জঙ্গিবাদী সংগঠনের অপতৎপরতা


প্রকাশিত: ০৩:১৬ এএম, ০৪ নভেম্বর ২০১৫

সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ভেতর দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যার পর জঙ্গিবাদী সংগঠনের তৎপরতার সঙ্গে জামায়াত-বিএনপি’র রাজনৈতিক হঠকারিতা এখন বিশ্লেষণের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আইএস আছে কি নাই এ বিতর্কের চেয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর আচার-আচরণ কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করছেন। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করা এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। মন্ত্রী পরিষদের কেউ কেউ বলেছেন, ঢাকা ও রংপুরে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা আর পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে গ্রেনেড হামলা একই সূত্রে গাঁথা। অন্যদিকে ২৮ অক্টোবর একটি দৈনিকের সংবাদ হলো, বিমানবন্দর থেকে দেশি-বিদেশি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার পরিকল্পনা করেছিল জামায়াত-বিএনপি। পত্রিকাটির মতে, হত্যা, সন্ত্রাস, জ্বালাও পোড়াও, অবরোধ-হরতালসহ নাশকতার বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়ে ব্যর্থ হয়ে জঙ্গি গ্রুপগুলোর সদস্যদের মাধ্যমে দেশে নাশকতার পরিকল্পনা করছে এ দুটি রাজনৈতিক দল। নাশকতার প্রতি পক্ষপাতিত্ব যেকোনো রাজনৈতিক দলকে জঙ্গিবাদী সংগঠনের তকমা দেবে এটাই স্বাভাবিক।

কারণ যে কোনো ‘যুদ্ধবাজ’ সংগঠনকে ‘জঙ্গি’ এবং তাদের মতবাদকে ‘জঙ্গিবাদ’ বলা হয়ে থাকে। জঙ্গিবাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘যুদ্ধকেই’ তারা একটি আদর্শ বলে গ্রহণ করে। সহিংসতা তাদের মোক্ষম হাতিয়ার। জঙ্গিবাদীরা আক্রমণাত্মক আদর্শের অনুসারী এবং নিজেদের মতাদর্শকে তারা সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে। এদেশের জঙ্গিবাদীরা তাদের মতাদর্শের ধর্মীয়করণ ঘটিয়েছে। যেমন ইসলামী জঙ্গিবাদ। আর সেই বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় চেতনা ও মতাদর্শের আধিপত্য কায়েমের জন্য সেই মতাদর্শের শত্রুদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র নিষ্ঠুর ক্ষমাহীন সংগ্রামের ঘোষণা দিয়ে উদার মানবতাবাদ ও গণতন্ত্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফ্যাসিবাদী হিটলারের মতোই সব জঙ্গিবাদীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আক্রমণ, বলপ্রয়োগ এবং যুদ্ধ করে নিজের মতবাদ ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। মূলত ধর্মীয় জঙ্গিবাদীরা নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। যেমন ইসলামী জঙ্গিরা সব বিধর্মীর বিরুদ্ধে জিহাদ, ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের আহ্বান জানায়। কেবল ব্যক্তি নয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মুসলমান শাসক তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে থাকলে সহিংস কর্মকাণ্ড ও অপপ্রচারের মাধ্যমে সেই ক্ষমতাবানদেরও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় জঙ্গিরা।

বাংলাদেশে এ যাবত চিহ্নিত জঙ্গি দল, গ্রুপ বা শক্তির সংখ্যা অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাতের হিসাব অনুসারে মোট ১২৫টি। তাঁর মতে এদের মধ্যে কোনটি হয়তো শুধু একটি ইউনিয়নের মধ্যেই কাজ করছে। কোনটি হয়তো একটি অঞ্চলে কাজ চালায়, কোনটি সারাদেশে কাজ করে আবার কোনটির নেটওয়ার্ক হয়তো আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিস্তৃত রয়েছে। এই ১২৫টি সংগঠনের কোনটিই কোনটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, যদিও আপাতদৃষ্টিতে এদের নাম, কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব পরস্পর পৃথক বলে মনে হয়, কিন্তু এদের মূল রাখিবন্ধনের ক্ষেত্রটি হচ্ছে ইসলাম কায়েমের জন্য ‘রাজনৈতিক ক্ষমতা’ দখলের অভিন্ন লক্ষ্য। ড. আবুল বারকাতের মতে এদের সবার গুরু হচ্ছে প্রধান ইসলামী রাজনৈতিক দল ‘‘জামায়াতে ইসলামী’’। এ দলটি বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সুকৌশলে ইসলাম, আমেরিকা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সবার কাছেই নিজেকে গ্রহণযোগ্য রাখতে সক্ষম হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই দল একই সঙ্গে ‘পিস কমিটি’ এবং ‘বদর বাহিনী’ গঠন করেছিল। এখনো এর একটি ধারা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের তৎপরতায় লিপ্ত থাকে আর তারই পরিপূরক আরেকটি ধারা গোপন সশস্ত্র জিহাদের প্রস্তুতি ও তৎপরতায় লিপ্ত। দুটিই পরিচালিত হয় সাধারণ একটি ধর্মীয় ভাবাদর্শ দ্বারা।

বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ১৯৭২ সালে আমরা যে সংবিধানটি পেয়েছিলাম তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলেছিল এবং তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বাভাবিকভাবেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশের ইতিহাস উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেন জেনারেল জিয়া। তাঁর শাসনকালেই ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি পুনরায় শুরু হয় এবং ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করে। ১৯৮০-এর দশকে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে আমেরিকা ও পাকিস্তান আফগানিস্তানকে সহায়তা করে। এই যুদ্ধে আফগানিস্তানের পক্ষে জামায়াত-শিবিরের সদস্যসহ বেশ কিছু বাংলাদেশী অংশগ্রহণ করে। এরা পাকিস্তানে আইএসআই-এর অধীনে এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পরে এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক বাংলাদেশি প্যালেস্টাইন ও চেচনিয়া যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিল। এরা প্রায় সবাই বাংলাদেশে ফিরে আসে। এসব যুদ্ধ ফেরত সদস্যরাই পরে বাংলাদেশে আইএসআই/ তালেবান ও আল-কায়দার স্থানীয় সদস্য হিসেবে এদেশে আইএসআই/ এলইটির (লস্কর-ই-তৈয়বা) এজেন্ট হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

মূলত আশির দশকের পর জামায়াতসহ মৌলবাদী সংগঠন ও তালেবানপন্থী গোষ্ঠী সংগঠিত হয়ে রাজনীতির আড়ালে ও ইসলামের নামে জঙ্গি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বাংলাদেশকে মৌলবাদী ও তালেবান রাষ্ট্র বানানোর একই অভীষ্ট লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। ১৯৯১-এ জামায়াতের সমর্থনসহ বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ১৯৯২ সালে জামায়াতের সহযোগিতায় ইসলামী জঙ্গি সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদ’ আত্মপ্রকাশ করে প্রকাশ্যে জিহাদের ঘোষণা দেয়। পরে কথিত জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামী শাসন চালুর অভিন্ন আদর্শে জামায়াত ও ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ চালাতে থাকে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৬ পর্যন্ত সারাদেশজুড়ে জঙ্গিবাদের বিস্ময়কর উত্থান বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়। কারণ জোট প্রশাসন জঙ্গিদের প্রত্যক্ষ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ২০০৪ সালে সারাদেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণের কথা আমরা ভুলিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৯ মার্চ ২০০৭ সালে যে শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর করে তাদের সবারই জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই অতীতে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৫ জুন ২০০৭ সালের দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজন জেএমবি সদস্য অতীতে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নান তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হামলার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর এবং ইসলামী ঐক্য জোট নেতা মুফতি শহিদুল ইসলামের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ‘ইসলামী সমাজ’, ‘আল্লাহর দল’ বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন। জামায়াতে ইসলামের একাংশ বের হয়ে তৈরি হয়েছিল ‘ইসলামী সমাজ’ আর ‘আল্লাহর দলে’র প্রতিষ্ঠাতা ছিল ছাত্রশিবিরের কর্মী। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পথ চলা শুরু হলে এসব জঙ্গি সংগঠন সুযোগ খুঁজতে থাকে হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত করার জন্য। আর জামায়াতের শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভিন্ন পন্থার সন্ধানে চলতে থাকে তাদের ক্যাডার বাহিনী। তারা এখন ‘হিযবুত তাহরির উল্লাই’য়াহ বাংলাদেশ’, ‘হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ’ (হুজি)সহ আরো অনেক জঙ্গি সংগঠনকে তাদের পতাকাতলে একত্রিত করেছে। আর কর্মীসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মগজ ধোলাই করার জন্য ধর্মভিত্তিক বিচিত্র কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কর্মসূচি হলো বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো; ধর্মের নামে ভুুল শিক্ষা দিয়ে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে উদ্দীপনা জাগানো।

