ফরেনসিকের দানব!

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৪৩ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২১

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসিমুল ইসলাম

যারা একসময় অনেক স্বপ্ন নিয়ে ফরেনসিক মেডিসিনে ক্যারিয়ার গড়তে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, মেডিকোলিগ্যাল সার্ভিসের প্রকাশিত কু-কর্মে আজ তাদের সেই স্বপ্ন অনেকটাই ফিকে হতে বসেছে। যারা এ বিষয়ে কর্মরত আছেন তারা হতাশ, তাদের অনেকেই এ বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, নতুনদের এমুখো হওয়ার গতিও মন্থর।

শুরু থেকে কিছু দানবের হাতে পড়ে ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়টি আজ বড়ই কোণঠাসা। সারাবিশ্বের দ্রুত বিকাশমান এই বিষয়টি বাংলাদেশে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। যোগ্য ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের এখন এতটাই আকাল যে দেশের প্রধান মর্গ থেকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেখে তা সহজেই অনুমেয়। শুরুতেই বলে নেয়া ভাল যে একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেখেই অন্য ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের স্ট্যান্ডার্ড বুঝতে পারেন। আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেখে সে দেশের স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হালচাল বোঝা যায়।

সম্প্রতি দেশের কিছু ময়নাতদন্তের ঘটনা আমাকে আজ কলম ধরতে বাধ্য করল। আজকের আলোচনায় পটুয়াখালী বাঊফল উপজেলার মৃত সোহাগ গাজি এবং পাবনার মৃতা রওশন আরার ময়নাতদন্ত বিশ্লেষণ করব কেননা এ দুটি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সর্বত্র যেমন সাড়া জাগিয়েছে, তেমনি কাঁপন ধরিয়েছে ময়নাতদন্তকারীসহ সংশ্লিস্ট অনেকের।

প্রথম ঘটনার বিবরণে যা জেনেছি তা হল, মৃত সোহাগ গাজী তার নিকটাত্মীয়ের আঘাতে জখমপ্রাপ্ত হয়ে পটুয়াখালীর বাউফল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি হয়। পরবর্তীতে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য প্রথমে বরিশাল শের এ বাংলা মেডিকেল কলেজ এবং তারপর ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে দায়িত্বশীলের আদেশ নির্দেশে এক মানব ময়নাতদন্তটি সম্পন্ন করে মৃত্যুর কারণ সড়ক দুর্ঘটনাজনিত বলে প্রতিবেদন জমা দেন।

এখানে উল্লেখ্য যে পূর্বে চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রতিটি হাসপাতালের ছাড়পত্রে আঘাতের কথাটি লিপিবদ্ধ ছিল। এক্ষণে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে এ যাত্রায় দায়িত্বপ্রাপ্তর নেতৃত্বে বোর্ড গঠন করে পুনঃ তদন্তে পূর্বে কৃত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনকে সঠিক মর্মে প্রত্যায়ন দেওয়া হয়। এরপর আদালতের নির্দেশে তিনজন সিনিয়র অধ্যাপকদের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি এবং বিএমএন্ডডিসি এর নির্দেশে ছয় সদস্য সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত সম্পন্ন করে। যেখানে মানবদের স্বীকারোক্তিতে দানবের দানবীয় কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে। করোনাজনিত বিলম্বে হলেও অচিরেই তা আলোর মুখ দেখবে বলে আশা করা যায়।

দ্বিতীয় ঘটনার মৃতা রওশন আরার ঘটনাটি যেমন জেনেছি তা হল, মৃতা তার কিডনি অপেরেশনজনিত জটিলতায় বিএসএমএমইউ হাসপাতালে মারা যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত ময়তদন্তকারী নিজেই তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। ভুক্তভোগী পরিবার অনেক দেন দরবার করে দু বৎসর পর আবার বলছি, দু বৎসর পর যে প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন সেখানে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়,
১। ব্রেইন টিউমর
২। রেনাল ইন্সাফিসিয়ান্সি
৩। ভেন্ট্রিকুলার হাইপারট্রফি অন এন্টেমরটেম (!)।

উভয়ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে ঘটনাক্রমের সাথে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্টতা নেই বললেই চলে। এখানে দানবীয় ক্ষমতায় ধরাকে সরা জ্ঞান করে যা করা হয়েছে তা ফরেনসিক বিদ্যা নয়। ফরেনসিক মেডিসিন একটি সায়েন্স হলেও এখানে যা ইচ্ছা তাই লিখে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। কেউ যদি ধারণা করেন যে এখানে ময়নাতদন্তকারীর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল বা রয়েছে তা এড়ানোর কোন উপায় নেই।

এই প্রতিবেদন দেশের মেডিকোলিগ্যাল ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। সুখের খবর যে, দুই বৎসর পর মনগড়া প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থা এই দানবীয় কর্মকাণ্ডের হোতাকে ২৫,০০০০০ (পঁচিশ লক্ষ ) টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের সুপারিশ করেছেন। সর্বশেষ যা জানা গেছে, সেই মহারথী, দি মেডিকোলিগাল সোসাইটিকে ব্যবহার করে এই লজ্জাজনক শাস্তি থেকে উত্তরনের পথ খুঁজছেন।

