প্রবীণদের জীবনে ঈদের আনন্দ: প্রয়োজন কেবল একটু ভালোবাসা

ড. হারুন রশীদ
ড. হারুন রশীদ ড. হারুন রশীদ , ডেপুটি এডিটর (জাগো নিউজ)
প্রকাশিত: ০৯:২০ এএম, ২১ মার্চ ২০২৬

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলন। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই আনন্দের সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের জীবনে ঈদ অনেক সময় উৎসবের চেয়ে দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে বাবা-মা সারাজীবন তিল তিল করে সন্তানদের বড় করেছেন, ঈদের নতুন পোশাক আর পছন্দের খাবারের আবদার মেটাতে গিয়ে নিজের শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁরাই আজ বড্ড একা।

বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠিত হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা বা উন্নত জীবনের সন্ধানে সন্তানরা পাড়ি জমাচ্ছে প্রবাসে অথবা ব্যস্ত হয়ে পড়ছে যান্ত্রিক নগরে। এর ফলে অনেক ঘরেই দেখা যায়, ঈদের দিন সেমাই-পায়েস রান্না হলেও তা খাওয়ার মতো মানুষ নেই। ড্রয়িংরুমে সাজানো শো-পিসগুলো ঝকঝক করলেও প্রবীণ মা-বাবার মনে জমে থাকে একরাশ ধুলোবালি।

বিশেষ করে বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের জন্য ঈদের দিনটি সবচেয়ে কষ্টের। যখন চারদিকে বাজি ফোটে, নতুন জামার সুঘ্রাণ ছড়ায়, তখন বৃদ্ধাশ্রমের লোহার গেটের দিকে তাকিয়ে কোনো এক মা ভাবেন—হয়তো এবার সন্তান এসে বলবে, ‘মা চলো, বাড়িতে যাই।’ কিন্তু দিন শেষে সেই অপেক্ষায় কেবল ক্লান্তিই বাড়ে। আবার ঘরে থেকেও যারা অবহেলার শিকার, তাঁদের ঈদ কাটে নিঃশব্দে। সন্তানদের ব্যস্ততা বা নাতি-নাতনিদের ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তির মাঝে প্রবীণরা হয়ে পড়েন ব্রাত্য।

বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের জন্য ঈদের দিনটি সবচেয়ে কষ্টের। বৃদ্ধাশ্রমের লোহার গেটের দিকে তাকিয়ে কোনো এক মা ভাবেন—হয়তো এবার সন্তান এসে বলবে, ‘মা চলো, বাড়িতে যাই।’ কিন্তু দিন শেষে সেই অপেক্ষায় কেবল ক্লান্তিই বাড়ে। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রবীণরা কোনো বোঝা নন; তাঁরা আমাদের বটবৃক্ষ। তাঁদের আশীর্বাদ আর সান্নিধ্যই একটি পরিবারের প্রকৃত ঐশ্বর্য। ঈদ কেবল নতুন কাপড় বা দামী খাবারের উৎসব নয়, ঈদ হলো সম্পর্কের সুতোকে আরও মজবুত করার উপলক্ষ।

আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রবীণরা কোনো বোঝা নন; তাঁরা আমাদের বটবৃক্ষ। তাঁদের আশীর্বাদ আর সান্নিধ্যই একটি পরিবারের প্রকৃত ঐশ্বর্য। ঈদ কেবল নতুন কাপড় বা দামী খাবারের উৎসব নয়, ঈদ হলো সম্পর্কের সুতোকে আরও মজবুত করার উপলক্ষ।

প্রবীণদের ঈদ আনন্দ নিশ্চিত করতে আমাদের কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

১. সময় দেওয়া: ঈদের দিন অন্তত কয়েক ঘণ্টা প্রবীণদের পাশে বসে তাঁদের ফেলে আসা দিনের গল্প শোনা।

২. অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা: ঘরের ছোটখাটো সিদ্ধান্ত বা ঈদের কেনাকাটায় তাঁদের মতামত নেওয়া, যাতে তাঁরা নিজেদের অবহেলিত মনে না করেন।

৩. সামাজিক দায়িত্ব: পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে কোনো একা থাকা প্রবীণ থাকলে তাঁর খোঁজ নেওয়া এবং ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। 

দুই.

