আমরা যেন অসংখ্য শিশুর অনুভূতিকে খুন করে না ফেলি!


প্রকাশিত: ০৭:০০ এএম, ০৫ মার্চ ২০১৬

গত বছর রাজধানী অটোয়ায় পার্লামেন্ট ভবনে যেদিন একজন বন্দুকধারীর হামলার ঘটনা ঘটে, তার পর দিন স্কুল থেকে ফিরেই আমার দুই মেয়ে বর্ণমালা, কথামালা মুখবন্ধ একটি খাম ধরিয়ে দেয়। ‘গোপনীয়’ লেখা চিঠি দুটোরই বক্তব্য হুবহু এক। কিন্তু দুজন দুক্লাশে, দুই স্কুলে পড়ে বলে দুটি চিঠিই এসেছে বাসায়। আগের দিনে পার্লামেন্ট ভবনে গুলির ঘটনার উল্লেখ করে চিঠিটিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, আমরা যেন ঘটনাটি নিয়ে মেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করি। আলোচনাটা কিভাবে শুরু করতে হবে, কতোটুকু করতে হবে তার একটি ধারণাও দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। ক্লাশে ইতিমধ্যে যে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষকরা আলোচনা করেছেন  তাও বলা হয়েছে চিঠিটিতে।

স্কুলের উদ্বেগের জায়গাটা ছিলো অন্যত্র। উন্মুক্ত মিডিয়া, ইন্টারনেট, টেলিভিশনের সুযোগে বাচ্চারাও ইতিমধ্যে জেনে গেছে- দেশের রাজধানী শহরে পার্লামেন্ট ভবনে ‘সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা’ ঘটেছে। এটি তাদের মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, মনে আতংক তৈরি করতে পারে। সে জন্যেই স্কুলে স্কুলে এমন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। স্কুল থেকে জানানো হয়েছে, বাচ্চাদের মনে যাতে কোনো ধরনের বিরুপ প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয়- সে জন্যে স্কুলে স্কুলে স্যোশাল ওয়ার্কার, মনস্তাত্বিকরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। অভিভাবক হিসেবে আমরাও যদি কোনো ধরনের ‘মনস্তাত্বিক সহযোগিতা’ চাই- স্কুল তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে- এই কথাও জানানো হয়েছে স্কুলের চিঠিতে। মোট কথা- কোনোভাবেই বাচ্চাদের মনে যাতে কোনো ভয় বাসা না বেঁধে ফেলে তার জন্য পুরো দেশজুড়ে কি উদ্বেগ আর প্রস্তুতি!

কানাডার পার্লামেন্ট ভবনে হামলার ঘটনা আর ঢাকার বনশ্রীতে ‘মায়ের হাতে’ দুই শিশু সন্তান খুন হওয়ার ঘটনার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। কিন্তু বাচ্চাদের মনে প্রতিক্রিয়া তৈরির ব্যাপারটা বিবেচনায় নিলে সম্ভবত দুটো ঘটনাকে খুব বেশি আলাদা করা যাবে না। বরং বনশ্রীর শিশুহত্যার ঘটনাটির প্রতিক্রিয়া আরো তীব্রতর হওয়ার আশংকা আছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম  বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলো ‘সেনসেশন’ তৈরিতে যতোটা দক্ষ, ‘সেনসিটিভিটি’র ক্ষেত্রে ততোটাই অদক্ষ। শিশু সংবেদনশীলতা সম্ভবত তাদের কাছে খুবই অপরিচিত একটি শব্দ। খুন হওয়া শিশু দুটির স্কুলের সহপাঠী, বন্ধুরা যখন পরের দিন জানলো- তাদের দুই সহপাঠী বন্ধু মায়ের হাতে খুন হয়েছে- তখন তাদের মানসিক প্রতিক্রিয়া কি হয়েছে- তা কি আমরা জানি? টেলিভিশনে মায়ের হাতে শিশু সন্তান খুন হওয়ার খবর শুনে শুনে সারা দেশের শিশুদের মনে কি কোনো আতংক তৈরি হয়েছে? নিজ মায়ের প্রতি কোনো ধরনের সংশয়? ভয়? আমরা এগুলো জানি না। শিশুদের মনে যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেই বিবেচনাবোধটুকুই হয়তো বা আমরা অর্জন করতে পারিনি।

