নারী যখন মিডিয়ার পণ্য


প্রকাশিত: ১০:৫৪ এএম, ০৪ এপ্রিল ২০১৬

স্যাটেলাইট চ্যানেল খুললেই দেখা যায়, বিজ্ঞাপনচিত্রে মিডিয়ায় নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহারের মহোৎসব। বিজ্ঞাপনচিত্রে বা মিডিয়ায় নারী যে পণ্য তা যেন নিত্য-নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। যেমন ধরুন, রঙ ফর্সাকারী ক্রিম বা সুগন্ধি তেলের বিজ্ঞাপনে বৃষ্টি প্রাসঙ্গিক হতে পারে কিন্তু সেই বৃষ্টিতে ওই নারী মডেলটির সাদা শিফন বা জর্জেটের শাড়ি পরে ভিজতে হবেই সেটা মোটেই প্রাসঙ্গিক নয়।

এক্ষেত্রে আবেদনময়ী রূপে ভেজা শাড়িতে নারীর শরীরকে পণ্য হিসেবেই দেখানো হচ্ছে নাটক-চলচ্চিত্রে।

অন্যদিকে বাথটাবে একটি গোলাপ ফুলের সুবাস ছড়ানো সুগন্ধি সাবান মেখে একজন রমনী হয়ে উঠছেন ‘সোনার চেয়েও অপরূপা।’ কথা হলো, কেন শুধু নারীকেই অপরূপা হতে হবে? পুরুষের অপরূপ হওয়া নয় কেন? সত্যিই সেলুকাস, বিচিত্র এই  বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি!

বাংলাদেশের বিলবোর্ডগুলোতে মেয়েদের আধিপত্য, দেখার মতো। নুডুলস, অলংকার, আইসক্রিম, জুস, সয়াবিন তেল, জামাকাপড়ের বিজ্ঞাপন- সবকিছুতেই মেয়েরা মডেল। একমাত্র বুয়েট স্বীকৃত রডের বিজ্ঞাপনে দেখলাম না কোনো মেয়েকে। সেখানে দেখলাম একজন পুরুষ মডেলের ছবি। এ থেকে কী বুঝা গেলো? মেয়েদের জগত শুধু ঘরোয়া ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ; আর যখনই সেটা স্থাপত্যশিল্পের মতো বাহ্যিক ব্যাপারে আসে, সৃষ্টিশীলতায় আসে, মননশীলতায় আসে তখন সেটা শুধু পুরুষের দখলে!

কিন্তু কেন? এসব জায়গায় মহিলা বিশেষজ্ঞ বা প্রকৌশলী দেখালে পণ্য বিক্রি হবে না? নাকি বাংলাদেশে নারী প্রকৌশলী নেই যে, এসব বিজ্ঞাপনে নারী প্রকৌশলী দেখালে সেটা মিথ্যে ব্যাপার হয়ে যাবে?

বরাবরই আমরা আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞাপনধারাকে অনুসরণ করে চলেছি। বিশেষ করে আমাদের দেশে প্রবাহমান প্রাশ্চাত্য অপসংস্কৃতির ধারাই কালে কালে নারীদেরকে এইভাবে উপস্থাপনা করতে উৎসাহিত করছে এদেশের মিডিয়াকর্মীদের।

তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখছি, ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে বিশ্ব জয় করা, নারিকেল তেল মেখে দীর্ঘ কালো চুল বানিয়ে হাজবেন্ডের মন জয় করা কিম্বা সয়াবিন তেল দিয়ে রান্না করে হাজবেন্ডের রুচি জয় করায় মত্ত নারীরা। এগুলোতে হাতে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে- নারী, এই তোমার কাজ।

ওয়াশিং পাউডার, হারপিক, ডিশ ওয়াশিং পাউডার কিংবা সাবানের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাপড় ধোওয়া, টয়লেট পরিষ্কার করা, থালাবাসন ধোওয়া এবং রূপ ফুটিয়ে তুলে ছেলেদের মন জয় করাই শুধু মেয়েদেরই কাজ।

স্বামীর সাদা শার্ট কীভাবে আরো সাদা করা যায়, কোন ব্র্যান্ডের গয়না মা-বাবা মেয়ের বিয়েতে উপহার দেবেন- এইসবের বাইরে মেয়েদের জন্য তেমন বিজ্ঞাপন নেই। কিন্তু কেন? মেয়েদের জীবন কি শুধু এসবের মধ্যেই ঘুরপাক খায়?