একজন সত্যিকারের ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট আন্তর্জাতিক প্রথা অনুযায়ী ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ লিখে থাকেন। এখানে যা মানা হয়, তা হল, একটি কারণের সাথে অন্যটির ওভার ল্যাপ বা একটির সাথে অন্য কারণ কোনভাবেই যুক্ত করা যাবে না। উল্লেখিত প্রতিটি কারণের সাথে কেন এবং কিভাবে তা প্রতিষ্ঠিত হলো সেটিও উল্লেখ করতে হবে। প্রতিটা উল্লেখিত কারণের সাথে প্রমাণ যুক্ত করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এখানে মনগড়া কিছু লেখার বিন্দু মাত্র সুযোগ নেই। ধরুন একব্যক্তি মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশনে মারা গেল। তখন লিখতে হয় কোন ধমনীতে কত % ব্লক পাওয়া গেছে এবং সাথে খালি চোখে দেখা ছবি এবং হিস্টপ্যাথলজিকাল স্লাইডের ছবি সংযুক্ত করতে হয়।

কৃত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রদানে দু বৎসর দেরি হওয়ার পেছনে যে যুক্তিই দাঁড় করানো হোক না কেন তা ধোপে টিকবে না। অসৎ উদ্দ্যেশে দেরি করে প্রতিবেদন দেওয়া ফরেনসিকে কর্মরত ছোট ছোট দানবদেরও অতি পুরাতন অভ্যাস। আমি ২০০১-২০০২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান থাকাকালীন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। সে সময় সেই জালে সততার মুখোশ পরা অনেকেই ধরা পড়েছিল।

আমি দেখিয়েছিলাম অর্ধ লেখা প্রতিবেদন, প্রাপ্তির আশায় কিভাবে বৎসরের পর বৎসর তা ফেলে রাখা হয়েছিল। আমার এই উদ্যোগের ফলে মন্ত্রণালয় ২০০১-২০০২ সালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার এক আদেশ জারি করেছিল, যা বোধকরি আজও বহাল আছে। ভেবে অবাক হই যখন শুনি মর্গে মৃতা রওশন আরার লাশ ময়নাতদন্ত করতেও তিন দিন ফেলে রাখা হয়েছিল!

আমার জানা মতে বাংলাদেশের ফরেনসিক মেডিসিন বিষয়ে এযাবৎ দুজন মহাদানবের আগমন ঘটেছে। যার একজনের করুণ মৃত্যুর ঘটনা শুনলে আজও শিউরে উঠতে হয়। আর একজন এখন বর্তমান। বর্তমানের দানবকে জেলে পুরেও তাকে চার দেয়ালে আটকে রাখা যায় নি, দুদকের জালও সে নাকি ছিন্ন করেছে, উত্তরা র‌্যাব তাকে ডেকে নিয়ে চা নাস্তা খাইয়েছে জানা গেলেও সেখান থেকে বের হওয়ার পর শরীরের কালশিটে জখম কেন হয়েছে সে ব্যাপারে কিছু জানা যায় নি। তার দানবীয়তা থেকে নিজ বিষয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের যেমন রেহাই মেলে নি তেমনি খালি হাতে কেউ ফরেনসিকের সেবা নিতে পেরেছেন বলে জানা যায় নি। পরীক্ষা পাসে আর্থিক লেনদেন সেখানে ওপেন সিক্রেট। এই দানব যাদের নাম ভাঙ্গিয়ে এতদিন তার দানবীয় কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তারাও ঘটনা অবহিত হয়ে এসবের দায়ভার না নিয়ে তার শাস্তি প্রত্যাশা করছেন। রাতের পর দিন আসবেই। ধরনীর সকলেই তেমনি অধীর আগ্রহে এক সুস্থ সকালের প্রতীক্ষায় তাকিয়ে আছে।

লেখক : ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন প্রধান। বর্তমানে অধ্যাপক, ফরেনসিক মেডিসিন, ইউনিভার্সিটি টেকনোলোজি মারা মালয়েশিয়াতে কর্মরত।
[email protected]

এইচআর/এমএস

আমি দেখিয়েছিলাম অর্ধ লেখা প্রতিবেদন, প্রাপ্তির আশায় কিভাবে বৎসরের পর বৎসর তা ফেলে রাখা হয়েছিল। আমার এই উদ্যোগের ফলে মন্ত্রণালয় ২০০১-২০০২ সালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার এক আদেশ জারি করেছিল, যা বোধকরি আজও বহাল আছে। ভেবে অবাক হই যখন শুনি মর্গে মৃতা রওশন আরার লাশ ময়নাতদন্ত করতেও তিন দিন ফেলে রাখা হয়েছিল!

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]