তাহলে কি এই হত্যার খবর প্রচার করা ঠিক হয়নি?- সে কথা আমি বলছি না। ঘটনা ঘটেছে, সেটি অবশ্যই প্রচার হবে। কিন্তু উপস্থাপনা কিভাবে হবে, তথ্য কতোটা পরিবেশিত হবে- এগুলো অবশ্যই বিচেনার বিষয়। আমাদের সাংবাদিকরা এখন হরহামেশা বিদেশে যান, পুলিশ-র‌্যাবের কর্মকর্তারাও যান। উন্নতদেশগুলোতে এই ধরনের ঘটনা কিভাবে পরিবেশিত হয়, তার অভিজ্ঞতা উনাদের থাকারই কথা। শিশু মনে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বিদেশের দিকেও তাকাতে হয় না। নিজের বিবেচনাবোধই করণীয় নির্ধারণ করে দেয়।

পশ্চিমা দেশগুলোতে খুনখারাবী বাংলাদেশের চেয়ে কম হয় না। আমেরিকায় তো বাংলাদেশের চেয়েও বীভৎস ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেই সব ঘটনার ‘রগরগে’ বিবরণ মিডিয়া প্রচার করে না। আইন শৃংখলা রক্ষী বাহিনী ‘মৌলিক’ তথ্যের বাইরে বাড়তি কোনো তথ্যই তারা প্রচার করে না। তারা জানে- তাদের দায়িত্ব অপরাধীকে চিহ্নিত করা, অপরাধ সংঘটনের সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা যাতে অপরাধীর শাস্তি হয়। ঘটনার প্রচারণা আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচারণা যতোটা হয় অপরাধ শনাক্ত করা কিংবা সাক্ষী প্রমাণ নিশ্চিত করার কাজ ততোটা হয় না। আর মিডিয়াও পুলিশের বক্তব্যকেই এমনকি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে কল্পকাহিনী ছড়াতেই বেশি পছন্দ করে।বনশ্রীর হত্যাকাণ্ডেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। র‌্যাব এর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে যে বক্তব্য  দিয়েছেন- পশ্চিমা কোনো দেশে হলে তিনি চাকরি তো হারাতেনই, এতোক্ষণ মিলিয়ন ডলার মামলার মুখোমুখি হতেন। বাংলাদেশে হয়তো এগুলোই স্বাভাবিক ঘটনা, এগুলোই নিয়ম। কিন্তু আমরা কি ভিন্ন কিছু ভাববো না? নতুন চিন্তা করবো না?

বনশ্রীতে দুই শিশুহত্যার খবরটি ঢাকার মিডিয়া যেভাবে প্রচার করেছে, পশ্চিমের কোনো দেশের মিডিয়াই সম্ভবত এভাবে এটি প্রচার করতো না। র‌্যাব যেভাবে সংবাদ সম্মেলন করে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ঘটনার বিবরণ দিয়েছে, সেটাও তারা করতো না। পূব আর পশ্চিমের মধ্যে তফাৎ তো থাকবেই, ফলে দৃষ্টিভঙ্গিটাও ভিন্ন হবে। কিন্তু কোনো ঘটনা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে কতোটুকু বলা যায়, কতোটা তথ্য তদন্তকে প্রভাবিত করবে না, কতোটা তথ্য সমাজে, বিশেষ করে অন্য শিশুদের মনে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে না- এগুলো বিবেচনায় নেওয়া দায়িত্বশীলতার ব্যাপার। রাষ্ট্র,আইনশৃংখলারক্ষাকারী বাহিনী, মিডিয়া- সবাইকে এই দায়িত্বশীলতা দেখাতে হয়।

বনশ্রীর দুই শিশু হত্যা নিয়ে অবশ্যই আমরা কথা বলবো, আমরা যেনো দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও মাথায় রাখি। দায়িত্বশীলতার সীমা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে। তবু যেন দায়িত্বশীলতার মধ্যে থেকেই সেই বিতর্ক করি। বনশ্রীর দুই শিশু হত্যার বয়ান দিতে গিয়ে আমরা যেন অসংখ্য শিশুর অনুভূতিকে খুন করে না ফেলি।

লেখক: টরন্টোর বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক

এইচআর/এমএস