সরকার গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ‘ধীরগতি’

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫০ পিএম, ২২ মার্চ ২০২৬
ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে সরকার গঠনের পর দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন স্তরে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।

দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচি—যেমন সভা, বৈঠক, কর্মী সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম—আগের তুলনায় কমে গেছে।

দলের নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর হঠাৎ করেই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় দলের অনেক নেতাকর্মীর কর্মক্ষেত্রও বদলে গেছে। ফলে দলীয় কার্যালয়ের পরিবর্তে এখন সচিবালয় ও নির্বাচনি এলাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রমই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

jagonews24

কোলাহল কমেছে নয়াপল্টন কার্যালয়ে
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের আনাগোনা, সংবাদ সম্মেলন, মিছিলের প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণে সরগরম থাকতো পুরো এলাকা। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও ছিল নিয়মিত।

কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই চিত্রে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। আগে যেখানে প্রতিদিন নেতাকর্মীদের ভিড় লেগে থাকতো, সেখানে এখন অনেক সময়ই কার্যালয়কে তুলনামূলক শান্ত ও ফাঁকা দেখা যাচ্ছে।

সরকার গঠনের পর মন্ত্রণালয় গঠনসহ নানান প্রশাসনিক কাজে নেতারা ব্যস্ত আছেন। ঈদের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আবারও জোরদার করা হবে।ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন

দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা এখন সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাদের বড় একটি অংশ সচিবালয় ও নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় বেশি সময় দিচ্ছেন। এতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিতি কমেছে।

আন্দোলনের চাপ কমে দায়িত্ব বেড়েছে
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাদের সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি বিরাজ করছে। তার ভাষায়, এতদিন আন্দোলনের চাপ ছিল, এখন দায়িত্ব বেড়েছে। সরকার পরিচালনার কাজেই নেতারা বেশি ব্যস্ত।

jagonews24

কৃষকদলের এ নেতা মনে করেন, রমজান ও ঈদ সামনে রেখে মাঠের কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। ঈদের পর আবার কেন্দ্রীয় কার্যালয় সরগরম হয়ে উঠবে বলে তিনি আশা করছেন। 

এলাকায় ব্যস্ত নেতারা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ সজল জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে পার্টি অফিসে বড় ধরনের কার্যক্রম না থাকায় অনেক কর্মী নিজ নিজ এলাকায় ব্যস্ত আছেন। নেতারা এলাকায় গেলে কর্মীরাও তাদের সঙ্গে কাজ করেন। ফলে নয়াপল্টনে উপস্থিতি কম থাকাটা স্বাভাবিক।

কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকতেরও একই মত। জানতে চাইলে বলেন, নির্বাচনের পর অধিকাংশ নেতা নিজ নিজ এলাকায় সংগঠন গোছানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।

jagonews24

সাবেক এই ছাত্রদল নেতার দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনের বেশি সাবেক ছাত্রদল নেতাকে মন্ত্রী-এমপি করা হয়েছে। অন্য নেতাকর্মীদেরও ধাপে ধাপে সংগঠনের বিভিন্ন পদে মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি আশা করছেন।

বিদ্রোহীদের নিষ্ক্রিয়তা
এদিকে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বিএনপি দেশের বিভিন্ন স্থানে বহু নেতাকে বহিষ্কার করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, এর ফলে ওই নেতাদের অনেকেই বর্তমানে কার্যত রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

ঝিনাইদহ-৪ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখনো দলের কার্যক্রম শুরু হয়নি। সামনে কী হয় দেখা যাক।’

দলের নেতারা অবশ্য বিশ্বাস করছেন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে তা সাময়িক। ঈদের পরই কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে। 

ঈদের পর গতি ফিরবে
জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন এমপি জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচনের সময় সবাই নির্বাচন ও সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সে কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান হয়নি। তবে দলের কার্যক্রম যথারীতি চলমান রয়েছে।

সরকার গঠনের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়নি, বরং কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। তবে দলীয় পদক্ষেপগুলো দেখলেই বোঝা যাবে যে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।—সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল 

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলটির মুখপাত্র সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর রমজান শুরু হয়। এরমধ্যে সংসদ অধিবেশনও শুরু হয়েছে। অনেক নেতা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। তাদের মন্ত্রণালয় কেন্দ্রিক ব্যস্ততা বেড়েছে। ঈদের পর সংগঠনের কার্যক্রম জোরদার হবে।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল জাগো নিউজকে বলেন, সরকার গঠনের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়নি, বরং কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। তবে দলীয় পদক্ষেপগুলো দেখলেই বোঝা যাবে যে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

jagonews24

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর মন্ত্রণালয় গঠনসহ নানান প্রশাসনিক কাজে নেতারা ব্যস্ত আছেন। ঈদের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আবারও জোরদার করা হবে।’

পুনর্গঠনের পরিকল্পনা
দলীয় সূত্র জানায়, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলছে। বিশেষত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

জানতে চাইলে রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন জাগো নিউজকে বলেন, বড় কোনো নির্বাচনি বিজয়ের পর একটি দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সাময়িক ধীরগতি দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক গতি ধরে রাখতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখা এবং নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদের পর পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে গেলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আবারও আগের গতিতে ফিরে আসবে—আশা দলের নেতাদের।

কেএইচ/এমকেআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।