জামায়াতের সঙ্গে জোট: এনসিপি ছাড়লেন আরও এক নেত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪০ এএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২৬
সৈয়দা নীলিমা দোলা/ ছবি- সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে থাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা। এ নিয়ে গত কয়েকদিনে মোট ১৫ নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন।

শনিবার (৩ জানুয়ারি) নীলিমা দোলা দল থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর তিনি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পদত্যাগপত্রে নীলিমা দোলা লেখেন, আমি সৈয়দা নীলিমা দোলা জাতীয় নাগরিক পার্টির সব দায়িত্ব ও পদ থেকে পদত্যাগ করছি। আমি মনে করি, এনসিপির পক্ষে এখন আর মধ্যপন্থি রাজনীতির নতুন পথ সৃষ্টি সম্ভব নয়। এতদিন আমি এনসিপির সঙ্গে ছিলাম কারণ আমি মনে করেছিলাম, দলটি জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। তবে সম্প্রতি দলটির নানান সিদ্ধান্তের পর আমার কাছে এটুকু স্পষ্ট, এই দলটি সম্পূর্ণভাবে ডানপন্থি ঘরানায় ঢুকে পড়ছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই তারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।

তিনি আরও লেখেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির যে নির্বাচন-কেন্দ্রিক জোট তা কোনো কৌশলগত জোট নয়, যদি হতো তাহলে এত নেতাকর্মী পদত্যাগ করতো না। দলের নেতাকর্মীদের চোখে ধুলা দিয়ে এই জোট করা হয়েছে এবং মনোনয়ন দেওয়ার নাম করে প্রতারণা করা হয়েছে।

‘পদত্যাগ করার পর সাধারণত দলে থেকে যাওয়াদের অনেকে এমনটা বলেন যে, ক্ষমতা ও গুরুত্ব দেওয়ার পরেও আমরা চলে গেলাম কেন? তাই দলের সবার স্বার্থে জানিয়ে রাখি, আমাকে কেউ কোনো ক্ষমতা দেয়নি বরং আমার প্রগতিশীল মানসিকতা এবং নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পরিচয় এনসিপিকে শক্তি জুগিয়েছে এতদিন।’

নীলিমা দোলা আরও লেখেন, যারা পদত্যাগ করছেন তাদের বামপন্থি বলে ফ্রেমিং করাটাও একটা গেইম প্ল্যানেরই অংশ বলে আমি মনে করি। কেননা, এতে করে জামায়াতের কাছে দল বিক্রি করা সহজ। বামপন্থিরা বেরিয়ে যাচ্ছে কেন এই পাল্টা প্রশ্ন আমি করতে চাই। তাহলে কি যারা রয়ে গেলো সবাই ডানপন্থি? আপনারা না একটা সেন্ট্রিস্ট দল?

তিনি লেখেন, একটি বিষয় বলা দরকার, আমি এনসিপিতে আসার আগেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্পেসে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ করেছি। এনসিপিতে আসার পরেও করেছি। সুতরাং দলের সঙ্গে আদর্শিক জায়গা ছাড়া আমার আদান-প্রদান খুবই সীমিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, আমার মতো কর্মীকে ধরে রাখার সামর্থ্য এনসিপির এখন আর নেই।

আরও পড়ুন
জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তি দাবি 
মধ্যরাতে আদালতে পাঠানো হলো বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহাদীকে 

নীলিমা দোলা লেখেন, আমি এ-ও মনে করি যে, জুলাইয়ের জনতার কাছে এনসিপির অনেক দায় রয়েছে। অভ্যুত্থানের পর এনসিপির ওপর বাংলাদেশের মানুষ যে বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছিল তা বিগত কয়েকমাসে চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে। আমি মনে করি আসন্ন কঠিন সময়ে জনতা এনসিপিকে এর সমুচিত জবাব দেবে। তবে এ কথাও সত্য, এরই মধ্যে দল হিসেবে এনসিপি সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া শুরু করেছে।

‘এনসিপির ভেতরে থেকেই আমি তীব্র লড়াই চালিয়ে গেছি। দলটা যেন সেন্ট্রিস্ট অবস্থানে থাকে সে জন্য নারী, শিশু, শ্রমিক, আদিবাসী, হিজড়া, হিন্দু, মাজারকেন্দ্রিক জনগণকে এক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু গত দেড় বছরজুড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় সব ঘরানার প্রান্তিক মানুষের ওপর চলা অনিয়ন্ত্রিত অনাচার ও নির্যাতন নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর ব্যাপারে গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত এই তারুণ্যনির্ভর দলকে অন্তত পাঁচ দিন করে ভাবতে হয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের মনমরা ও দায়সারা প্রতিবাদ আমার রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দেশের আপামর মানুষের জন্যেও তা হতাশার।’

‘সবশেষে এই বলবো যে, আমার বা আমার মতো মানুষদের এনসিপি থেকে বিদায় এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে এনসিপি ছাড়াও জুলাইয়ের আরও একটি পক্ষশক্তি আছে। এ মানুষেরা বাংলার জনতা ও জমিনকে চেনে বলেই আমি ধারণা পোষণ করি।’

তিনি আরও লেখেন, এনসিপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে বলতে চাই, রাজনৈতিক প্রয়োজনে নেগোসিয়েশন বা দফারফা সবাই বা বেশিরভাগ দল করলে করুক, এনসিপির জন্য তা নিতান্ত বেমানান। কারণ, এনসিপি হাজারও জুলাই শহীদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করতে এসেছিল। আমি দলটির নেতাদের বলতে চাই, ধর্মীয় রাজনীতিকে ফ্রন্টে এনে পলিটিক্স খেলার জন্য শহীদরা জান দেননি। আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় বিপ্লব বা অভ্যুত্থান হয়নি।

সবশেষ নীলিমা দোলা লেখেন, তবে আপনারা এই অভ্যুত্থানকে ধর্মীয় মোড়কে ভরে আওয়ামী বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে রয়েছেন। এজন্য আপনাদের লাল সালাম। পৃথিবীর যাবতীয় সমৃদ্ধি আপনাদের ঘিরে রাখুক।

জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তাসনিম জারা। তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য ছিলেন। এর আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সমর্থন জানিয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক। এছাড়া এনসিপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীন, যুগ্ম সদস্যসচিব আরিফ সোহেল, উত্তরাঞ্চলের সংগঠক আজাদ খান ভাসানী, দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক ওয়াহিদুজ্জামান, সদস্য আসিফ নেহাল (আসিফ মোস্তফা জামাল), মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল আমিন টুটুল, যুগ্ম সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি সেলের প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া প্রমুখ।

এনএস/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।