বাঁচতে হলে জানতে হবে


প্রকাশিত: ০২:০৮ এএম, ১৩ মার্চ ২০১৬

সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা বেশ নাড়া দিয়ে গেছে আমাদের বিবেকবোধকে। সত্যিই বর্তমান সময়ে আমরা কতটুকু মানবিক এ প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে প্রতিটি ব্যাক্তিসত্তাকেই।

ঘটনাঃ ১। উত্তরায় ত্রুটিপূর্ণ লাইন নির্গত গ্যাসে আগুন জ্বেলে ৫ জনের পরিবারের আহত এবং নিহত হবার মর্মান্তিক ঘটনা।

ত্রুটিপূর্ণ লাইনের জন্য বাড়িওয়ালা/গ্যাস মেকানিকের গাফিলতিকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে; কিংবা আহত শারমীনের অসাবধানতার অনেক সাবধানতামূলক পদক্ষেপ ভবিষ্যতে নেয়া যাবে। কিন্তু বিবেকহীন মানুষদের আপনি কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন?

সময় আমাদের মানতে শিখিয়েছে প্রকাশ্য রাজপথে শক্তিশালী অস্ত্রের মুখে কারও প্রাণনাশ হচ্ছে দেখে উট পাখির মত মাথা গুঁজে থাকতে হয়; কেউ বাঁচাতে যায় না, সাক্ষ্যও দেয় না প্রাণের ভয়ে। কিন্ত, দগ্ধ প্রতিবেশী কিংবা স্রেফ একজন অজানা মানুষও প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসছে দেখে পুরো ফ্ল্যাটের বাসিন্দা, দারোয়ান সবাই যখন এড়িয়ে যায়, দগ্ধ মহিলার আব্রু ঢাকতেও কেউ চাদর নিয়ে এগিয়ে যায় না তখন কিন্ত গোটা সমাজের সরল মনস্তাত্ত্বিক চিত্রটাই মোটামুটি এঁকে ফেলা যায়। এবং এ চিত্র নিঃসন্দেহে ভয়াবহ!

আমি আতংকিত, একজন একজন করে লিটমাস টেস্ট নিলে আমার খুব চেনা পাশের মানুষটিও হয়তো এই একই বিবেকহীনতাতেই ধরা পড়বে।

ঘটনাঃ২। বনশ্রীতে মায়ের হাতে দুই শিশু সন্তান খুন।
অনুগ্রহ করে এধরনের ঘটনায় হন্তারক মাকে শাপ-শাপান্ত করে কোনো ভিত্তি প্রমাণ ছাড়াই যেকোনো অভিযোগের তীর ছুড়বেন না। নিজে একজন মা হয়েও জানি একজন মায়ের পক্ষে মানসিক ভারসাম্য না হারালে বা অনন্যোপায় নাহলে নিজের সন্তানকে খুন করা অসম্ভব। যেমন, ‘পোস্টপার্টাম বেবি ব্লু ’ নামক প্রসব পরবর্তী তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতা কি ভয়ানক রোগ হতে পারে একজন মাকে একেবারে কাছ থেকেই দেখেছি, যিনি কিনা ১১ বছর সন্তানের আশায় রীতিমত সাধনা করে গেছেন। অথচ বাচ্চাটি হবার পরই তার মনে হতে লাগলো তার পৃথিবীটা আগে কত মুক্ত-স্বাধীন ছিল। বাচ্চাটি যেন তার জীবনের সব রং, রূপ, শ্রান্তি, স্বাধীনতা একেবারে কেড়ে নিল। বাচ্চার কোনোরকম খাওয়া-গোসলও তিনি করতে পারছিলেন না।

বনশ্রীর ঘটনায় অর্থনৈতিক টানাপড়েন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাই যদি কারণ হিসেবে প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রে আমি শিশুদুটিকে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহতার শিকার বলতে চাইবো। মা এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার চাপ নিতে পারেননি, যে কোনো কারণেই হোক। সাদা চোখে কিছু আলোচনা করতে চাই।

আমরা জন্মগতভাবে কিছু জ্ঞান সংগে নিয়েই আসি। কিভাবে শ্বাস নিতে হয়, খাবার- পানীয় গিলতে হয়, হাসতে-কাঁদতে হয়, অন্ধকারে ভয় পেতে হয়- এসব কেউ শিখিয়ে দেয়না সদ্যোজাত শিশুকেও। এছাড়া অন্য বেশিরভাগ জ্ঞানই শিখে নিতে হয়, অর্থাৎ লব্ধ জ্ঞান। বাড়িতে, স্কুল-কলেজে, বই-পুস্তক, টিভি রেডিও, পত্রিকা পড়ে শেখা, অফিসে বা কোনো ইন্সটিটিউটের প্রশিক্ষণে শেখা জ্ঞান। পাঠ্য-পুস্তক পড়ানো ছাড়া সামাজিক, মানসিক শিক্ষা বা বিশেষ মুহূর্তের জরুরি পদক্ষেপের প্রশিক্ষণ কোথাও কি দেয়া হয় আমাদের দেশে?