প্রবীণদের ঈদ আনন্দ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র তথা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কিছু সুনির্দিষ্ট ও নীতিগত দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের প্রধান করণীয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি ও সময়মতো বিতরণ: বর্তমানে 'বয়স্ক ভাতা' কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৬১ লক্ষ প্রবীণ প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। ঈদের মতো বড় উৎসবে এই ভাতার পরিমাণ সাময়িকভাবে বৃদ্ধি করা বা অগ্রিম ভাতা প্রদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন যাতে তাঁরা উৎসবের কেনাকাটা করতে পারেন।

জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩ বাস্তবায়ন: এই নীতিমালার আওতায় প্রবীণদের জন্য 'সিনিয়র সিটিজেন' আইডি কার্ড প্রদান এবং এর মাধ্যমে ঈদযাত্রায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিটে বিশেষ ছাড় নিশ্চিত করা দরকার। বর্তমানে মেট্রোরেল ও আন্তঃনগর ট্রেনে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণদের জন্য ২৫% ছাড়ের ব্যবস্থা থাকলেও তা আরও ব্যাপকভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন।

পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন প্রয়োগ: 'পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩' কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি বড় দায়িত্ব। সন্তানরা যেন ঈদে মা-বাবাকে একাকী ফেলে না রাখে বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে না দেয়, সে বিষয়ে আইনি সচেতনতা ও তদারকি বাড়ানো জরুরি।

বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ উৎসব আয়োজন: সরকারি শিশু পরিবার ও শান্তি নিবাসে (সরকারি বৃদ্ধাশ্রম) বসবাসরত প্রবীণদের জন্য উন্নত মানের খাবার, নতুন পোশাক এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের অংশ। ঈদের দিনে এসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের একাকিত্ব দূর করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রসারে সহায়তা: প্রবীণ বয়সে আর্থিক সুরক্ষা দিতে বর্তমান সরকারের 'সর্বজনীন পেনশন স্কিম' (যেমন: সুরক্ষা বা সমতা) সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রবীণ অভাবের কারণে ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন।
সামাজিক সচেতনতা ও প্রচারণা: গণমাধ্যমের সাহায্যে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রচার চালানো। বিশেষ করে ঈদে প্রবীণদের সময় দেওয়ার মানসিকতা তৈরির জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে।

তিন.

বাংলাদেশে প্রবীণদের অধিকার কেবল নৈতিক নয়, বরং আইনিভাবেও স্বীকৃত। 'পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩' অনুযায়ী সন্তানদের জন্য মা-বাবার দেখাশোনা করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইনের কঠোর প্রয়োগের চেয়ে সামাজিক সচেতনতা ও মমত্ববোধই পারে প্রবীণদের ঈদকে অর্থবহ করে তুলতে।

বাংলাদেশে প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় প্রধানত দুটি আইন ও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা কার্যকর রয়েছে।

১. পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩

এটি প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী আইন। এই আইনের মূল দিকগুলো হলো:

বাধ্যতামূলক ভরণ-পোষণ: প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। যদি কোনো সন্তান মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের আলাদা রাখে বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

একত্র বসবাস: সন্তানদের মা-বাবার সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে এবং তাঁদের স্বাস্থ্যের নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হবে।

পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি/নানা-নানি: যদি পিতা-মাতা বেঁচে না থাকেন, তবে দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করাও নাতি-নাতনিদের জন্য আইনি দায়িত্ব।

শাস্তি: এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

২. জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, ২০১৩

এই নীতিমালার মাধ্যমে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ বা প্রবীণ নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর

আওতায় সরকার নিম্নোক্ত সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে:

বিশেষ পরিচয়পত্র: প্রবীণদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র প্রদান, যার মাধ্যমে তাঁরা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধায় অগ্রাধিকার পাবেন।

যাতায়াত ও সেবায় ছাড়: বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও বিমানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ আসন সংরক্ষণ এবং টিকিটে ছাড়। এছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও কম মূল্যে সেবার সুযোগ।

আর্থিক নিরাপত্তা: বয়স্ক ভাতার আওতা বাড়ানো এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফা সহজলভ্য করা।

৩. সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩

বর্তমানে সরকার প্রবীণদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার জন্য এই আইনটি কার্যকর করেছে। এর মাধ্যমে:
সুরক্ষা ও সমতা স্কিম: নিম্নবিত্ত বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য বার্ধক্যে মাসিক পেনশনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে উৎসবের দিনগুলোতে তাঁদের কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয়।

আসুন, এবারের ঈদে আমরা আমাদের শিকড়কে ভুলে না যাই। কোনো প্রবীণ যেন একাকী চোখের জল না ফেলেন। আমাদের একটু মায়া, একটু সময় আর বিনম্র শ্রদ্ধাবোধই পারে তাঁদের জীবনে ঈদের পূর্ণতা আনতে। ঈদ আসুক কেবল পোশাকে নয়, প্রতিটি প্রবীণ মানুষের প্রশান্তিতে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।