চসিক নির্বাচনে আবারো চাঙ্গা আওয়ামী লীগের গ্রুপিং


প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ১৬ এপ্রিল ২০১৫

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে আবারো বিভক্ত হয়ে পড়েছে নগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি। মাঠের চিত্রে মেয়র প্রার্থী নিয়ে শীর্ষ নেতারা এক মঞ্চে বসলেও বাস্তবতা ভিন্ন। মূলত কেন্দ্রের দোহাই দিয়ে এমপি লতিফের ১০টি ওয়ার্ডে একক কাউন্সিলর প্রার্থী নির্ধারণ নিয়ে আবারো চাঙ্গা হলো দলীয় গ্রুপিং।

নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে বড় ধরণের বিভক্তি রয়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতারা মেয়র পদে দলের প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিনের জন্য নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করলেও ওয়ার্ড পর্যায়ে ছাড় দিতে রাজি নন। ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে নগর আওয়ামী লীগ চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

এসব গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীন এমপি, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও দলের মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং সংসদ সদস্য এম এ লতিফ। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের ৪১টিতেই কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীরা।

অনেক ওয়ার্ডে তার একাধিক অনুসারী প্রার্থীও রয়েছেন। আ জ ম নাছির অনুসারী প্রার্থী রয়েছেন ২৫টি ওয়ার্ডে। এমপি লতিফ অনুসারী কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন ১০ ওয়ার্ডে। আর ডা. আফছারুল আমীনের অনুসারী প্রার্থী রয়েছেন পাঁচ থেকে ছয়জন। এ অবস্থায় কাউন্সিলর প্রার্থী জিতিয়ে আনা তো দূরের কথা দলীয় সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর উপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তৃণমূলের নেতারা।

৭ এপ্রিল দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে একটি দল স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নিয়ে কাউন্সিলর পদে একক প্রার্থী নির্ধারণের উদ্যোগ নেন।

এই লক্ষ্যে এম এ লতিফের সংসদীয় আসনের অন্তত ১০ ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের নিয়ে প্রথম বৈঠক হয় চট্টগ্রাম চেম্বার মিলনায়তনে। ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগের যেসব কাউন্সিলর প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন তাদের কাছ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহারপত্রে স্বাক্ষর নেয়া হয়। তাদেরকে বলা হয়, সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থন দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী সমর্থিত প্রার্থী আওয়ামী লীগের ব্যানারে কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন। একইদিন কোতোয়ালী সংসদীয় আসনের কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের নিয়েও বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তবে মনোনয়ন প্রত্যাহারপত্রে স্বাক্ষর নেয়ার খবর শুনে অনেক আওয়ামী লীগ প্রার্থী ওই বৈঠকে যাননি। কেউ কেউ নানা অজুহাতে বৈঠক থেকে পালিয়েছেন।

 তারপরও এই আসনের অন্তর্ভূক্ত পাথরঘাটা ওয়ার্ডে জালাল উদ্দিন ইকবাল, আন্দরকিল­া ওয়ার্ডে জহরলাল হাজারী, আলকরণে তারেক সোলেমান সেলিমসহ ৮ জনকে একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। লতিফের আসনের প্রার্থীরা হলেন ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে এইচ এম সোহেল, ২৯ নম্বরে গোলাম মো. জোবায়ের, ৩০ নম্বর মাজহারুল ইসলাম, ৩৭ নম্বর আবদুল মান্নান, ৩৮ নম্বর গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী, ৩৯ নম্বরে মো. আসলাম, ৪০ নম্বরে মো. জয়নাল আবেদীন এবং ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ছালেহ আহম্মদ চৌধুরী। বাকি দুইটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কারণ ওই দুইটি ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে।