চলতি বছর (২০১৫) জঙ্গিবাদের অপতৎপরতা পুনরায় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। কয়েক বছর আগে থেকেই  ‘হিযবুত সরকার-উৎখাতের ষড়যন্ত্র’ করছে; উপরন্তু ‘নিষিদ্ধ হিযবুতের প্রকাশ্য তৎপরতা’ বর্তমান সরকারের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জঙ্গিবাদীদের উদ্বেগজনক অপতৎপরতার দৃষ্টান্ত। বিশেষত সরকার যখন সজাগ দৃষ্টি রেখেছে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের কর্মকাণ্ডের ওপর। সেই সুযোগে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরির। শেখ হাসিনা সরকার দেশকে ‘ফেরাউনি রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে অভিযোগ করে ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমে দেশবাসীকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। হেফাজতের মতো সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে হিযবুত তাহরির। এলক্ষ্যে সংগঠিত করা হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সংগঠনের মুখপত্র ‘তাহরির ম্যাগাজিনে’ নিয়মিত কুৎসা রটনা করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে।

জঙ্গিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম হিযবুত তাহরিরের বাংলা অর্থ ‘মুক্তির দল’। ইসলামি মতাদর্শভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হিযবুতের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংগঠনটিকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে সংগঠনটি। সন্ত্রাসকে লালন ও উৎসাহিত করার মতো পরিবেশ সৃষ্টিকারী হিযবুত তাহরির ১৯৫৩ সালে ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ধীরে ধীরে আফ্রিকা, ইউরোপ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বেশকিছু আরব দেশ এবং রাশিয়া ও তুরস্কসহ বিশ্বের ২০টির মতো দেশে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলটির বিরুদ্ধে পৃথিবীর কয়েকটি দেশের সরকার উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। হিযবুত তাহরিরের সদস্যরা ফিলিস্তিনীদের আত্মঘাতী বোমা হামলাকে ন্যায্য কাজ বলে মনে করে। ২০০৬ সালের আগস্টে দলটির আন্তর্জাতিক নেতা আতা আবু রাশতা কাশ্মীরের হিন্দু, চেচনিয়ার রুশ এবং ইসরাইলের ইহুদীদের হত্যা ও ধ্বংস করার জন্য তাদের সদস্যদের আহ্বান জানান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদের পরিচয় হলো একটি মৌলবাদী গুপ্ত সংগঠন হিসেবে; যারা সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক এবং জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধের প্রচারণা চালাচ্ছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে হামলায় ব্যবহৃত বিমান ছিনতাইকারীদের মধ্যে জায়াদ জারাহ, মারোয়ান আলশেহী ও মোহাম্মদ আতা জার্মানিতে হিযবুত তাহরির সদস্য ছিল। অবশ্য এর আগে থেকেই দলটি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ ও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি ও হিযবুত তাহরির এবং অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর মেলবন্ধন রয়েছে। অর্থাৎ এদের মূল লক্ষ্য সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের মাধ্যমে তালেবানী রাষ্ট্র বা খিলাফতের ব্যবস্থা কায়েম করা। সন্ত্রাসবাদের কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবার পর বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে দলগুলো।

কিছুদিন আগেও হিযবুত তাহরির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে ব্যর্থ হয়ে গুপ্ত হামলা, পুলিশের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ ও জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সরকার-বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিল। এখন তারা আবার প্রকাশ্যে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। উল্লেখ্য, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জেএমবি’র পাশাপাশি হিযবুতরাও ব্যাপক ছাড় পেয়েছিল। জরুরি অবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জেহাদী জোশে দৈনিক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মিছিল ও লিফলেট বিলি করে, পত্রিকা পুড়িয়ে এবং কুশ পুত্তলিকা দাহ করে জঙ্গিপনার পরিচয় দেয় দলটি। নিষিদ্ধ দলটি বর্তমানে এসএমএস, ই-মেইল ও ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো অফিস ছাড়াই গোপনে নিজেদের মধ্যে এভাবে যোগাযোগ হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে লিফলেট, বুকলেটসহ নানা ধরনের পুস্তিকা।এক শ্রেণির শিক্ষিত ও মেধাবী শিক্ষক-ছাত্ররা নেশার মতো তাদের পিছনে ছুটছে। যাদের সাধারণ মানুষ ঘৃণা করে; যাদের ন্যূনতম নীতি-আদর্শ নেই; যারা মানবতাবোধে উজ্জীবিত নয় তাদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-ছাত্ররা বাংলাদেশকে গভীর সঙ্কটের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ২০০৯ সালে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও সংগঠনটির কার্যক্রম থামেনি। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার কথিত নায়ক মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে সেনাবাহিনী জানিয়েছে। ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে উগ্রবাদী এই সংগঠনটির সম্পৃক্ততা প্রকাশ পাবার পর এই বিষয়ে সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে দেখা গেছে।   

