পিন্টুর মৃত্যুর রহস্য জানা যাবে শিগগিরই!
বিএনপি নেতা নাসির উদ্দনি আহমেদ পিন্টুর মৃত্যুর রহস্য উম্মোচনে রাজশাহীতে আসা তদন্ত কমিটির সদস্যরা শুক্রবার সকালে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তারা দু`দিনব্যাপি পিন্টুর মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা জানতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সঙ্গে দেখা করে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন।
এছাড়াও পিন্টুর লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান জোবাইদুল রহমানের সঙ্গে দেখা করে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কেও খোঁজ-খবর নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সারাদিন তদন্ত কমিটির সদস্যরা রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থান করে গোপনে চালান তাদের তদন্ত কার্যক্রম। এসময় তারা পিন্টুর সেবাদানকারী সেবক (কয়েদী) রাব্বানীসহ ১৫ জন কয়েদী ও হাজতির সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন।
তবে নাম না প্রকাশের শর্তে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কারারক্ষী জানিয়েছেন, তিনদিন ব্যাপি চলমান তদন্ত কার্যক্রমে পিন্টুর মৃত্যুর রহস্যের সঙ্গে কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীর্তির প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারী দল। বিএনপি নেতা পিন্টু যে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন এটুকু প্রমাণ করতে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। বিশেষ করে কারা চিকিৎসক আবু সায়েম, ল্যাব টেকনিশিয়ান রফিকুল ইসলামের গাফলতি ছিল সব চেয়ে বেশী।
কারণ কারা চিকিৎসক আবু সায়েম নিয়োমিত বন্দীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন না। তার বদলে ল্যাব টেকনিশিয়ান রফিকুল ডাক্তারের দায়িত্ব পালন করেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। মৃত্যুর আগে বিএনপি নেতা পিন্টু বহুবার তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তির জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার কোন কথাই আমলে নেননি কর্তৃপক্ষ। হৃদরোগ, ডায়বেটিক, প্রেসারসহ বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে নিয়মিতভাবে সকল রোগের ওষুধ সরবরাহ করতেন না চিকিৎসক আবু সায়েম। এ কারণে তিনি মনের দিক থেকে অনেকটা ভেঙে পড়েছিলেন। ঘটনার দিন তিনি সকাল থেকে কুরআন তিলওয়াত করছিলেন। এক পর্যায়ে তিলাওয়াতরত অবস্থায় বুকে হাত দিয়ে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়েন। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিষয়গুলো নিয়ে কারা চিকিৎসক আবু সায়েমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে জাগো নিউজকে বলেন, তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করেছেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তখনতো জানতে পারবেন। এখন এ বিষয়ে আমি কিছু বলার প্রয়োজন মনে করছি না।
আর সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জাগো নিউজকে জানান, পিন্টু সাহেব এই কারাগারে আসার পর থেকেই তাকে কারাগারের ডাক্তার প্রতিদিন চিকিৎসা দিয়েছেন। কারণ, তিনি ভিআইপি ব্যক্তি হিসেবে এখানে ছিলেন। মৃত্যু আগে গত ২ তারিখে আমি তার সঙ্গে শেষ কথা বলেছি। তিনি তখনও তার শারিরীক অসুস্থতার কথা আমাকে বলেননি। মৃত্যুর দিন তিনি তার অসুস্থতার কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. রইস উদ্দিন বলছেন, পিন্টু যদি অসুস্থ না হতেন তাহলে কারাগারে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য হাসপাতালের পরিচালক বরাবর চিঠি কেন দিয়েছিলেন কারা কর্তৃপক্ষ? চিঠি পেয়ে পরিচালক সাহেব তাকে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন কিন্তু তিনি সেখানে গিয়েও পিন্টুর শারিরীক কোন খোঁজ-খবর নিতে পারেননি। বরং তাকে বসিয়ে কৌশলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ঘটনার দিন তিনি পিন্টুকে মৃত অবস্থায় পেয়েছেন।
তবে তদন্ত কমিটির সদস্যরা সঠিক রিপোর্ট প্রকাশ না করা পর্যন্ত পিন্টুর মৃত্যু একটি রহস্যই হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, গত রোববার রাজশাহী কারাগারে থাকা অবস্থায় পিন্টু হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে জরুরি বিভাগ থেকে তাকে হৃদরোগ বিভাগে নেয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় নগরীর রাজপাড়া থানায় একটি ইউডি মামলা দায়ের করা হয়।
পরে বিএনপি নেতা পিন্টুর পরিবারের তোলা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ৩ মে রোববার রাতে প্রধান ঢাকা বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন) গোলাম হায়দার, কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান ও ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরীকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এমজেড/ এমএএস