জাপানে এলিমেন্টারি স্কুলে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত কেবল আদব-কায়দা, সামাজিকতা, লৌকিকতা,  পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ঘরের কাজ শেখানো হয়। পড়ানো হয় ক্লাসে, কিন্ত কোনো বড় পরীক্ষা নেই।  শিক্ষাকেন্দ্র, অফিস-আদালত, কলোনি, ফ্ল্যাট  সর্বত্র আগুন, ভূমিকম্প বা কোনো দৈব বা মানব সৃষ্ট দুর্বিপাকে কি কি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে তার নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অগ্নি-নির্বাপক গাড়ি, পুলিশের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স যে কোনো সময়ে সর্বোচ্চ দ্রুততায় অকুস্থলে পৌঁছোবার জন্য কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে হয় না। অন্যসব গাড়িকেই আবশ্যিকভাবে সরে জায়গা ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়।

গেল মাসেই আমাদের শহরের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ সরকারি কলোনিতে দোতলায় নিজস্ব গ্যাস হিটার থেকে আগুন লাগলো। বাড়ির বাসিন্দা একাকী বৃদ্ধা নিয়মিত দেয়া প্রশিক্ষণ মতোই সুন্দর নেমে গেলেন। ১০ মিনিটে অগ্নি-নির্বাপক গাড়ি এলো। নেমে গেল এবং উদ্ধার হলো বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারাও। ফ্ল্যাটটা পুড়লো; পাশের, উপর-নিচের ফ্ল্যাটগুলিও কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হলো। কিন্তু দ্রুত বাসিন্দারা অন্যত্র স্থানান্তরিত হলো। এক বাংলাদেশি পরিবারও থাকতো সেই বিল্ডিং এর পাঁচতলায়। তাদের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, কিন্তু মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে ১৫ দিনের মাথায় তারাও অন্য ফ্ল্যাটে উঠতে পারলেন।

উল্লেখ্য, জাপানিরা ‘প্রাইভেসি’র ব্যাপারে খুবই সংবেদনশীল। শিশু বা বৃ্দ্ধ ছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক কেউ রাস্তায় আহত হলেও তারা বড়জোর “ঠিক আছো তো?”র বাইরে কিছু জিজ্ঞেস করবে না, পাছে সে অপ্রস্তুত হয় বা তাকে কেউ ‘নিজকে সামলাতে অক্ষম’ ভেবেছে মনে করে- এই আশংকায়। কিন্তু সাহায্য প্রার্থনা করলে  তাদের এগিয়ে আসার প্রশিক্ষণ এমনই যে সামান্য ঠিকানা চিনিয়ে দেবার সাহায্য চেয়ে কোনো ব্যস্ত অফিসে ঢুকে গেলেও তাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাই এসে আপনাকে জায়গা চিনিয়ে দিয়ে যাবে।

আমাদের অন্যের নাজুক ব্যক্তিগত বিষয় জানতেও আগ্রহের সীমা নেই এবং সেই খবর ফেরি করে বেড়ানোর দ্রুততায় আমরা বার্তা সংস্থাদেরও হার মানাই। যেন এর মত দেশোদ্ধারের কাজ আর হতেই পারে না! অথচ সেই হাঁড়ির খবরের মানুষটাই আগুনে পুড়ে বাঁচার আকুতিতে আমার দরজায় কড়া নাড়লে আমরা পালিয়ে বাঁচি!  

আবারও বলছি, বর্তমানে আমাদের মনুষ্যত্ব এই পর্যায়েই এসে ঠেকেছে। এবং এজন্যই আবিশ্যক সামগ্রিক লব্ধ জ্ঞান যা আমরা এভাবে অর্জন করতে পারি;

১। স্কুলে সামাজিক, মানসিক শিক্ষা প্রজনন শিক্ষার সাথে সাথেই আবশ্যিকভাবে পাঠভুক্ত করণ।
২। নিয়মিত ভাবে সর্বক্ষেত্রে আগুন, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাসে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রশিক্ষণ।
৩। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে ‘প্রাইম টাইমে’ এসবের ওপর খুব ছোট ছোট ভকু-ড্রামার জন্য স্লট বরাদ্দ অত্র চ্যানেলের আবশ্যিক CSR (corporate social responsibility) এ অন্তর্ভুক্তি।

কোনো দেশ দরিদ্র নয়, কোনো দেশের সরকার দরিদ্র নয়। সিস্টেম তাকে ধনী গরীব করে। আমাদের দেশের মতন আবহাওয়া-প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট সুজলা-সুফলা কয়টা দেশ আছে? জাপান, সিঙ্গাপুর- যাদের নিজেদের কিছুই নেই, সিঙ্গাপুরে পানিটাও মালয়েশিয়া থেকে আনতে হতো- এদের উন্নতি শুধু রীতি এবং তার প্রয়োগের কারণেই। যে বাঙালি দেশে যত্রতত্র ময়লা ফেলে, রাস্তা-ঘাটে চিৎকার করে বাক্যবাণ না করে শান্তি পায় না, তারাই জাপানে এসে ময়লা পকেটে নিয়ে ডাস্টবিন খুঁজে ফেরে। ফোন সাইলেন্ট মোডে রেখে নিচু লয়ে ফিসফিস করে কথা বলে। কাজেই, মনুষ্যত্ত্বও যখন তলানীতে ঠেকে গেছে তখন অশনি সঙ্কেত মেনে কিছুই আর “জন্মগত জ্ঞান” আশা না করে শিখতে শুরু করি মানবিকতা, মানসিক বিকারগ্রস্থতা এবং বিশেষ মুহূর্তের করণীয়।
কারণ, বাঁচতে হলে নিজেকেই জানতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট; প্রাক্তন রিসার্চ ফেলো, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়; বিভাগীয় প্রধান, বিজনেস প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট, স্মার্ট সার্ভিস টেকনোলজিস কো. লিমিটেড, ফুকুওকা, জাপান।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]