মেয়েদের ভুলভাবে বিশ্লেষন ও প্রচারে ইদানীং যোগ হয়েছে অনলাইন মিডিয়া। যাদের বেশিরভাগেরই পাঠক আকৃষ্ট করা হয় মেয়েদের নিয়ে নানা ফিচার-আইটেমে। কোন অঞ্চলের মেয়েরা পাত্রী হিসেবে কেমন, কোন ধরনের মেয়েদের বিয়ে করা উচিৎ, যোগ্য স্ত্রী হওয়ার জন্য কী কী গুণ থাকা আবশ্যক ইত্যাদি বিষয়ের হাস্যকর ও অবান্তর ফিচার। যতভাবে মেয়েদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায়, যতভাবে মেয়েদের ছোট করা যায়, সবভাবেই মিডিয়া রসালো পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই যদি হয় আধুনিক যুগের নমুনা, তাহলে বেগম রোকেয়া একশো বছর আগে জন্মে বেঁচে গেছেন।

নাটক-চলচ্চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন আর সেই শাবানার দেখা মিলে না যিনি স্বামী যতই অন্যায় অত্যাচারই করুক, স্ত্রী বলে মুখ বুজে সইবেন। সেলুলয়েডে নারীর চরিত্রে পরিবর্তন এসেছে। সামনেও আসবে। আর নাটক বরাবরই নারীকে সম্মানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নারীদের অপব্যবহার বেড়েই চলেছে বিজ্ঞাপনগুলোতে। নারীকে ব্যবহার করা হচ্ছে সরাসরি পণ্য হিসেবে অথবা এমনভাবে নারীকে উপস্থাপন করা হচ্ছে যা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশের বিজ্ঞাপনের নীতিমালা অনুযায়ীও এসব বিজ্ঞাপন নীতি-সিদ্ধ নয়। মানবিক দিক থেকেও এসব বিজ্ঞাপন মানুষকে ভোগবাদী করে তোলে। কম প্রয়োজনীয় জিনিসকে বেশী প্রয়োজনীয় করে তোলে। যা ধীরে ধীরে সমাজের ভিত্তি, বন্ধনকে আলগা করে দেয়। সুতরাং বিজ্ঞাপন তৈরি এবং প্রচারের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা একান্ত আবশ্যক।

যেহেতু গণমাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো বিষয় খুব দ্রুত পৌঁছে যায় দেশের আনাচে কানাচে, তাই এই মাধ্যমগুলো হতে পারতো ছেলেমেয়ের মধ্যে বিভেদ ঘুচানোর একটা প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সেদিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতনতা, বা আগ্রহ নেই। তারা হয়তো চিন্তা করে, প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে সরে এলে মানুষ তাদের পণ্য কিনবে না, তাদের বিজ্ঞাপন জমবে না। তাই এখনও ফর্সা রঙ বা পিম্পলকেই দেখানো হচ্ছে মেয়েদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হিসেবে! তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি মেয়েদের সফলতার গল্প জানে না?

জনপ্রিয় ওয়েডিং ফটোগ্রাফার ইশরাত আমিন, কার্টুনিস্ট শিখা, ডিজে সোনিকা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, আইসিসির র্যাঙ্কিংয়ে মেয়েদের টি-টুয়েন্টি অলরাউন্ডার এবং বোলার হিসেবে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের সালমা খাতুনকে নিয়ে বিজ্ঞাপন করা যায় না?

কোন কিশোরী মডেল তার খোলা পিঠ দেখিয়ে গয়নার বিজ্ঞাপন করেছে, সেটা নিয়ে ফেসবুকে তোলপাড় হয়ে যায়। কিন্তু ২০১৩ সালে মারজান আহমেদ ফ্রিল্যান্সার ডটকমে আউটসোর্সিংয়ের কাজে ৭৩ লাখ ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে ১৩তম, বাংলাদেশে দ্বিতীয় এবং নারীদের মধ্যে বিশ্বে ১ম হয়েছিলেন, সে বিষয়ে কিন্তু ফেসবুকে দুই কলম লেখার মানসিকতা নেই কারও।

যে দেশে বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, এঞ্জেলা গমেজ, সেলিনা হোসেনরা জন্মেছেন সেই দেশের মিডিয়াতে নারীরা আর কতোকাল কেবলই পণ্য হয়ে রইবেন? হয়তো প্রশ্ন আসবে বিশ্বজুড়েই তো এমনটি। হোক না। সবাই মন্দ বলে কী আমাদের ভালো হতে নেই। চেষ্টাটাও তো করে দেখা যায়। তাই না?

লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক জনকণ্ঠ

এলএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।