বিভিন্ন মৌলবাদী ও জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য আমাদের করণীয় হিসেবে ইন্টারনেট, ব্লগ ও পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত, বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামত এবং পরামর্শগুলো এখানে উল্লেখ করা হলো। জঙ্গিরা ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফতের দাওয়াত দেয়; কোরান ও সুন্নাহর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সেই খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা বোঝায়। অথচ ইসলাম বিষয়ে এদের জ্ঞান খুবই সীমিত। কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। ক) জঙ্গিগোষ্ঠীরা পবিত্র কোরানের কথা বললেও তাদের জ্ঞানবুদ্ধির বাইরে সে গ্রন্থের আয়াত বিশ্বাস করে না তারা। অথচ কোরানের প্রত্যেকটি আয়াতকে শর্তহীনভাবে প্রত্যেক মুসলিমকে বিশ্বাস করতে হবে। কেউ যদি একটি আয়াতকে অস্বীকার করে বা অবিশ্বাস করে সে আর মুসলিম থাকবে না। খ) তারা ইসলাম বিশ্বাস করাকে ইমোশনাল হিসেবে নিয়েছে ফলে পৌত্তলিকতার পর্যায়ে তাদের ধর্মবিশ্বাস। গ) কবরের আজাবকে তারা বিশ্বাস করে না। অথচ এই বিষয়ে সহীহ হাদিস ও কোরানের আয়াত রয়েছে। রাসুল নামাজে শেষ বৈঠকে কবরের আজাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। মুতাযিলা সম্প্রদায়ও এই কবরের আজাবকে বিশ্বাস করত না। ঘ) এরা ইলমুল কালামে বিশ্বাসী অর্থাৎ কোরান এবং হাদিসের ওপরে এরা যুক্তিকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এই ইলমুল কালাম আকিদাকে অস্বীকার করে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম শাফেঈ (রহ.) এই ইলমুল কালামদের বিদআতী আখ্যায়িত করেছেন এবং যারা ইলমুল কালাম ব্যবহার করত তাদের শাস্তির ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দিতেন। ঙ) মুতাযিলা, মাতুরিদী, আশআরী সম্প্রদায়ের আকিদার সঙ্গে জঙ্গিবাদী মতাদর্শের যথেষ্ট মিল রয়েছে। অর্থাৎ এখানে স্পষ্ট যে, জঙ্গি সংগঠনগুলোর ইসলাম সঠিক ইসলাম নয়। তারা মানুষকে প্রথমেই খিলাফতের দাওয়াত দেয়; মুসলিম হয়েও মানুষটির ঈমান না থাকলে চলে; এমনকি শিরক-বিদাতে লিপ্ত থাকলেও তাদের সমস্যা নেই। মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন হয়েছে আল্লাহর আনুগত্য, রাসূলের সুন্নাহ না মানার কারণে। তারা এই বিষয়টি কখনো উল্লেখ করে না। তারা খিলাফতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে রাসূলের প্রদর্শিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। রাসূলের সুন্নাত ছিল মানুষকে আগে ঈমান সম্পর্কিত শিক্ষা দেয়া, তাদের আকিদা ঠিক করানো, শিরক থেকে মুক্ত করানো। ধর্মীয় জঙ্গিরা এর কিছুই করে না। তারা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা হাস্যকর। জামায়াত, হিযবুত তাহরির ও অন্যান্য মৌলবাদী দল একত্রিত হয়ে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একজন বাঙালি ও শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করা আর আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা একই কথা।

মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে জঙ্গি সংগঠনগুলো একত্রিত হয়েছে। এদের উস্কানিদাতা হিসেবে বিএনপির নামও উচ্চারিত হয়ে থাকে। মানবতাবিরোধী চক্র যারা নাশকতার মাধ্যমে দেশকে পাকিস্তান বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে তাদের কোল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে; উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তাদের অপকৌশল রুখতে হবে; তাদের জন্য মানুষের জীবন যেন ধ্বংস না হয় সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আর তাহলেই দেশে জঙ্গি তৎপরতা সমূলে উৎপাটিত হবে।

লেখক:  অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

এইচআর/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :