পরিক বিশ্বাস, পারস্পরিক সম্মান এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে’ বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের ‘ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহ’ দেখান- সেটা নিয়ে একটুখানি জল্পনা-কল্পনা হতে পারে বৈকি।

ইমরান খান এর আগে ২০১৯ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন। সেটাও ছিল একটা জটিল সময়। কারণ তার পরদিন ৩ অক্টোবর দুইদিনের সফরে ভারত যাচ্ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তার মাস দুয়েক আগে ৫ আগস্ট ২০১৯ ভারত জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের তখন উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। ফলে শেখ হাসিনার চোখের অসুখ সেরেছে কিনা খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য শুধু ইমরান খান তখন ফোন করেছিলেন, এটি সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য নাও হতে পারে।

এবার বলেছেন করোনা পরিস্থিতি জানতে ফোন করেছেন ইমরান। ফাঁকতালে তিনি ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি শেখ হাসিনার কাছে ব্যাখ্যা করেছেন। ভারত সরকার মুখে এটা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকলেও সরকার সমর্থিত মিডিয়ায় এই ফোনালাপে খবর ভারতের পররাষ্ট্র দফতরের অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অনেকে।

দুই নেতার আলোচনা নিয়ে পাকিস্তান বলেছে, ইমরান খান ভারত অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন। বাংলাদেশের ভাষ্যে জম্মু-কাশ্মীরের কোনো কথা নেই, সেটিকে পজিটিভলি নিয়েছে ভারত। তাদের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেছেন, ‘জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এটা বাংলাদেশ কর্তৃক স্বীকৃত বিষয়, তাদের এই অবস্থানকে ভারত সম্মান করে।’ বাংলাদেশ কাশ্মীরকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে গত বছরও সার্টিফিকেট দিয়েছে।

কিন্তু সরকারের বিবৃতিই কি শেষ কথা? জনমত বলতে কি কিছু নেই এবং সরকার কি জনমত উপেক্ষা করতে পারে? বাংলাদেশ কাশ্মীরকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে যতই সার্টিফিকেট দিক, তাই বলে ভারত কাশ্মীরে যা ইচ্ছা করতে পারবে? কাশ্মীরের সাড়ে ১২ মিলিয়ন মুসলমানকে প্রায় এক বছর ধরে ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখা, তাদের ন্যূনতম মানবাধিকারকে উপেক্ষা করা, তাদের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দি করা- এর কোনো প্রতিক্রিয়া কি বাংলাদেশে পড়বে না?

সব অভ্যন্তরীণ বিষয় একসময় অভ্যন্তরীণ থাকে না- যখন সেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি, মানবতা, মৌলিক অধিকার জড়িত হয়ে যায়। বাংলাদেশের কোথায় কোথায় মাঝে মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠী যখন বড় আকারে নির্যাতনের শিকার হয় তখন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কর্তারা সেসব জায়গা পরিদর্শন করেন। তারা ঘটনা নিয়ে তাদের বক্তব্য-বিবৃতি দেন। সেটা তারা কোনো অধিকারে দেন? এটাতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত এ জন্যই প্রতিক্রিয়া দেয়ায়, এখানকার হিন্দু জনগোষ্ঠী নির্যাতনের শিকার হলে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা মনোক্ষুণ্ন হয়, তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

ঠিক একইভাবে ভারতকেও বোঝা উচিত যে, কাশ্মীরে যখন মুসলমানদের ওপর হত্যা-নির্যাতন চালানো হয়, তাদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়, গরুর মাংস খাওয়ার জন্য ভারতে মুসলিমদের পিটিয়ে মারা হয় এবং শুধু মুসলিম হওয়ার অপরাধে একদল মানুষ বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার হয়, দিল্লি-গুজরাটে দাঙ্গা বাঁধিয়ে পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করা হয়- তখন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীও ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়।

ভারত নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করবে আর আসামের এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরির প্রক্রিয়া এবং গত বছর পাস হওয়া ভারতের নাগরিকত্ব আইন করে মুসলমানদের দেশছাড়ার কথা বললে- সেটাও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করে নিঃসন্দেহে। মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় অনুভূতি একতরফা হয় না। ভারত এখন বাবরী মসজিদ ভেঙে সেই স্থানে রামমন্দির নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পটভূমিতেই আগামী ৫ আগস্ট মহাধুমধামে ভারতের অযোধ্যায় সুবিশাল রামমন্দিরের ভূমিপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ তিন দশক আগে ভেঙে ফেলা বাবরী মসজিদের জায়গায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এখন যে রামমন্দির তৈরি হবে, তারই নির্মাণকাজ শুরু হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্য হিন্দু মৌলবাদী নেতাদের নিয়ে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট সংবিধান পরিবর্তন করে কাশ্মীরিদের স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হচ্ছে। আর এ বছর ৫ আগস্ট মুসলমানদের একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভেঙে সেই স্থানে রামমন্দির নির্মাণকাজ শুরু করা হবে। নরেন্দ্র মাদি এবং ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা কি মনে করে যে- একই তারিখে এই কাজ করতে যাওয়া একেবারেই কাকতালীয় ঘটনা? এর সঙ্গে কোনো যোগসূত্র খুঁজতে যাওয়া ঠিক না।

এসবের কোনো যোগসূত্র না থাকলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে কাশ্মীর নিয়ে কথা বলার মধ্যেও যোগসূত্র খোঁজা ঠিক না। এই মুহূর্তে উপমহাদেশের একটি বার্নিং ইস্যু হচ্ছে কাশ্মীর। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করলে কাশ্মীর প্রসঙ্গ আসাটা স্বাভাবিক। দুটি মুসলিমপ্রধান দেশের জনগণের কাছে এটি একটি আবেগ ও স্পর্শকাতর বিষয়। অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে কাশ্মীর ইস্যুকে ধামাচাপা দেয়া সম্ভব না।

গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলে এটাতো পরিষ্কার যে আজ উপমহাদেশের অশান্তির মূলে হচ্ছে কাশ্মীর। কাশ্মীরের সমস্যা সমাধান হলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কী নিয়ে বিরোধ থাকে! আর ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ ছাড়া উপমহাদেশে, সার্কের দেশগুলোর মধ্যে বড় কোনো বিরোধ রয়েছে? সুতরাং এই উপমহাদেশে অশান্তির মুখ্য ইস্যু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আলাপে উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়।

আমার স্পষ্ট মনে আছে ২০০১ সালে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে আগ্রায় গিয়েছিলাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের ঐতিহাসিক আগ্রা সামিট কাভার করার জন্য। দিল্লি থেকে বাসস প্রতিনিধি এবং প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান প্রেস সেক্রেটারি এহসানুল করিম হেলালও যোগ দেন। কয়েক হাজার সাংবাদিক জড়ো হয়েছিল সারাবিশ্ব থেকে, সেই সংবাদ সংগ্রহের জন্য। কিন্তু দুইদিনের ওই রাজকীয় আয়োজন কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে- যৌথ ঘোষণায় পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে ‘কাশ্মীর একটি কোর ইস্যু’ শব্দ কটি স্থান না পাওয়ায়। পুরো দিন-রাত চেষ্টা করেও তারা একমত হতে পারেননি। রাতভর জেগেছিলাম আমরা- যৌথ ঘোষণা নিয়ে দুই দেশ একমত হতে পারেনি, এই এক লাইন বাক্য আনুষ্ঠানিকভাবে শোনার জন্য।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান ১৯৪৭, ১৯৬৫ সালে পূর্ণাঙ্গ এবং ১৯৯৯ সালে সীমিত আকারে যুদ্ধ করেছিল। বাজপেয়ী-মোশাররফ মিলে সম্পর্কের বরফ গলিয়ে পানি করেছিলেন এবং কাশ্মীর তাদের প্রধান সমস্যা এই তর্কে সেই পানিকে আবার বরফ বানিয়ে যে যার পথে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। পারভেজ মোশাররফের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য পরদিন দিল্লি থেকে ইসলামাবাদ ছুটে গিয়েছিলাম আমিসহ অনেক সাংবাদিক। সুতরাং কাশ্মীর পাকিস্তান এবং ভারতের রাজনীতিতে কতটা স্পর্শকাতর বিষয় অনুমান করতে পারি।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা উল্লেখ করতে হয়। ভারত বিভক্তির পর যখন হায়দ্রাবাদের নিজাম বাহাদুর পাকিস্তানে যোগ দিলেন আর কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতে যোগ দিলেন। তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ভারত সফরে ছিলেন। সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে যখন দিল্লিতে বৈঠক হয় তখন লিয়াকত আলী খানকে প্যাটেল বলেছিলেন আমাদের সমস্যা এখন সহজ হয়ে গেছে। আমরা এখন হায়দ্রাবাদ আর কাশ্মীর বিনিময় করব। পাকিস্তান ভারতকে হায়দ্রাবাদ দিয়ে দেবে আর ভারত পাকিস্তানকে বিনিময়ে কাশ্মীর দেবে। এই সিদ্ধান্তে মেনে নিলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে মূলত কোনো মৌলিক বিরোধ থাকত না।

গত সাত দশক ধরে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ মারামারি-কাটাকাটি সবই কাশ্মীর নিয়ে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পূর্বপুরুষের বাড়ি কাশ্মীর। তারা কাশ্মীরের ঠাকুর। মুঘলদের সময় তারা মুঘল দরবারে মুন্সির কাজ করতেন। আর এলাহাবাদে বসতি করেছিলেন। নেহরুর কারণে কাশ্মীর পাকিস্তানের হয়নি বা স্বাধীন অস্তিত্ব পায়নি। পরে কাশ্মীর স্পেশাল মর্যাদা নিয়ে, চুক্তি করে ভারতের সঙ্গে রয়ে গেছে। চুক্তি অনুয়ায়ী ভারতের কোনো আইন কাশ্মীরের সংসদে অনুমোদন ছাড়া কাশ্মীরের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। কিন্তু ভারত কাশ্মীরের সঙ্গে তাদের করা চুক্তির বরখেলাপ করেছে।

পরিশেষে বলতে চাই যে, ইমরান খান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন তাতে এত বিচলতি হওয়ার কিছু নেই। ইমরান খান কয়েক মিনিট কথা বলাতে বাংলাদেশ তার কাশ্মীর নীতি বদলে ফেলবে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও কাশ্মীর নিয়ে কথা বলে পাকিস্তান তার কাশ্মীর নীতির পরিবর্তন করতে পারবেন না। কে কী বলল, মোদি এবং তার ‘গদি মিডিয়া’ সেটা না ভেবে বরং ভাবা উচিত- কত দ্রুত কাশ্মীরে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়; সেখানকার মানুষগুলো কবে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পাবে, সেটি। তা না হলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান নয়, পুরো উপমহাদেশের মুসলমানরা কাশ্মীরে ভারতের নির্যাতন মেনে নেবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]