এখানেই শুরু গ্রুপিংয়ের। স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, এমপি লতিফ যেসব প্রার্থী ঘোষণা করেছেন দু’একজন ছাড়া তারা সবাই মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারীর প্রতিপক্ষ। ওইসব ওয়ার্ডে একজন করে মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারীর শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ৩২ নম্বর আন্দরকিল­া ওয়ার্ড থেকে টানা দুই দফায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক জহরলাল হাজারী। মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত তিনি। এবার তার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন আ জ ম নাছির অনুসারী কাউন্সিলর প্রার্থী আশীষ ভট্টাচার্য্য। দুই প্রার্থী নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন এলাকার নেতাকর্মীরা। ফলে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ ওয়ার্ডটিতে এবার জয় হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০ নম্বর দেওয়ানবাজার ওয়ার্ডে নির্বাচন করছেন আ জ ম নাছির অনুসারী হিসেবে পরিচিত সাবেক প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী। কিন্তু তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী রফিকুল আলম বাপ্পী। হাসনীকে হারাতে বাপ্পীকে সমর্থন দিচ্ছেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর কর্মী-সমর্থকরা। একইভাবে ২১ নম্বর জামালখান ওয়ার্ডে মহিউদ্দিন অনুসারী নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর এমএ নাসেরের পাশাপাশি নির্বাচনে অনড় আ জ ম নাছির অনুসারী বর্তমান কাউন্সিলর বিজয় কুমার চৌধুরী কিষাণ ও শৈবাল দাশ সুমন। এখানে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা।

১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে মহিউদ্দিন অনুসারী বর্তমান কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন আহমেদ ও আফছারুল আমীন অনুসারী শামসুল আলম পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন ভোটযুদ্ধে। এভাবে ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডে মহিউদ্দিন অনুসারী তৌহিদ আজিজ ও আফছারুল আমীন অনুসারী আবুল ফজল কবির আহমেদ, ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে মহিউদ্দিন অনুসারী সাইয়্যেদ গোলাম হায়দার মিন্টু এবং নাছির অনুসারী সেলিম রহমান, ২৩ নম্বর উত্তর পাঠানটুলী ওয়ার্ডে মহিউদ্দিন অনুসারী মোহাম্মদ জাবেদ ও আফছারুল আমীন অনুসারী সিরাজুল ইসলাম, ২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে নাছির অনুসারী নাজমুল হক ডিউক, আফছারুল আমীন অনুসারী জাবেদ নজরুল ইসলাম ও মহিউদ্দিন অনুসারী মো. সিরাজুল ইসলাম, ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডে নাছির অনুসারী হাসান মুরাদ ও মহিউদ্দিন অনুসারী এম জহিরুল আলম দোভাষ, ৩৫ নম্বর বক্সিরহাট ওয়ার্ডে লতিফ অনুসারী ফয়েজ উল্লা­হ বাহাদুর ও মহিউদ্দিন অনুসারী বর্তমান কাউন্সিলর হাজি নুরুল হক, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডে মহিউদ্দিন অনুসারী জিয়াউল হক সুমন ও নাছির অনুসারী মো. আসলাম কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন।

প্রায় অভিন্ন অবস্থা অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও। প্রতিটি ওয়ার্ডে শীর্ষ নেতাদের অনুসারী কাউন্সিলর প্রার্থীদের নেতৃত্বে নতুন করে বিভাজন তৈরি হয়েছে দলের তৃণমূল পর্যায়ে।

এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘নগর আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কাউকে কাউন্সিলর প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার অধিকার কেন্দ্র দেয়নি। কারো সঙ্গে আলোচনা না করে এমপি লতিফ আটটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছেন। ওইসব প্রার্থী তার নিজের হতে পারে।

এদিকে কাউন্সিলর পদে এমপি লতিফসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সমর্থন ও নগর কমিটির পাল্টাপাল্টি সমর্থন নিয়ে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কে দলের প্রার্থী তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছেন। এটি ভোটের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। তাদের আশঙ্কা, দলীয় মেয়র প্রার্থীর ভোটের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এই বিভক্তি।

এমজেড/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।