সাড়ে তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে দেশ?

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৬ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান/বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে নেওয়া ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সংসদে যাচ্ছে বিএনপি। ২৯৯ আসনের মধ্যে জোটগতভাবে ২১২ আসনে জয় পেয়েছে দলটি। ধানের শীষ প্রতীকে জিতেছে ২০৯ আসনে। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিয়ে সরকার গঠনের পথে তারেক রহমানের বিএনপি।

সরকার গঠন করলে কে হবেন প্রধানমন্ত্রী? এ আলোচনা এখন সর্বত্র। ইতিহাস তারেক রহমানের পক্ষে। মা খালেদা জিয়া প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তারেক রহমানেরও এটা প্রথম নির্বাচন। দলের চেয়ারম্যানও তিনি। মাঠের আলোচনা সত্যি হলে তারেক রহমানই হচ্ছেন দেশের আগামীর প্রধানমন্ত্রী। সেটা হলে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাবে বাংলাদেশ।।

১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশে আর কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। দীর্ঘ সময় বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা সরকার প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। এর মধ্যে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিন দফায়। সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। এর পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতির চাকা নতুন মোড় নিয়েছে। সামনে এসেছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি।

বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার বলেন, নেতৃত্বে নারী-পুরুষ বিচার নয়, নেতৃত্বের যোগ্যতা দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তার কথাবার্তার শালীনতা মানুষ পছন্দ করতো, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনাও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু কথাবার্তা মানুষ পছন্দ করেনি।

jagonews24.comখালেদা জিয়া ও তারেক রহমান/ফাইল ছবি

মায়ের মতোই প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক?

১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নেন খালেদা জিয়া। ওই নির্বাচনে বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে লড়ে সব কটিতে বিপুল ভোটে জয়ী হন তিনি। ফেনী-১ আসনটি প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বাকি চারটি আসন থেকে পদত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। শপথ নেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

অনেকেই মনে করছেন, মা খালেদা জিয়ার মতোই রাজনীতিতে একইরকম পুনরুত্থান হচ্ছে ছেলে তারেক রহমানেরও। তিনিও এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। দুই আসনেই জিতেছেন তিনি। সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ এসেছে তার সামনেও। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে সেটি হবে খালেদা জিয়ার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতোই ঘটনা। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে মানুষ।

যা বলছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা

দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী আসছে—এটি কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রজন্মান্তরের প্রতীক, নাকি কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন? এমন প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লিঙ্গভিত্তিক ধারণা থেকে চিন্তা করাটা আধুনিক সময়ে বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, যদিও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্মক্ষেত্রে ডা. জুবাইদা রহমান, সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি ও জাইমা রহমানের মতো নারীর অংশগ্রহণ একটি সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশের বার্তা দেয়।

১৯৯১ থেকে এখন পর্যন্ত নারী প্রধানমন্ত্রীদের অভিজ্ঞতা এবং এ যাবৎ পুরুষ-নারী নেতৃত্বের পালাবদল কি দেশজুড়ে নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির বিশেষ প্রেক্ষাপটে দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের হাল ধরতে হয়েছিল পরিবারের নারী সদস্যদের। সেই বিশেষ প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে এক করে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং এটা বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলো তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যেভাবে তৈরি করছে, সেভাবেই রাজনীতি এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, যদিও অনেকে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করে, তবুও দলের সার্বিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সুযোগ্য নেতৃত্ব রাজনীতির জন্য নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ কম। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নেতৃত্ব তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, বাংলাদেশে একটা সময় সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থাকলেও মাঠ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কম ছিল। কিন্তু অবাক করা হলেও সত্যি ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ সবার নজর আকৃষ্ট করেছে। এর মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

কেএইচ/এমএমকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।